গ এ গদ্যে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক

এঁটো পাতা

‘এঁটো পাতা কী স্বর্গে যায়? যায় না,’ বলে গজগজ করতে করতে সৌদামিনী দেবী হাতের হারিকেনটা নামালেন, সদর দরজার বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনির লোহার বালাটাকে ঘোরাতেই ভিতর থেকে ছিটকিনি পড়ে গেল; দরজা বন্ধ হয়েছে দেখে, হারিকেনটা হাতে তুলে মুখ ভার করে প্রতিদিনের মত সন্ধ্যে বেলায় ও পাড়ায় হরেকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বাড়িতে সংকীর্তনের আসরে যোগ দিতে গেলেন, আসবেন সেই দশটা বাজলে, অঞ্চলের কারখানাগুলোর রাতের শেষ ‘ভোঁ’ বাজা শেষ হলে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, প্রতিদিনই তাঁর ওখানে যাওয়া চাই-ই। এ নিয়ে সত্যসাধন বাবুর সঙ্গে তাঁর বচসা হয়েছে অনেক, তবু তিনি অনড়। হয়তো সেই কারণেই সত্যসাধন বাবুও
আর বাড়িমুখো হন না।
ঘরে, তাঁর দুই সোমত্ত-মেয়ে। বড় সত্যভামা ও ছোট শিবানী। প্রথমজন, রবার্ট ব্রুসকে অনুসরণ করে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই চলেছে; এটা নিয়ে তিনবার হ’ল, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে নি; তাই ঘরে ফুঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পাশের ঘর থেকে ফোঁপানির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। শিবানী, ক্লাশ নাইনে পড়ে। বাড়ির অন্য অংশে ভাড়াটিয়া আছে, ওদের ভরসায় সৌদামিনী দেবী হয়তো আসরে যান বলে বোধ হতে পারে। বাড়ির মোট পাঁচখানা ঘরের মধ্যে
তিনটেতে ওনারা থাকেন, আর বাকি দুটো ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ওনাদের ঘর দিয়ে ভাড়া দেওয়া অংশে আসা-যাওয়া করা যায়। তাই সত্যভামারা নিজেদের দিক থেকে খিল দিয়ে রাখে। ভাড়াটিয়া সদাশিব বাবু, পাশের ঘর থেকে ফোঁপানির আওয়াজ পাচ্ছেন।
সদাশিব বাবুর একটি মেয়ে রত্না ও দুই ছেলে, বড় সঞ্জীব আর ছোট রঞ্জন। রত্না, সত্যভামার চেয়ে দু-এক বছরের ছোটো হতে পারে, কিন্তু শিবানীর চেয়ে বয়সে বড়। সত্যভামারা এ বাড়িতে আসায় রত্না একটু কথা বলার সঙ্গী পায়, এতদিন ওদিকটা খাঁ, খাঁ করতো। এ পাড়ায় তার সমবয়সী কেউই ছিল না। সত্যভামাদের সংগে রত্নার সম্পর্ক খুবই ভালো। এ বাড়িতে রত্নারা প্রায় দশ বছর ভাড়া আছে।
সত্যভামাদের এটা পৈতৃক বাড়ি। এতকাল ওরা মামার বাড়ির কাছে, হাওড়া-শিবপুরে বাসা-বাড়ি নিয়ে থাকতো। ওদের বাবা সত্যসাধন ঘোষ মশাই জিপিও-তে চাকরি করেন। আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্যই হোক বা সৌদামিনী দেবীর জবর-দস্তিতেই হোক তিনি শ্বশুর বাড়ির কাছেই ঘরভাড়ায় থাকতেন। মেয়েরাও কাছাকাছি স্কুলে পড়তো।
সদাশিববাবু দু’খানা ঘর নিয়ে থাকলেও মোটামুটি বাড়ি টা দেখভাল করতেন। সত্যসাধন বাবুর অনুরোধে পরিষ্কার করে অন্যান্য ঘর বসবাসের উপযোগী করে রেখেছিলেন–সব ঘরই টিপ-টপ;তাই সৌদামিনী দেবী যেদিন হঠাৎ- ই মেয়েদের নিয়ে এ বাড়িতে চলে এলেন, তিনি সেদিন অকুলস্থলে পড়েন নি।
সত্যসাধন বাবুর আত্মীয়রা যদিও পাশাপাশি থাকে,তবু বাড়ির রক্ষনাবেক্ষনের তুলনায় সম্পত্তি হাতাতেই উদগ্রীব;ওরাই এতদিন সদাশিব বাবুর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করতো। রসিদও দিত। সত্যভামারা এ বাড়িতে আসার পর সদাশিব বাবু মাসের পয়লা তারিখেই সত্যভামার হাতে ভাড়া দিয়ে রসিদ বুঝে নেন।
ভাড়াটিয়া তো, তাই ওদের আত্মীয়রা মধ্যস্বত্বভোগীদের মত
সদাশিববাবুদের সংগে আচরণ করে আসছে। খেলা-ধুলোর সময় ছেলেদের মধ্যে তর্কা-তর্কি, হাতাহাতি হতেই পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আত্মীয়রা ওদের ছেলেদের পক্ষ নিয়ে রে, রে করে ছুটে এসে “বাস তুলে দেব, ভাড়াটিয়াদের এতো আস্পর্দা” ইত্যাদি বলে শাসাতে
থাকে;এটা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে দাঁড়ায়। ছেলেদের খেলা-ধুলোর মধ্যে ঝগড়ায় গার্জেনদের মাথা গলানো সদাশিববাবুর একেবারে না-পসন্দ, আবার মনুষ্যেত্তর প্রাণীর মত ওদের সংগে ঝগড়াও করতে পারেন না। তিনি জানেন ঐ আত্মীয়দের বাড়িতে থাকেন না, ইচ্ছা করলে তিনি ওদের দু’চার কথা শোনাতে পারেন, কিন্তু তিনি বাক্-বিতন্ডার মধ্যে যেতে চান না, মনে মনে হাসেন।
তিনিও বর্ধিষ্ণু পরিবারের লোক। পল্লী-গ্রামে ছেলেদের পড়াশোনার সে রকম সুযোগ না থাকায় তিনি এই আধা শহরে বাসা-বাড়ি নিয়েছেন;নিজেও কাছের কারখানায় কাজ করেন। তাঁর বড় ছেলে সঞ্জীব, এবার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবে–এবার পরীক্ষা-ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ, সত্যভামাকে এবার নতুন পরীক্ষা-ব্যবস্থায় স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে হবে। সঞ্জীব, পড়াশোনায় মোটামুটি তবে রঞ্জন খুবই ভালো, অনেক দূর যাবে;শিক্ষকদের অভিমতও এটাই।
সৌদামিনীদেবীর ঈর্ষাও এই জন্য। যাই হোক, সদাশিববাবু মেয়ে ,রত্নাকে ক্লাশ এইটের পর আর পড়ান নি, সেও পড়াশোনায় আগ্রহী নয়, তাই তিনি তাকে তাড়াতাড়ি পাত্রস্থ করেছেন। এবার পূর্ণ নজর ছেলেদের দিকে।
বাবা-মা’র নজর না থাকলে ছেলে-মেয়েরা যে মানুষ হয় না, সেটা তিনি বোঝেন বিলক্ষণ। কথায় বলে, চারাগাছকে
বেড়া দিয়ে রাখতে হয়, কালে বড় হ’লে ঐ গাছে হাতিও বেঁধে রাখা যায়।
পুত্র-সন্তান নেই, তাই ভাই-ফোঁটার সময় সঞ্জীব, রঞ্জন দের
ফোঁটা দেয় সত্যভামা। এই ভাই-ফোঁটার আয়োজন চলে সাড়া দিন, পাড়া, বে-পাড়ার ভাই, দাদারা, সবাই ফোঁটা নিতে ওদের বাড়ি আসে। সদাশিববাবুরা সবই দেখেন, শোনেন;ওনারা তো সত্যভামাদের আত্মীয় নয়, ‘ভাড়াটিয়া’;ওদের আত্মীয়-স্বজনেরা অপরিচিতদের
কাছে পরিচিতি দেবার সময়”আমাদের ভাড়াটিয়া “বলে সম্বোধন করে। সঞ্জীব ও রঞ্জন মনে দুঃখ পায়, কিন্তু ওদের মত নীচে নামতে পারে না।
স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কয়েক মাস পর ফলও
প্রকাশিত হ’ল। সঞ্জীব, পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হয়েছে, সত্যভামা যথারীতি
অনুত্তীর্ণের দলে। ফল প্রকাশের পর কয়েকদিন ওদের দিক থেকে কোন শব্দ বা আওয়াজ শোনা যায় না। এখনও রবার্ট ব্রুসকে ধৈর্যের দিক থেকে ছুঁতে দেরী আছে, মোটে চারবার হয়েছে। সঞ্জীব, নৈশ-কলেজে ভর্তি হয়েছে, বাবার কারখানায় একটা চাকরি ও করছে। দিনের বেলায় কারখানা,সন্ধ্যা বেলায় উচ্চ-শিক্ষা—রোজগার ও শিক্ষা সমান্তরাল।
বাসা-বাড়ির সামনে খালি জায়গাটা সদাশিব বাবু কিনেছেন। সত্যসাধন বাবুর আত্মীয়দের মুখে ঝামা ঘষে ঐ জায়গায় একটা বাড়ি ও তুলেছেন। এখন তিনি এ পাড়ায় স্থায়ী বাসিন্দা, মিউনিসিপ্যালিটির একজন বোনাফায়েড ভোটার। সত্যভামা, প্রয়োজনে রঞ্জনকে নিয়ে কোথাও গেলে “আমাদের পুরোনো ভাড়াটিয়ার ছেলে” বলে পরিচয় দেয়। রঞ্জনের মনে কষ্ট হয়, কিন্তু প্রতিবাদে নীচে নামতে পারে না;পরিষ্কার বোঝা যায়, এ সব মন্তব্য ঈর্ষাজনিত। রঞ্জন, এবার স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষায় বসবে, সত্যভামা ও বসবে, জানা গেল। সৌদামিনী ও সত্যভামাদের “ঈর্ষার অনলে পুড়িতেছে প্রাণ”। রঞ্জনের পরীক্ষা শেষ। ফলও কয়েক মাস পর প্রকাশিত হয়েছে। রঞ্জন পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে, সত্যভামার অবস্থান অনড়, স্থির, অচঞ্চল;স্কুল পরীক্ষার শেষ ধাপ তার কাছে অনতিক্রম্য বলে বোধ হচ্ছে। ঈর্ষার অনল তুষের মত জ্বলছে, কালের প্রভাবে আগুন বৃদ্ধি পাওয়ায় রঞ্জনদের প্রতি অপমান করার আক্রোশের প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন রঞ্জন তো সহ্য করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো, “আচ্ছা, সত্যভামাদি, তোমরা হাওড়ায় যে বাড়িতে ভাড়া থাকতে, ঐ বাড়ির মালিক বা মালিকদের ছেলে-মেয়েরা, বুঝি তোমাদের ‘আমাদের ভাড়াটিয়ার মেয়ে বলে’ সম্বোধন করে?”।
এরপর আর সত্যভামা কোন জায়গায় রঞ্জনকে নিয়ে যায় না। রঞ্জন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং বোঝে ,এবার অন্যভাবে ঈর্ষার প্রতিফলন ঘটবে।
ভাই-ফোঁটার অনুষ্ঠানে দু’ভাই-ই যথারীতি যায়, এ পাড়া, ওপাড়ায়
দাদা, ভাইদের আগমনে সাড়াদিনই হট্টমেলা, শুধু সত্যভামার মামাতুতো সম্পর্ক জনিত দাদা, যাকে রঞ্জন ‘বংশী-ভাইয়া’বলে ডাকতো, ভালো বাঁশি
বাজাতো, তাকে আর দেখা যায় না। সত্যভামারা এখানে আসার পর প্রথম প্রথম ঐ বংশী-ভাইয়াই
ওদের ঘরে আসতো, কত গল্প, গুজব;রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত থাকতো। আগুন ও ঘি পাশাপাশি থাকলে ঘি গলতে কতক্ষণ! বিশেষ করে ঐ সময়কালে সৌদামিনীর অনুপস্থিতিই যত অনর্থের মূল।
কিছুদিন পরই ওরা কোলকাতায় চলে যায়, সত্যভামা নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই তাকে নার্সিং-হোমে ভর্তি করতে হয়। বংশী-ভাইয়াকে আর এ অঞ্চলে দেখা যায় না। সৌদামিনীর তুতো দাদা তাকে ভাগলপুরের আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঐ দাদার সংগে আর সেরকম সদ্ভাব আছে বলে মনে হয় না। যাই হোক, সদাশিব বাবুরা সব বুঝলেও, ওসব কথার মধ্যে থাকেন না।
রঞ্জন, উচ্চ শিক্ষায় একটার পর একটা পরীক্ষা য় সাফল্যের সঙ্গে উর্ত্তীণ হয়ে নিকটবর্তী কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছে। আর সেই কলেজেই সত্যভামা বি. এ কোর্সে ভর্তি হয়েছে; কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষায় বসে স্কুলের গণ্ডী অতিক্রম করেছে। রবার্ট ব্রুসকে ধৈর্যের পরীক্ষায়
হারিয়ে নবম চেষ্টায় সে সফল হয়েছে;সাফল্যই লোকে মনে রাখে, সাফল্যই বিবেচ্য, পথ, উপায় বা সময় তখন মুছে যায়, সবই অর্থহীন।
রঞ্জন, এবার পড়াশোনার জন্য
বিলাত পাড়ি দিচ্ছে। সৌদামিনী দেবী, বেশ কয়েকদিন রোগে ভুগে দেহ রেখেছেন। সত্যসাধন বাবু ও চাকরি থেকে অবসর নিয়ে রাস্তার দিকের ঘরে আস্তানা পেতেছেন, আর সাড়া দিনই ফুরুক, ফুরুক করে তামাকু সেবন করেন। বাড়িতে আর ভাড়াটিয়া নেই। আত্মীয়-স্বজনদের প্রচেষ্টায় নিজেদের মধ্যে পাত্র খুঁজে, শিবানীকে পাত্রস্থ করা হয়েছে। বড়, ‘আইবুড়ো’ থেকে গেল, ছোটর বিয়ে হচ্ছে;সবাই সব বোঝে, কেউই মুখ খোলে না, এটা বারোয়ারি ভাই -ফোঁটার জাল বিছানোর ফসল।
কোনরকমে কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষায় বসে সত্যভামা বি. এ পরীক্ষার গাঁট পাড় হয়েছে। স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটির কর্ম-কর্তাদের সাথে ঘনষ্ঠতার সুবাদে প্রাইমারী স্কুলে চাকরি হয়েছে। কালে, প্রধান শিক্ষিকা হ’য়ে অবসর নিয়েছে। এখন পেনশনভোগী।
সৌদামিনী দেবীর উক্তি, মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। স্বর্গে যাবার সোজা সিঁড়ি না ভেঙ্গেও বাঁকা পথে জাল বিছিয়ে ওপরে উঠার পথ যে মসৃন করা যায়, সৌদামিনী দেবীর তা অজানা ছিল।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!