শান্তিনিকেতন যখন প্রথম যাই ওই চূড়ান্ত সুপুরুষ বুড়োর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। সেই বয়েস, চোখে তখন সবই রঙিন । তবু ওই সাদা ভুরুর নীচে তরুণ তুর্কির চোখ দুটোই চোখে পড়ত । আর তখনি রক্তিম আভা ছড়াত হৃদকমলে । আর কেউ ছাই মনেই ধরত না সেভাবে। যে সুচরিতা, কুমুদিনী, বিনোদিনীকে সৃষ্টি করেছে এবং সর্বোপরি কাব্যে উপেক্ষিতা চিত্রাঙ্গদাকে ‘উম্যান অফ সাবটান্স’ বানিয়েছে সে ছাড়া আর প্রেমিক কেই বা হতে পারে? বাকি সব আসে যায়, ওই আসা যাওয়ার পথের ধারে কেস।
প্রথম বিশ্বভারতীতে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শ্যামলীর মাটির দাওয়ায় চুপ করে বসে ছিলাম, শ্যামলীর মাটির দাওয়ায় তখন টুপ্টাপ ঝরছে মাধবীরা । তখন গেটে এত তালাচাবির হ্যাপা ছিল না, ছিল খোলা মাঠের খেলা । মনে মনে বলছিলাম ” গুরু এই ইশকুলে তো পড়া হল না, বিশ্ববিদ্যালয়তে যদি কটা বছর ঠাই দিতে, একটু নিশ্চিন্তে থাকতাম কটা দিন ।” বূড়ো প্রবল প্রেমিক সে কাউকে ফেরায় না। টেনে নিয়েছিল কাছে।
কেন জানিনা বুড়োর কাছেই সবচেয়ে অকপটে সব কথা বলতে পারতাম ছোট থেকেই। বাবা পড়ে শুনিয়েছিল “দেনা পাওনা” সেই বোধহয় তখন ক্লাস সিক্স। তখনি মনে হত বুড়ো যদি নিরুর দুঃখ বুঝেই ছিল ,নিরুকে না মেরে ফেললেই পারত, ওর বর তো ওকে নিয়েই যাবে বলেছিল তাঁর কর্মক্ষেত্রতে, তাহলে নীরুকে মরতে হল কেন? যে যাই বলুক বুড়ো কিন্তু তাঁর বৌটিকে জোড়াসাঁকোর উনকোটি ঝঞ্ঝাট থেকে সরিয়ে, সঙ্গে করে ভুবনডাঙ্গা পেড়িয়ে নিয়েই এসেছিল তাঁর এই ইশকুলের চৌহদ্দিতে । বউটিও তেমন লক্ষীমতি, পরান ঢেলে বুড়োর ইশকুলের সেবা করেছিল ।
বুড়োর নায়িকারা (চিত্রাঙ্গদা ব্যাতিক্রম) কিন্তু কেউ সন্তানবতী নয়। সকলেই ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্না । সাজগোজে তেমন মতি নেই, ওই তাঁতের শাড়ী আর জুঁইয়ের মালাতেই অনন্যা । আচ্ছা বুড়ো নায়িকাদের, মানে হাল ফ্যাশনের ‘উম্যান অফ সাবসট্যান্সদের সন্তান দিতেন না কেন”? তাদের অন্য কাজ ছিল বলে? মানে ওই দেশের সেবা, দশের সেবা করতে যাওয়া আর কি । যে বুড়োর মধ্যে শিশু ভোলানাথ আছে সে কি শিশুদের না ভালবেসে পারে ? শিশুদের নিয়েই তো তাঁর যত মাথাব্যাথা , তাদের ইশকুল নিয়েই তাঁর যত চিন্তা ভাবনা, উৎসবের সমারোহ । তবে কেন চারু (সৃষ্টিশীলা), বিনোদিনী, বিমলা কারুর সন্তান নেই ? সন্তান থাকলে তাদের নিজেদের সামলাতে সুবিধে হত না? নাকি বুড়ো তাঁর শিশু ভোলানাথকে চব্বিশ ঘন্টা মায়ের কোমল আঁচলের ছায়াটি দিতে চেয়েছিল? অন্য কাজে মা থাকলে শিশুটি যদি অবহেলিত হয় ?
বুড়ো ” ওস অফ ওয়ার্কিং ওম্যান’ বুঝেছিল নিশ্চয়ই । মায়েরও তো কষ্ট হয় শিশুটিকে ছেড়ে কাজে যেতে এমন করে আমাদের কথা কেই বা বুঝেছে?
এ সব কথা বুড়োকে জিজ্ঞেস করেছিলাম , এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে ছাতিমতলা থেকে আম্রকুঞ্জর ভিতর দিয়ে হাটতে হাটতে । বুড়ো মুচকি হেসে দাড়ী দুলিয়ে তাঁর ভাস্করের ভাস্কর্য বাতিদানের দিকে চলে যেতে যেতে বললে ” উহু সব তো আমি বলব না । আরো পড় । পরীক্ষার পড়া না পড় , আমাকে পড় ।” এই বলে বুড়ো গভীর চোখে তাকালে । আমি গেলাম ভ্যেব্লে ।
পরদিন ২৫ শে বৈশাখ , বুড়োর জন্মদিন ছিল । উত্তরায়ণের বাগানে বসে গান গান শুনতে শুনতে দেখলাম বুড়ো অলিন্দে এসে দাঁড়িয়ে হাসছে, সেই ইঙ্গিতপূর্ন হাসি যার মানে অনেককিছু ।
শুভ জন্মদিন দেড়েল বুড়ো ।
ভালো থেকো । বেশি আমি পড়াশোনা করতে পারব না, এই বলে দিলাম হ্যাঁ ।