ক্যাফে নিবন্ধে উজ্জ্বল সামন্ত

পরিবার – পেশা – পলিটিক্স

কর্মই ধর্ম। পেশা বা জীবিকা ই, অন্নের সংস্থানের মূল উদ্দেশ্য নিজের বা পরিবারের জন্য। পেশা বা জীবিকা , যুগে যুগে সময়ের পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সমাজে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে।ভারত বর্ষ একটি বিরাট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

রাজনীতি অর্থাৎ Politics শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ Polis থেকে, যার অর্থ শহর-রাষ্ট্র। এক কথায় রাজনীতি হল একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া যা কোন রাষ্ট্র জাতি বা সম্প্রদায়কে বা দলকে সমষ্টিগত ভাবে পরিচালনা করে ।এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে গঠিত যা জনসাধারণের চাহিদা পূরণ করে তা নিশ্চিত করতে একসাথে কাজ করে। রাজনীতি স্থানীয়, জেলা, রাজ্য বা জাতীয় স্তরে গঠিত হয়। গণতন্ত্রে, নাগরিকরা পঞ্চায়েত বিধানসভা লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ভোট দেয়, এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে জয়ী দল সরকার গঠন করে। রাজনীতিও একটি পেশা বা জীবিকা, সমাজবিজ্ঞানও বলা যায়।

দৈনন্দিন জীবনেও ঘরোয়া রাজনীতি রয়েছে। একান্নবর্তী পরিবারের থাকাকালীন তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একটি সংসারের সর্বময় কর্তা যিনি, তাঁর হাতে অধীনস্থ থাকতো এই অদৃশ্য ক্ষমতা। কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে পরিবারের অন্য সদস্যদের মতামত থাকলেও সর্বশেষে তাঁর মতামতই প্রাধান্য পেত। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তা মান্যতা দিত। এখানে ভোটাভুটির বালাই নেই।

ঘরোয়া রাজনীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে মনে পড়ে যায় “রামায়ণ ,মহাভারত মহাকাব্যের কথা। ক্রেতা যুগে রাজা দশরথ যুদ্ধক্ষেত্রের জীবন রক্ষায় স্ত্রী কৈকেয়ীর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন ‌‌। পরবর্তীকালে কুচক্রি মন্থরার পরামর্শে নিজের পুত্রকে রাজ্য লাভের আশায়, বড় সতীন কৌশল্যার পুত্র শ্রী রামচন্দ্রকে চোদ্দ বছরের জন্য বনে পাঠায়, এ কারো অজানা নয়।

মহাভারত তেমনি একটি সমাজবিজ্ঞানের রূপরেখা যেখানে শকুনি তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহার ফলে কৌরব এবং পাণ্ডবদের মধ্যে জন্ম লগ্ন থেকে বিভেদ সৃষ্টি করে। ঘরোয়া রাজনীতির জটিল অঙ্কে, পাশা-খেলার ফাঁসে পান্ডবদের সম্মানহানি ও দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে সামাজিক অবক্ষয় ও এই অন্যায়ের সমর্থনের ফলে হস্তিনাপুরের রাজা ধৃতরাষ্ট্র পুত্র স্নেহে অন্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরোধিতা না করে নিশ্চুপ থেকে, কুরুক্ষেত্রের মহারণে পরিণত হয়। কৌরব কূলের বিনাশের মাধ্যমে ধর্মরক্ষা বা ন্যায় বিচার হয়েছিল।

বিভিন্ন ধরনের পেশার মধ্যে। ১. ব্যবসা অর্থে নিজস্ব মালিকানাধীন পেশা, ২. সরকারি চাকরি ও ৩. কোম্পানির চাকরি, ৪. রাজনীতি (এটি ও একটি পেশা)।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীর সংখ্যা যেমন একদিকে বাড়ছে। অন্যদিকে শিল্প কলকারখানার কঙ্কালসার রূপ, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার গেটের বাইরে বড় তালা প্রমাণ করছে কর্মসংস্থান কমছে। কোভিড চলাকালীন, লকডাউন বা তার পরবর্তী সময়ের কঠিন আর্থিক পরিস্থিতি এখনো চোখের সামনে ভাসে। ওই সময়ে বড় বড় তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানির কর্মী ছাঁটাই রাজ্য বা দেশীয় অর্থনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল অনেকটাই।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যেখানে প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যা।
পশ্চিমবঙ্গে মেধা আছে , জনসম্পদ আছে কিন্তু উন্নত কর্মপরিবেশ নেই। একটি কারখানাকে কেন্দ্র করে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক রূপরেখা পাল্টাতে পারতো কিন্তু সেখানেও রাজনীতির খেলায় শিল্পের ভবিষ্যৎ বা কর্মসংস্কৃতি নষ্ট হয়েছিল। মাশুল গুনেছে শিক্ষিত বেকার ও পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক পরিকাঠামো। রাজনীতি বিরাজমান সমাজের সর্বস্তরে।

সরকারি অফিসগুলোতে যেমন দিন দিন কর্মী সংখ্যা কমছে অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও কোন কোন দপ্তরে দুই তৃতীয়াংশ এই চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীরা রয়েছেন যারা অমানুষিক পরিশ্রম করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বা স্কীম এ ন্যূনতম দৈনিক বা মাসিক ভাতায় পরিষেবা দিয়ে চলেছেন। দৈনন্দিন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বর্তমান বাজারের মূল্য দরের সঙ্গে হয়তো তাঁদের সমাজ জীবনের খাপ খাচ্ছে না, সামঞ্জস্য রেখে চলতে হচ্ছে সবকিছুতে। ছুটির দিনেও দিন রাত এক করে কাজ করতে হচ্ছে বাধ্য হয়েই অফিস বস/ ঊর্ধ্বতন অফিসারের whatsapp নির্দেশিকায়। চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ করার ভাষা ও সাহস রাখা নেই, বিষ দৃষ্টি বা কোপে পড়ার ভয়ে। অন্যদিকে সরকারি কর্মীরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ধরনায় বসছেন। ভারতবর্ষে অন্যান্য রাজ্যের থেকে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরি প্রাপ্ত কর্মীর মাসিক প্রাপ্যের পরিমাণ কম শতাংশের বিচারে।

“সমকাজে সমবেতন আইন” কার্যকর হচ্ছে না, নীতিকথা হয়েই থেকে যাচ্ছে ।

গ্রামাঞ্চলে বা শহরে শিক্ষিত,অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবক কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা দলে নাম লিখিয়ে পার্টির কর্মসূচি মেনে জীবিকা ও দৈনন্দিন সংসার যাপন করছে। রাজনীতি কর্দমাক্ত জেনেও বাধ্য হয়েই অনেকে যোগদান করছেন । বিভিন্ন সরকারি সুবিধা বা ভাতা বা নতুন গৃহের আশায়, ইচ্ছে না থাকলেও কোন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে মিটিং মিছিল এ ঘুরতে বাধ্য হচ্ছে। নৈতিক সমর্থনে প্রশ্নচিহ্ন রয়ে যাচ্ছে।

কর্মসংস্থানের কঙ্কালসার চেহারা দেখা যাচ্ছে চাকরিতে দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ফাঁসে জর্জরিত দপ্তর প্রায় দিশাহীন। আইন/ আদালতই এখন একমাত্র ভরসা যে কোন অন্যায়ের ন্যায় বিচারে। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবকরা দিনের পর দিন ধরনায় বসছেন ন্যায্য চাকরির দাবিতে। অনশন, আন্দোলন বিপ্লবের জন্ম দেয়। বিপ্লবকে কোন কিছুতে রোখা যায় না। আশ্চর্য লাগে বুদ্ধিজীবী মহল কেন নিশ্চুপ হয়ে রয়েছেন? কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার কোপে বা ভয়ে! আন্দোলন, প্রতিবাদ বা ধর্মঘট পশ্চিমবঙ্গের বুকে নতুন নয়। একযুগ আগেও এমন একটা সময় ছিল, যখন মাসে একটা দুটো ধর্মঘট হয়নি ,রাস্তায় মিছিল হয়নি, জল কামান বা পুলিশ কে রাস্তায় নামিয়ে মিটিং বা মিছিল প্রতিহত করার চেষ্টা হয়নি।

অন্যায়, প্রতিবাদে, দাবিতে মিটিং মিছিল হবে রাস্তায়, এটাই স্বাভাবিক। রাস্তায় যানজট, ট্রাফিক পরিষেবা ব্যাহত হবে। কবির ভাষায়.. রাস্তা কারো একার নয়।

কর্মসংস্থান, শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকছে যখন গণিত বা ইংরেজিতে মাস্টার ডিগ্রী করা শিক্ষিত যুবকরা টোটো রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। শিক্ষার মান অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।

“আচ্ছে দিন কি কবি নেহি আয়েগা?

মহান কবি র চারটি লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে

শিক্ষা যদি রিক্সা চালায়,
যদি মূর্খ করে শাসন!
আটকাতে যে পারবে না কেউ,
অনিবার্য সমাজের পতন…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।