সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১০)

ইচ্ছামণি

পর্ব ১০

আজকেও একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখে রুমা আধোঘুমে কোঁকাতে শুরু করেছিল। অতীন ঠেলতেই বলল, “ভয় করছে, তুমি আমার পাশে এসে শোও।”
ঘুমের মধ্যে বৌয়ের সান্নিধ্যের খুব একটা অভিলাষ না থাকলেও একটু গাঁইগুঁই করে রুমার পাশে এসে জিজ্ঞাসা করল অতীন, “কী দেখলে?”
“অনেক হিজিবিজি দৃশ্য দেখতে দেখতে দেখলাম গুবলুকে টিভির ভেতর থেকে একটা সাপ বেরিয়ে এসে গলা পেঁচিয়ে ধরল। তুমি ছিলে কাছাকাছি, কিন্তু গ্রাহ্য করছিলে না। আমি চেঁচাতে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না।”
“সারা দিন হাবিজাবি ভাবো, তারই রিফ্লেকশন। পড়াশুনো করে জগৎটাকে জানার চেষ্টা করো না। শুধু নিজের ফ্রাসট্রেশনের কথা ভেবে গেলে হবে? দুটো খবর কাগজ আসে, একটার পাতাও উল্টে দেখো না সুডোকু করা ছাড়া। ‘দেশ’টাও পড়ো না।”
“কাগজে কাল পড়লাম একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েকে তার এক বয়স্ক আত্মীয়, বোধহয় দাদু, মাঠে রেপ করে মাথাটা পাথর দিয়ে থেঁতলে মেরে ফেলেছে। খবরটা পড়ে অবধি কাল থেকেই মনটা উচাটন। গুবলু স্কুল থেকে না ফেরা পর্যন্ত প্রচণ্ড প্যালপিটিশন হচ্ছে কাল থেকে। আজ আবার আর একটা খবর পড়লাম পেপারে, সাত বছরের কচি মেয়েকে বাইরে চালান করে ব্লুফিম্ল দেখিয়ে তাকে ওরাল…মানে যাতা কাজে বাধ্য করা হয়েছে দিনের পর দিন। উপরন্তু তার রেকটাম আর সামনের ফুটো প্রায় এক হয়ে গেছে। এখানকার গ্রামের মেয়ে, কী যেন নাম গ্রামটার। পুলিস তাকে হারিয়ে যাওয়ার দেড় বছর পরে বম্বের রেড লাইট এরিয়া থেকে রেস্কিউ করে। তার ফ্যামিলি মিসিং ডায়রি করেছিল, কিন্তু এখন মেয়ের খবর পেয়েও বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়। আর মেয়েটার পক্ষেও কি ঐ ঘিনঘিনে জীবন যাপন করে আসার পর স্বাভাবিক লাইফে ফেরা সম্ভব? বিশেষ করে যদি তার ফ্যামিলি সাথে না থাকে? পড়ে রাগে ঘেন্নায় মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। তারপর বড্ড ভয় করতে লাগল। শুনছ?”
অতীনের আবার নাক ডাকতে শুরু করেছে। মেয়েটা বাবার দিকে কাত হয়ে শুতে ভালোবাসে। ওদিকে এখন বাবাকে না পেয়ে উসখুস করছে। রুমা হাত বাড়িয়ে জোর করে কন্যাকে তার বালিসে ঠিকমতো শুইয়ে দিয়ে বুকে চেপে ধরল। “হে পিতা লোকনাথ ব্রহ্মচারী, মা করুণাময়ী ব্রহ্মময়ী মা, পৃথিবী থেকে সব নোংরামি নৃশংসতা দূর করে দাও। আমার মেয়েটা, আমাদের সবার মেয়েগুলো যেন নিরাপদে জীবনটা কাটিয়ে পরিচ্ছন্নভাবে কষ্ট না পেয়ে মরতে পারে। বাচ্চা ছেলেগুলো যেন পশু তৈরি না হয়ে মানুষ হয়। অবশ্য পশু নয়, মানুষই এত নোংরামি, নৃশংসতা করতে পারে। মা, মা গো…”।
ঈশ্বর বিশ্বাসের ব্যাপারে রুমার অবস্থান মোটেই পোক্ত ও ধারাবাহিক নয়। সুবিধাবাদীই বলা যায়। যার বা যাদের ওপর যুক্তিগতভাবে আস্থা নেই, বিপদে পড়লে তাকে বা তাদেরকেই স্মরণ করতে হয়। মা কালীকে ডেকে ডেকে এলেপেলে ছেড়ে দিয়েছে। ঠিক যা যা চেয়েছে, তার উল্টো উল্টো হয়েছে। তাই ভগবানের ব্র্যান্ড বদলাতে হয়েছে যদিও পুরুষ দেবতাকে ডাকতে মন চায় না। এই লোকনাথবাবার ওপর ভরসার ভেবে চিন্তে একটা যুক্তি খাড়া করেছে – তিনি মানুষ ছিলেন, মানুষ মায়ের গর্ভে জন্মেছিলেন, আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে যে কোনও জায়গায় বিপন্ন মানুষ স্মরণ করলেই বিপন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার হিম্মত দেখিয়েছিলেন, তাই হয়ত মানুষের দুঃখ বুঝবেন। কালী তো মানুষের কল্পিত দেবী। তাই কৃষ্ণবর্ণা করালবদনা মার চাইতে ইদানিং বাবার ওপর খানিক বেশি আস্থা রুমার। সহসা কয়েক বছর আগেকার আর একটা খবর মনে পড়ল, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে সাইক্লোনে পড়ে কয়েকটি ট্রলার নিখোঁজ হয়ে যায়। কাউকে জীবিত পাওয়া যায়নি। ট্রলারগুলোর মধ্যে একটার নাম ছিল ‘বাবা লোকনাথ’। নিজেকে শাসন করে দ্বিগুণ আকূলতায় প্রার্থনা শুরু করল।
ভয়, ভয়, ভয়! কতরকম ভয়। মেয়ে পেটে থাকতে রুমাকে ধরেছিল ম্যানহোলের ভয়। গাটারে, নর্দমায় পড়ে গিয়ে শিশুমৃত্যুর খবর তো খুব একটা বিরল নয়। বড় নর্দমা দেখলেও রুমার আতঙ্কে রাতে ঘুম আসত না।  দেশ জুড়ে হাজার হাজার বধূ নির্যাতন, বৌ পোড়ানো। কিন্তু গুজরাটের গোধরা আর গোধরা পরবর্তী তাণ্ডব তাকে পাগোল তুলেছিল। খালি মনে হোত, তারও পেট চিরে কেউ বাচ্চাটাকে…! সিঙ্গুরের কৃষক কন্যার চারজন খুনে দ্বারা মার খেয়ে, ধর্ষিতা হয়ে জ্যান্ত পুড়ে মরার খবর রুমাকে মাস তিনেক যাবৎ উন্মাদ করে রেখেছিল। আবার কদিন আগে দিন পনেরোর জন্য এসে মা একটা খবর শোনাল। বিবাহিতা স্ত্রীকে একটা পরিত্যক্ত ঘরে বেশ কয়েক বছর ধরে বেঁধে অনাহারে কয়েদ রেখে নিয়মিত জোর করে নিজের দুষিত তরল পান করাত এক মুসলমান পুরুষ। দৈবাৎ একদিন বাঁধন আলগা পেয়ে মেয়েটা উলঙ্গ অবস্থাতেই পালিয়ে থানায় গিয়ে সব জানানোয় পুলিস একটু নড়েচড়ে বসেছে। সে এখন কোথায় আছে, কী খাচ্ছে সে খবর কাগজে আর চোখে পড়েনি। কিন্তু চিন্তাটা রুমার মাথা থেকে তো এত সহজে বার হবার নয়। তারপর লেখার সূত্রে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দাঙ্গা বা গৃহযুদ্ধ বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনার কীর্তিকলাপ পড়ে তো ভয়বোধটাও যেন ভয় পেয়ে শুকিয়ে গেল। পণ্ডিতরা এগুলোকে শুধু অবশ্যম্ভাবী সামাজিক ব্যধি বলে দায় সারেন। কিন্তু ভেবে দেখেন না, এখানে ব্যধিগ্রস্ত মানুষটার ধরা না পড়লে কোনও কষ্ট নেই, শরীরে মনে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে যে সুস্থ ছিল। কারণটা অর্থনৈতিক, ধর্মনৈতিক, সমাজনৈতিক যাই হোক, একান্তভাবে পুরুষনৈতিক এবং মেয়েরা তার একতরফা শিকার।

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।