শহিদ ভগৎ সিং চরিত
ষষ্ঠ অধ্যায় || তৃতীয় পর্ব
ছেলের দল তন্ময় হয়ে শুনছে। কাহিনীকারের বলার পালা—
“ভগৎ সিংজি, রাতের অন্ধকারে আর্য- সমাজ মন্দিরের অফিস, ১৯
নং কর্নওয়ালিস ষ্ট্রীটে এসেছেন। এখানে মিঃ কনওয়াল নাথ তেওয়ারীর মাধ্যমে ফনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হ’ল; তিনিও
কোলকাতা- কংগ্রেস অধিবেশনে
এসেছেন এবং ভগৎ সিংজিকে আর্যসমাজ মন্দিরের ঠিকানাই দিয়েছিলেন। এখন দু’জনে, বাংলাতে বোমা বানানোর ওস্তাদ কোন বিপ্লবীর সন্ধান করছেন।”
“ফনীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে কলুটোলা লেনের একটা পার্কে, যতীন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কথা হ’ল, যতীন্দ্রনাথ, আগ্রায় গিয়ে ভগৎ ও তাঁর সঙ্গী- দের বোমা – বানানো শেখাবেন। যতীন্দ্রনাথ, নমুনা হিসেবে দু’টো বোমার খোলও দিল ফনীন্দ্রনাথকে, যাতে আগ্রায় ফিরে আরও অনেক খোল জোগাড় করা যায়। আগ্রায়, যতীন্দ্রনাথের নাম হবে মাষ্টারজি। আগ্রার হিং কি মণ্ডিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলছে বোমা- বানানো, পরে লাহোরেও
বোমা- কারখানা হবে। আগ্রায় বানানো পাঁচটা বোমার মধ্যে একটা নিয়ে, টেষ্ট করার জন্য ভগৎ সিংজি, আজাদ, ফনীন্দ্রনাথ ও যতীন্দ্রনাথ দাস, ঝাঁসীর অভিমুখে রওনা হয়েছেন; সেখানে, জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট্টো নদীর পাশে ছোট্টো পাহাড় থেকে বোমার পরীক্ষা নেওয়া হ’ল; চেষ্টা সার্থক, সবাই উৎফুল্ল। “
“এবার ঐ বোমা ব্যবহার করে জেল থেকে যোগেশ চ্যাটার্জীকে
মুক্ত করতে হবে, পরিকল্পনা চলছে। যতীন্দ্রনাথ দাস, বোমা পরীক্ষার পর কোলকাতায় ফিরে গেছেন। HSRA’ র কেন্দ্রীয় কমিটির সাতজনের মধ্যে পাঁচজন উপস্থিত আছেন, কিন্তু, যোগেশবাবুকে, কানপুরের লক- আপ থেকে উদ্ধার সম্ভব হ’ল না; তাঁরা, কানপুর থেকে আগ্রায় ফিরে এলেন। বিফল হওয়ার জন্য, ভগৎ সিংজি’র চোখ ছলছল করছে; চোখের সামনে দিয়ে শিকল-বন্দী অবস্থায় যোগেশজিকে নিয়ে ট্রেন লখনউ চলে গেল। হতাশা, আর ব্যর্থতা তাঁর মনে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। HSRA’ র অনেক নেতাই এখন আগ্রায়, মতাদর্শ বিনিময় হচ্ছে। আগ্রার আস্তানা গুটিয়ে এবার শাহারানপুর, বোমা- বানানোর হাব
তৈরি হবে। “
এবার বায়োস্কোপওয়ালার পালা। বাক্সের মধ্যে রিল চলছে। ভগৎ সিংজি চিন্তামগ্ন; সারা দেশে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, চলছে ষ্ট্রাইক; বিদেশ থেকে শ্রমিক- ইউনিয়ন, আর্থিক সাহায্যের সাথে জানিয়েছে নৈতিক সমর্থন, দেশের শ্রমিক- সম্প্রদায়ের মধ্যে জাগরণ শুরু হয়েছে। আমেদাবাদের কটন মিল গুলোতে, লিলুয়ায়- রেলওয়ে – ওয়ার্কশপে শুরু হয়েছে আন্দোলন। চাষীদের মধ্যেও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার
জন্য সাহস জোগাতে হবে; বিপ্লবের প্রথম ধাপ, সমাজ- জাগরণ ঘটাতে হবে, অথচ তাঁরা বাইরে এসে কোনরকম কাজ করতে পারছেন না; আবার, কংগ্রেসের মধ্যে ভিড়ে, তা করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। কংগ্রেসের একটা বড় লবি হচ্ছে ধনী-ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গোষ্ঠী, তারা গান্ধীজির কাছে, বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছে; আর গান্ধীজি তো দেশের মানুষ কে মার খেয়ে হজম শক্তি বাড়াবার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত, না, তিনি নিজে কিন্তু কখনোও লাঠির বাড়ি পরখ করেননি, বা কখনও সাধারণ কয়েদীদের মত জেলে জীবন যাপন করেননি; এ থেকেই তার অভিসন্ধি বুঝতে অসুবিধার কথা নয়। আবার, বিদেশী ভারত সরকারও শ্রমিক- পীড়নের জন্য দমন- নীতি প্রয়োগে তৎপর হয়ে Trade Dispute Bill, Public Safety Bill আনতে চলেছে, ওগুলো সেন্ট্রাল এসেম্বলিতে পাশ করিয়ে বিদেশে সরকারের ভাব- মূর্তি বজায় রাখতে চায়। এদিকে ‘Saunder’ হত্যার মাধ্যমে প্রতিশোধ স্পৃহাতেও জনসাধারণের মধ্যে HSRA’ র প্রভাব স্তিমিত হয়ে আসছে। সেন্ট্রাল এসেম্বলিতে পাশ না হলেও, আইন অনুযায়ী গভর্নর- জেনারেলের ভেটো পাওয়ার মাধ্যমে বিলগুলো পাশ হয়ে, আইনে পরিণত হবে।HSRA’র কেন্দ্রীয় কমিটি চাইছে, ঐ বিলগুলো কেবলমাত্র ভেটো প্রয়োগে, আইনে পর্যবসিত হোক, এবং তা পৃথিবীর মানুষের কাছে এই পীড়ক শাসকের মুখোশ উন্মোচিত হোক।
চলবে—-