ছোটদের জন্যে বড়দের লেখায় সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে ঊশ্রী মুখোপাধ্যায় (নব্বইয়ের গল্প – ৮)

“জ্যোতি বাবু চলে গেল”

BCE, মানে, যারে বলে কিনা বিফোর ক্রাইস্ট এরা। আজকালকার ওল্ড নর্মাল নিউ নর্মাল এর চক্করে কেউ কেউ বিফোর করোনা এরা ও বলেন, ওতে ইস্টাইল বাড়ে। তবে এছাড়াও, এই আমরা, যারা নিজেদের নব্বইয়ের ছানাপোনা বলে থাকি, তাদের ছিলো আরো এক ধরনের BCE, যাকে বলে বিফোর সিইএসসি এরা। সেসময় ঘরের এক কোণে কাঠের মজবুত সুইচবোর্ডে শোভা পেত গোলগাল কালোকোলো শক্তপোক্ত সুইচের দল আর তাদের কল্যাণেই ঘড়ঘড়িয়ে চলত বিশালাকার ডিসি পাখা, জ্বলত ঘোলাটে হলুদ বাল্ব, বা কম ভোল্টেজের টিউব। আরে দাঁড়ান মশাই, আসল কথাই তো বলিনি। এগুলো তখনই জ্বলত বা চলত যদি ইলেকট্রিক সাপ্লাই দিত রাজ‍্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। ‘যদি’ শুনে বোঝাই যাচ্ছে যে গল্পে এই শব্দটিই যত নষ্টের গোড়া। আর ভবিষ‍্যতের কথা এখনো জানি না, এনার কল্যাণে আমাদের অতীত স্মৃতিতেও মাঝেমধ্যে অন্ধকার নেমে আসত। আরে হ্যাঁ, সেই অধুনালুপ্ত লোডশেডিং এর কথাই বলছি আর কি।
ছোটবেলায় যেমন হয় আর কি, যে কোন বাচ্চার মত আমার বা আমার বন্ধুস্থানীয়দের বিভিন্ন রকম আওয়াজে বিশেষ রুচি ও আগ্রহ ছিল। মেলায় গেলে অবধারিত ঢোল আর বাঁশি কেনা তো ছিল‌ই, সেই সঙ্গে বাড়ির ডিসি পাখার ঘটঘটাং, পেল্লাই ফ্রিজের গোঁ গোঁ, আর বাক্স টিভির ঝিরঝির সবেতেই প্রবল মজা পেতাম। এদের মধ্যে বলা বাহুল্য টিভিটাই ছিল বেশি পছন্দের কারণ টিভিতে রাম লক্ষ্মণ, হনুমান, তাড়কা রাক্ষুসী, বিক্রম-বেতাল, ভীম অর্জুন সবাইকে দেখা যায়, আরো অনেককে দেখা যায় যাদের তখন চিনতাম টিনতাম না। তবে উত্তমকুমার আর ‘আমিতা বচ্চন’ নামদুটো শোনা ছিল। সেই মজার বাক্স‌ও যে ইলেকট্রিকে চলে আর মাঝেমাঝেই বন্ধ হয়ে যায়, এটা মোটেই মেনে নেওয়া যেত না। এমনিতেই প্রায় সন্ধেবেলাই হঠাৎ করে সারা পাড়া ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যেত, আর পাড়ার সব বাড়ি থেকে “যাআআআআহহ” বলে একটা সমবেত আওয়াজ আসতো। আর তার মধ্যে কানের কাছেই শোনা যেত,”এই যা, আজও জ্যোতি বাবু চলে গেল!”
কেসটা কি? আলো তো রোজ নিভছে, তার সঙ্গে জ্যোতি বাবুর কি? তদ্দিনে শিখে গেছিলাম যে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী র নাম জ্যোতি বসু, আর কিছু না বুঝেই ভদ্রলোকের ওপর একটু কৃতজ্ঞ ছিলাম যে সাধারণ জ্ঞানের জন্য নতুন নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম মুখস্থ করতে হলেও, পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রীর নাম নিয়ে এই ঝামেলা ছিল না। কিন্তু কারেন্টের সঙ্গে এনার কি? পরে জেনেছিলাম যে বিদ্যুৎ পর্ষদের দপ্তরটিও ইনি বহুদিন সামলেছেন, তবে সেসব জ্ঞান বড়বেলার। তার আগে লোডশেডিং হলেই কাকু বা দাদাস্থানীয়রা জ্যোতি বসুর নাম‌ই করতেন, আমরাও বিশ্বাস করতাম যে উনি কারেন্ট যখন তখন অফ করে দেন তাই লোডশেডিং হয়। এই কারণেই একবার “আবার যখের ধন” সিরিয়াল চলাকালীন মানিকবাবু রূপী দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘বিমলবাবু ভাই, কুমারবাবু ভাই, আমি ভয় পেলেই চানাচুর খাই’ এর মত মজার দৃশ্যের অর্ধপথে আলো নিভে যাওয়ায় বেচারি জ‍্যোতিবাবুর উদ্দেশ্যে যা যা বলা হয়েছিল তা স্মৃতিতেও না আনাই ভালো।
বড়রা প্রমাদ গুণলেন। একে মেয়ে ভিতু, অন্ধকার হলেই রাক্ষসী রানীর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে, তার ওপর “জ‍্যোতিবাবু চলে গেল” বাক‍্যবন্ধটিকে এত সিরিয়াসলি নিলে তো সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। ফলে তাঁরা নতুন পদ্ধতির সাহায্য নিলেন। আলো নেভা মাত্রই যেখানে ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হ‍্যারিকেন, মোমবাতি বা ল‍্যাম্প, সেখান থেকে সরিয়ে ছোটদের নিয়ে যাওয়া হত উঠোনে। সারিসারি মাদুর পাতা, পাশে জলের বোতল আর হাতপাখা। উঠোন জুড়ে ফুটফুটে চাঁদের আলো, আর মাথার উপর টুপটাপ ডালিম ফুলের পাপড়ি বা শিউলি-টগর। একপাশে গন্ধ ছড়াত কামিনী আর গন্ধরাজ, আর তার মাঝখানে শুয়ে শুয়ে গল্প শোনা। ছোট্ট গোল রুটি, চলছি গুটিগুটি। লোডশেডিং কেও আদর করে ঘরে ডাকা যেন। পড়াশোনার‌ও ছুটি। এভাবে আরাম করতে করতে হঠাৎ চোখ ধাঁধিয়ে রাস্তা আর বাড়ির আলোগুলো জ্বলে উঠত, আর সারা পাড়ায় একটা “হোওওওওওও” চিৎকার। ব‍্যাস, মাদুর গুটিয়ে ঘরে ঢোকা।
আরেকটু বড় হতে, ভয় ভাঙল, তবে লোডশেডিং যেই কে সেই। আড্ডার সময়‌ও কমল কারণ পড়ার ছুটি সবসময় পাওয়া যেত না। তাও মাঝেমাঝে আড্ডা বসত, তখন আলো নেভালেই ভূতের গল্প। জেঠতুতো খুড়তুতো, কখনো মামাতো পিসতুতো ভাইবোনেরা একসঙ্গে। যার ঝুলিতে যত ভয়ের গল্প, তার খাতির তত‌ই বেশি। এই সব দিনেই প্রথম পরিচয় হয়েছিল ড্রাকুলার সঙ্গে, জম্বির সঙ্গেও। শুধু ছায়ামূর্তি বা লম্বা হাত নয়, যথেষ্ট খুন জখম রক্ত না থাকলে ভূতের গল্প জমত না। দাদারা আবার র‍্যামসে ব্রাদার্স এর সিনেমার ব‍্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এর অনুকরণ করে গল্পকে করে তুলত আরো লোমহর্ষক। তবে অন‍্য কিছুও যে হত না তা নয়। দাদাদের ভূতের গল্পের আসর ছেড়ে মাঝেমধ্যে ঢুকে পড়তাম দিদিদের নিষিদ্ধ সিনেমার গল্পের আসরে, আবার মোমবাতির আলোয় হাতের আঙুল দিয়ে দেওয়ালে জন্তুজানোয়ারের ছায়া তৈরি করাও ছিল দারুণ মজার। কখনো সখনো বড়রা গান‌ও করত, আর আমাদের দিয়ে ছড়া বলানোর এক জোরদার চেষ্টা চলত। লোডশেডিংয়ের একটা কমন ছড়াও ছিল, ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের, বহু ব‍্যবহৃত,
“দিল্লি থেকে বিল্লি এল
দুধের মত সাদা,
কলকাতার এক কালো বেড়াল
বলল তাকে,”দাদা
আসুন বসুন কেমন আছেন
বাড়ির খবর ভালো”?
সাদা বেড়াল বলে
“তোমার রংটা কেন কালো?”
কালো বলে, “বলছি দাদা
রাখুন তবে বেডিং
আমি যখন জন্মেছিলাম
হয়েছিল লোডশেডিং”।

আজকাল আমরা লোডশেডিং বলি না,পাওয়ার কাট বলি। নয়ত ফল্ট। কালেভদ্রে হয়, কাঁদিয়ে ছাড়ে। উঠোন আড্ডাও এখন অতীত, সময়ের দাম বেড়েছে, বেড়েছে গ্রীষ্মবোধ, হাতপাখাতে কাজ হয় না। আড্ডা রয়েছে স্মৃতিচারণে, মানুষদের বয়স বেড়েছে। কে জানে ভালো হয়েছে না মন্দ। আর হ্যাঁ, জ্যোতি বাবুও অনেকদিন চলে গেছেন। আলো না নিভিয়েই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।