সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ২০)

সাদা মিহি বালি

তৃতীয় পর্বের শেষাংশ 

দাস পরিবারের ছেলে, লোচনদাস, এভাবেই তার মা’র মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছে কি না, তা
রাঘবেন্দ্রবাবুর কাছে অনুমান সাপেক্ষই রয়ে গেল। ঘোষালদের নাক- কান কাটা গেছে। দাসেদের ঘরে, ঘোষাল বংশের মেয়ে স্ব- ইচ্ছায় গেছে;অন্তর্যামী হেসেছিলেন। জাত্যভিমান আজ খণ্ড- বিখণ্ড; ঈশ্বরের নিক্তিতে দান-
প্রতিদান নিঁখুত ভাবে পরিবেশিত হয়। রাঘবেন্দ্রবাবু, আকাশের দিকে মুখ তুলে কাকা পশুপতির মুখটা দেখবার চেষ্টা করলেন। ঠাকুরদার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত, তার প্রজন্মদের এইভাবে মেটাতে হ’ল, কী লজ্জা, ভাই-বোনে বিয়ে; এ তো মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে হলেও, হিন্দুদের কাছে তা সর্বতোভাবে নীতি বিরুদ্ধ। রাঘবেন্দ্রবাবুর কাছে শিবানীর এ অপরাধ ক্ষমার্হ নয়; ঘোষালদের কাছে, শিবানী আজ মৃত, কেউই তার নাম উচ্চারণ করে না।

নারায়ণ ঘোষালের ভাই, মাধবের চারিত্রিক পদস্খলনের কথা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাঘবেন্দ্র গোষ্ঠীর কেচ্ছা এখন লোকের মুখে মুখে, যদিও তা অগোচরে। মানী লোকের মান- সম্ভ্রমে কালি ছেটাতে লোকে পা বাড়িয়ে রহেছে, আর কেচ্ছা পেলে তা মুখরোচক করে, রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশ করে আনন্দ পায়। রাঘবেন্দ্রবাবুর কাছে অঞ্চলের লোক যে উপকৃত, তাই নিন্দা করতে বাঙালী যে তৎপর হবে, সেটাই স্বাভাবিক– এটা তো জাত- প্রবৃত্তি, কি না!

হরেকৃষ্ণ ঘোষালের প্রাসাদোপম
অট্টালিকা, এখন ভগ্নস্তূপের অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। রাঘবেন্দ্রবাবু, মূল প্রাসাদ থেকে নিজেদের অংশের বেশ কিছুটা ঘরের অংশ ভেঙ্গে, নিজেদের বাকি অংশকে বিচ্ছন্ন করে, সারিয়ে, রং করে, সুন্দর আবাসনে রূপ দিয়েছেন। ঘরের সংখ্যা কমে গেল, আবার অফিসও থাকতে হবে। তিনি অন্য এক বাড়ির সন্ধান চালাচ্ছেন। এই বাড়িতে শিব- শংকর, রমেন্দ্র, তার স্ত্রী ইন্দর ও ছেলে গুঞ্জন থাকবে:অফিস
অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। শিব- শংকর, বিয়ের পিঁড়িতে বসেনি, তাই দু’ভাই’র এখানে থাকতে অসুবিধা হবে না।

রাঘবেন্দ্রবাবু, আধা- শহরের শেষ প্রান্তে, গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে, মেইন- রাস্তার উপরে বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ সমেত একটা পুরোনো বাড়ি কিনে, তা সম্পূর্ণ সারিয়ে উঠে এসেছেন। সামনে স্রোতস্বিনী গঙ্গা; অনতিদূরে তৈরি হচ্ছে নদীর উপরে সড়ক পথে ওপার, কল্যাণীর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম সেতু— দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির প্রতিভূ। রাঘবেন্দ্রবাবু, ব্যবসার অফিসটা এ বাড়িতেই নিয়ে এসেছেন; খোলা- মেলা পরিবেশ। দোতলায় রয়েছে তাঁদের বসত ঘর, ড্র্ইং- রুম। এ বাড়িতে রয়েছেন, তিনি, তাঁর স্ত্রী রমনী ও ছোট ভাই অমরেন্দ্র। পুত্র রোহনের ঘরটা , খালিই পড়ে আছে;সে এখন দিল্লিতে থাকে, আই- এ- এস পরীক্ষার জন্য খুবই ব্যস্ত।

কাগজে কলমে, প্রত্যেক ভাই’র নামে ব্যবসা আলাদা করে দিয়েছেন। গঙ্গা থেকে বালি তোলা টা পৈতৃক ব্যবসা, ওটা নিজের নামে রেখেছেন; অঞ্চলের ঘাট- পারাপারের ব্যবসা, তাঁর ও শিব- শংকরের নামে; কারখানায় ঠিকাদারি ব্যবসাটা শিব- শংকরের নামে;জেলার অন্যান্য নদী থেকে বালি তোলা ও ঐসব নদীর ঘাট পারাপারের ব্যবসাটা রমেন্দ্র’ র
নামে; পঞ্চায়েত এলাকায় ইট- ভাটা রয়েছে অমরেন্দ্র’র নামে। পাণ্ডুয়া- অঞ্চলের হলুদ বালির অংশীদারী কারবারের অংশটাও
তিনি নিজের নামেই রখেছেন।
ব্যবসা আলাদা হলেও, অফিস এক। প্রত্যেক ব্যবসার উপর কড়া নজর রাখেন; ‘ঘর- পোড়া গরু’, নজর শিথিল করায় কয়লা- খনি
হাতছাড়া হয়েছে। প্রত্যেক ব্যবসা যাতে লাভ জনক হয় সেজন্য প্রত্যেক ভাইকেই তিনি উৎসাহ দেন। বাবা- মাকে কথা দিয়েছেন, প্রত্যেককে বুকে আগলে রাখবেন, কিন্তু শিবানীটা—-।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।