সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ১১)

সাদা মিহি বালি

রাঘবেন্দ্র ঘোষালের শখ, প্রতি- দিন সকালে নিজের হাতে বাজার করা। ঠিক সাতটা- সাড়ে সাতটায় অফিসের রিক্সায় চেপে আধা-শহরের কাঁচা-সবজী ও মাছের বাজারে আসা চাই- ই। কাকা, পশুপতি ঘোষালের পছন্দ মত মাছ
তিনি নিজে দেখে- শুনে কেনেন। মাছের ব্যবসায়ী তা জানে, তাই রাঘবেন্দ্রবাবুর জন্য মাছ আলাদা করে রেখে দেয়।

একদিন,বাজার থেকে ফেরবার
পথে শহরের মাঝে, রাস্তার ধারে থাকা বিখ্যাত তেলে- ভাজার দোকানের বাইরে উঁচু রোয়াকে রাখা বেঞ্চে, রঞ্জন মুখুজ্যেকে ঠোঙায় বড় বড় ভুলুরি ও বেগুনি খেতে দেখে, রিক্সাকে দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ” দাদা, ভালো আছেন? এ বয়সে এসব শরীরে সইবে? “

রঞ্জনবাবু বললেন, ” জানোই তো, পঞ্চু ডাঃ বলেই দিয়েছে, দু’বার আ্যটাক হয়ে গেছে, আর এর পরেরটা হলে বেঁচে থাকা অনিশ্চিত; তাই মনের আশ মিটিয়ে খেয়ে চলেছি। যাক, তোমার কাকা কেমন আছে? আমার কথা বলবে; এখনও বহাল তবিয়তে টিকে আছি। “

রাঘবেন্দ্রবাবু, রিক্সা থেকে নেমে বললেন, ” দাদা, আপনার তো এখন অখণ্ড অবসর; আমার অফিসে এসে বসুন, না; সকাল- বেলা, চান- টান সেরে চলে আসুন, এসব ছাই- পাঁশ খেতেও হবে না;
আমার অফিসে, সবার টিফিনের ব্যবস্থা আছে। আমারও কিছু উপকার হয়, আর কাকাও, তাঁর পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে কথা বলার লোক পান। “

” এই বয়সে কী আর, তোমার কোন কাজে লাগবো? “

” দাদা, বিলিতি কোম্পানির অফিসের স্টেনোগ্রাফার, তার কদরই আলাদা; এলে, আমার অফিসের মান বাড়বে। দিনে চার- পাঁচটা চিঠি- চাপাটি হয়; সেগুলোর দায়িত্ব আপনি নিলে, আমার অনেক উপকার হয়। “

“বেশ, বলছো যখন, কাল থেকেই যাবো; পশুপতিকেও বলবে,” বলে রঞ্জনবাবু হাতের ঠোঙাটা, আবর্জনা ফেলা ড্রামের
মধ্যে ফেলে, সামনে রাখা জগ থেকে জল নিয়ে হাত- মুখ ধুয়ে, পকেট থেকে রুমালে মুখ মুছলেন।

রাঘবেন্দ্রবাবু বললেন, “দাদা, কথা হয়ে গেল, কাল সকাল ন’টায়
এই রিক্সা আপনাকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে, তৈরি হয়ে থাকবেন; চলি। “

রঞ্জনবাবু বিপত্নীক। ইম্পিরিয়াল ট্যোবাকো কোম্পানিতে প্রায় তিরিশ বছর
স্টেনোগ্রাফারের কাজ করেছেন। ইংরেজিতে তুখোড়, আর এই বয়সেও টাইপের স্পীড মিনিটে, আশিরও অধিক; মনে একটু গর্ব বোধ হ’ল। পশুপতি, ওনার স্কুলের
সহপাঠী;অঞ্চলের জুনিয়র হাই স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছেন। তারপর আর পশুপতি পড়েননি। রঞ্জনবাবু, পাশের অঞ্চলের হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন;
পাশ করা মাত্র চাকরিই। সে কী আজকের কথা! ইউরোপে, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে (শুরু ্ছে্ছ্ছে্্ছে্ছ্ছে্ছে্ছ্ছে্্ছে্ছ্ছে) শুরু করেছে।

অনেকদিন আগেই মেয়ের হয়ে গেছে। ছেলেও লেখা- পড়া শিখে ভিন রাজ্যে চাকরি করছে।
বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় অল্প জ্বরে কন্যা ও পুত্রকে রেখে স্ত্রী পরলোকে চলে গেছে। মা মরা ছেলে- মেয়েকে রঞ্জন বাবুর মা-ই
কোলে- পিঠে মানুষ করেছেন; ওনার বাবা তো বহুকাল আগেই
স্বর্গে গেছেন; নাতনীর বিয়ে দিয়ে
ওদের ঠাকুমাও চলে গেলেন। বাড়িতে রঞ্জনবাবু একা। ছেলের বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন; বৌমা এলেও সমস্যার তো সমাধান হবে না। বৌমা তো দূরদেশে ছেলের কাছে চলে যাবে। তখনও তো তাঁকে একলাই থাকতে হবে। এসব ভেবে রাঘবেন্দ্র’র প্রস্তাবটা তিনি খুশি মনেই মেনে নিয়েছেন; আর যাই হোক, সময়টা তাঁর ভালো ভাবেই কেটে যাবে। কাল অফিস যাওয়ার পর ছেলেকে পোষ্টে জানালেই হবে ভেবে, তিনি বাড়ির দিকে রওনা হলেন। দুপুরে, নিজেই একটু ফুটিয়ে- ফাটিয়ে নেন; তাড়া নেই। দুপুরের খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে বসুমতী কাগজে, বিবেকানন্দ মুখুজ্জ্ব্যর সম্পাদকীয় পড়তে পড়তে তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।