মাস তিনেক আগের কথা। বেশ জোরদার লকডাউন চলছে। কাজকর্ম, বাইরে বেরোনো সব বন্ধ। বইপত্র, ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে গয়ংগচ্ছ দিন কাটছে। এরকমই একদিন রাতে খাওয়ার পর বিছানায় লম্বা হয়ে মোবাইল ডেটা অন করতেই এক কান্ড। আমার পেয়ারের পোষা স্মার্টফোন হঠাৎ পটলডাঙার প্যালারামের পালাজ্বরের পিলে হয়ে এমন কাঁপতে শুরু করল যে থামার নাম নেই। বলি ব্যাপারটা কি হল অ্যাঁ? একটু পর বোঝা গেল যে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমার ফোন নম্বরটি যুক্ত হয়েছে আর সেখানেই মেসেজের সুনামি। গ্রুপের নাম শিশু শিক্ষা নিকেতন। ‘শিশু শিক্ষা নিকেতন’! হঠাৎ করেই যেন পিছিয়ে এলাম অনেকগুলো বছর। চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা পুকুরধারের ছোট্ট ইস্কুলবাড়ি। গ্রুপ মেম্বারদের নামে চোখ বোলাতে বোলাতে স্মৃতির ধুলো সরিয়ে বেরিয়ে এল কয়েকটা প্রিয় অথচ আপাতবিস্মৃত নাম,’জয়’, ‘সোমশুভ্রা’, ‘শাশ্বতী’, তিন অভিজিৎ যাদের নাম এক হওয়ায় পদবী ধরে ডাকা হত, ‘মেঘা’, ‘প্রিয়াংশু’, ‘কৃষ্ণেন্দু’, ‘ঝিল্লি’, ‘মনোজিৎ’। যারা কয়েকজন হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া তে ছিল, হঠাৎই এসে জুটেছে সবাই, দেখা হওয়ার আনন্দে মশগুল। এ আনন্দ নির্ঘাত ছোঁয়াচে, তাই দেরি করতে ইচ্ছে করল না, যোগ দিলাম গল্পে, বলা ভালো স্মৃতিচারণে।
-“আরে এই যে দিদিমণি, এসে গেছেন? একদম অন্য রকম দেখতে হয়ে গেছিস তো?”
–” কেন তোরা কি হোস নি? ওরে, বয়েস কিন্তু বাড়ছে আমাদের। অনেকেরই রীতিমতো ফ্যামিলি আছে।”
–“সে থাক,কিন্তু বয়েস হয়েছে কে বলল শুনি? আমার তো এখন মনে হচ্ছে অন্তত কুড়ি বছর বয়েস কমে গেল। এই তোদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আর কি!”
–” হ্যাঁ ভুল বলিসনি শেঠ(তিন অভিজিৎ এর একজন)। আসলে এটা ভেবেই গ্রুপটা তৈরি করা, যাতে অনেকদিন পর আবার সেই ছোট্টবেলার প্রাইমারি স্কুলের দিনগুলো বাঁচা যায়। তারপর দেখলাম তোদের অনেকের সঙ্গে যখন যোগাযোগ আছেই, তো..”
–“এর জন্য তোকে একটা বড়সড় থ্যাঙ্কস দেওয়া উচিত সোমশুভ্রা। সত্যি তোদের সবার সঙ্গে কথা হয়ে মনে হচ্ছে সেই চুরানব্বই- পঁচানব্বই সালে ফিরে গেছি, আমাদের সেই পুরোনো স্কুলে, ক্লাসে বসে আছি, দিভাই বলে ডাকছি দিদিমণিদের,হিসুপটিকে ছোটবাইরে-বড়বাইরে, বদমাইশি করছি, আবার স্কেলের বাড়িও খাচ্ছি। উফফ, কত্ত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে রে!”
–“ঠিক বলেছিস শাশ্বতী। বড় হয়ে গেছি সবাই, কিন্তু ছোটবেলার, বিশেষ করে স্কুলের কথা উঠলেই আর নিজেকে আটকাতে পারি না। কি সব দিন ছিল বল তো! সকাল বেলা স্কুলে গিয়ে লাইন দিয়ে প্রেয়ার, তারপর সরস্বতীর ধ্যান, মনে আছে?”
–“হ্যাঁ থাকবে না আবার! ওটা তো রীতিমতো যন্ত্রণা ছিল। চোখ বন্ধ করে পাঁচ-পাঁচটা মিনিট পদ্মাসনে বসে থাকা। তুই কি একদিনও পুরো সময় স্হির হয়ে বসতে পেরেছিলি, ভেবে বল তো জয়?”
–” মাথা খারাপ নাকি? তখন তো আমি আর ভটচায(২য় অভিজিৎ) বদমাইশির ফন্দি করতাম, আর তখনই হঠাৎ পিঠে রীতা দিভাই এর গুম গুম”।
–” সিরিয়াসলি। তবে পেটানোর ব্যাপারে দিভাই কিন্তু খুবই সাম্যবাদী ছিলেন। যখনই ক্লাসে হল্লা হত, উনি এসে প্রত্যেকের পিঠে এক ঘা করে স্কেলের বাড়ি দিয়ে যেতেন, কেউ বাদ যেত না। এখনকার বাচ্চাদের ওসব করলে আর দেখতে হবে না!”
–“এখন কি আর আমাদের মত শাখামৃগ টাইপ ছাত্রছাত্রী আছে নাকি? সব তো গুড বয় গুড গার্ল। আর তখন ভাব, জয় আর ভটচায এমন মারপিট করল যে দুজনে দুজনকে পেনের খোঁচা মেরে রক্তারক্তি কান্ড। সারা স্কুল সামলাতে পারে না। প্রিয়াংশু বেচারাকে নিরীহ পেয়ে নাম দেওয়া হল পচা, আবার সে নামের নামতাও হল,পচা এক্কে পচা পচা দুগুনে চাচা। এত কান্ড করলেও পাশে পুকুর, তাই বাইরেও বের করে দিতে পারতেন না দিভাইরা।”
–“তুই কিন্তু তখন মহা ভিজেবেড়াল ছিলি ঊশ্রী। সাত চড়েও রা বেরতো না। অবশ্য সবকটা মেয়েই মোটের ওপর ভালো ছিল, দিভাই রাও ভালোবাসতেন। খালি ঝিল্লি ছিল আমাদের দলে। ”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোর আর ঝিল্লির যেমন জয়েন্ট ভেঞ্চার এ দুষ্টুমি, তেমনই মাথায় একই রকম খোঁচা খোঁচা চুল ছিল জয়। ইতি দিভাই তো বলতেন, যাদের মাথায় খাড়া খাড়া চুল তারা মহা বদমাইশ হয়”।
—“ওরা তো শাস্তিও সেরকমই পেতো। একবার জয় কি একটা দুষ্টুমি করেছিল তাই ওকে পদ্মপিসির(অশিক্ষক কর্মচারী) কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল। আর তাতে জয় স্কুলে সারাদিনের সব রকম ঘন্টা বাজিয়েছিল। সে শাস্তি দেখে আমাদের কি হিংসে!”
–“সত্যি, তখন স্কুলে ঘন্টা বাজাতে পারলে, ফাংশন এর আগে হারমোনিয়াম আর তবলা বাজাতে পারলে, ক্লাসে পড়ার বদলে গল্প হলে কি মজাই না হত! গল্পের আলাদা একটা ক্লাস ছিল, যেখানে প্রথম শাশ্বতীর মুখে শুনি শেক্সপিয়র এর গল্প, সানুজা দিভাই সেই কল্পনাকেই আর এক ধাপ এগিয়ে পরিচয় করিয়েছিলেন জিম করবেট, এইচ .জি.ওয়েলস, কেনেথ অ্যান্ডারসনের সঙ্গে। তার পাশাপাশি রূপকথার গল্প তো ছিলোই।শাশ্বতীর প্রিয় সাতঘড়া মোহরের গল্প।”
–“শুধু গল্প! কি দারুণ ফাংশন হত বল টাউনহলে? আর সবাইকে ফাংশনে কিছু না কিছু করতে নিতই। কেউ বাদ ছিল না। সোমশুভ্রা নাচত, ঊশ্রী, কৃষ্ণেন্দু গান করত, নাটকের মেন রোলটা ছিল শেঠ এর জন্য বাঁধা। এভাবেই করেছিলাম অজস্র নাটক, হযবরল, আসল রাজা, কাকাজু। তোর মনে আছে মনোজিৎ তুই হযবরল তে কিরকম কুমির সেজেছিলি?”
–“খুব মনে আছে মেঘা। ওটায় বালক ছিলি তুই। আমাদের সবাইকে কস্টিউম দেওয়া হয়েছিল, তোর খালি পাজামা পাঞ্জাবি।”
–” শুধু ফাংশন কেন, স্পোর্টস, সবাই মিলে শীতকালে বইমেলা যাওয়া, লরি করে পিকনিক, আনন্দ কম ছিল নাকি? আর স্পোর্টস এ তো জয় আর ঝিল্লি সবথেকে বেশি প্রাইজ পেত”।
–“যেমন শেঠ প্রাইজ পেত অঙ্কে, ঊশ্রী সোমশুভ্রা বাংলায়, শাশ্বতী আঁকা আর হাতের লেখায়, আর মনোজিৎ ১০০% উপস্হিতির। ”
–“প্রাইজগুলো কি দারুণ ছিল! প্রথম দিকে রাশিয়ান বই, তারপর দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী। মুগ্ধ হয়ে পড়তাম।”
–“সরস্বতী পুজোর কথা ভুলে গেলি? কি সুন্দর ঘরোয়া জলসা হত!”
–“ভাই খালি যদি সংস্কৃতির কথাই বলিস, পুরোটা কিন্তু বলা হয় না। কিঞ্চিৎ হিন্দিও কি চলত না?”
–“খুব চলত রে পোড়েল(অভিজিৎ ৩)!তবে এ ব্যাপারে একটু লাইসেন্স ছিল। প্রতি শুক্রবার টিফিনের পর হিন্দি গানের আন্তাক্ষরি খেলতে দেওয়া হত আমাদের। তবে একজন দিভাই নজরদারিতে থাকতেনই যাতে ‘তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত’ বা ‘সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’ না গেয়ে ফেলি। এখন এগুলো ভাবছি, বেজায় হাসি পাচ্ছে। কি সব দিন ছিল”।
—” জানিস, এই সব কিছুর পরেও কয়েকটা কথা মাথায় ঘুরছে। আমাদের ঐ স্কুলটাতে তো এমন কিছুই ছিল না যা কুলীন ইংলিশ মিডিয়াম গুলোর আছে। বৃষ্টিতে ছাদ দিয়ে জল পড়ত, ম্যানার্সহীন আমরা সামনের পুকুরে ব্যাংবাজি খেলে, পিছনের ফাঁকা জমিতে হুটোপুটি করে, দিভাই দের আদর আর মারধোর দুটোই খেয়ে দিব্যি তো ছিলাম। এমন কি ছিল সেই সময়টায়, সেই স্কুল বাড়িটায়, সেই দিনগুলোতে? প্রশ্নটার উত্তর যখন খুঁজি, তখন এটাই মনে হয় যে ঐ ছোট্ট স্কুল আমাদের পুরো ছোটবেলা বাঁচতে দিয়েছিল, কোন আশা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার বোঝা চাপিয়ে নিজের স্বাভাবিক আনন্দকে,বেড়ে ওঠাকে আটকে দেয়নি, টিফিন ভাগ করতে শিখিয়েছে শুধু বন্ধুদের না,দিভাইদেরও সঙ্গে, তাই হয়ত আমরা আজ যা’ই হই না কেন, ভেতরে ভেতরে শিশু শিক্ষা নিকেতন এর সেই দুষ্টু ছেলেমেয়েই আছি, আর হয়ত চিরকালই থাকব,নিজের মনের ভেতর স্কুলবাড়িটাকে যত্ন করে গুছিয়ে রেখে।”
–“টাইপিং…”
—“টাইপিং…”
–“টাইপিং..”
–“দিলেন তো দিদিমণি সেন্টি করে! যাক দিলেনই যখন তখন এতকাল পরে হওয়া যোগাযোগ বন্ধ করবেন না। দেখা হোক, কথা চলুক।”
-“একদম”।
রাত বাড়তে থাকায় এরপর অজস্র গুডনাইট বলে কথাবার্তা সে রাতের মত শেষ। তবে না, ঠিক শেষ নয়, নতুন করে শুরু, যেখানে হয়ত ফোন বন্ধ করে প্রত্যেকে ফিরে গেছে সেই ক্লাসরুমে, সাদা মেরুন ইউনিফর্মে, টিফিনের বাদাম দেওয়া চাউচাউতে, ফাঁপিয়ে চুল বাঁধা সানুজা দিভাই এর প্রশ্রয় মাখা হাসিমুখের সামনে। চোখ জুড়ে আসছে প্রশান্তিতে আর অনেক দূর থেকে গভীর রাতের রেডিওতে মায়া ছড়াচ্ছেন অরিজিৎ সিং,…”ইয়াদোঁ কে পুরানে অ্যালবাম মে, ছুপা কে রাখখে হ্যায়,হামনে উয়ো দিন…..”