।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় উজ্জ্বল কুমার মল্লিক

মৃগেন্দ্রনারায়ণ চক্কোর্তী

মৃগেদাকে এ অঞ্চলের সবাই চেনে। কাঁচা-রাস্তা, কংক্রিট করার সময় কন্ট্রাক্টর রাস্তার মোড়ের বটগাছের গোড়ায় সিমেন্টের একটা গোল চাতাল করে দিয়েছে। ঐ চাতালে দিনের প্রায় সব সময়ই মৃগনারায়ণ ওরফে আমাদের মৃগেদা বসে থাকে। সামনের চায়ের দোকানের তৈরী চা-এর গ্লাসে এক ঢোক করে চুমুক দেয়।
না, না, ভাববেন না নিজের পয়সায় খায়, ওটা ওনার গুরুর আদেশ, পকেটের পয়সা খরচ করা চলবে না;গুরুর আদেশ অমান্য কী ভাবে করেন! রাস্তায় তো লোক চলাচল করেই, আর তাতেই ওনার কাজ মিটে যায়। লোক দেখলেই সে প্রথমে জিজ্ঞাসা করবে,
“আরে, কেমন আছো? ” যদি সে দাঁড়িয়েছে, ব্যস, তার পকেট খসবেই;সেও তো বলবে, হ্যাঁ, ভালো বা অন্য কিছু;সেও তো ভদ্রতার খাতিরে বলবে, “তুমি কেমন আছো”?
উত্তর হবে,” আর বলো কেন ভাই, যাক্ তোমার বাড়ির খবর ,ছেলে-মেয়ে কী করছে ইত্যাদি”।লোকটি যদি গদগদ হ’য়ে বলতে আরম্ভ করে, তাহলে বসতেই হবে;আর সামনের চায়ের দোকানী পাঁচু সসপ্যানের গরম জলে পাতা ফেলে দু’মিনিটের মধ্যে চা তৈরী করবে;দোকানের বয়-ছেলেটি দু’গ্লাস নিয়ে হাজির হবে।
মৃগেদা, ওকে ধমকে বলবে, “যা, দুটো করে চারটে বিস্কুট
নিয়ে আয়”;তা ভাই, তোমার ছেলেকে কী পড়াবে ঠিক করেছ;যেমন বয়স, সেই রকম প্রশ্ন হবে বা আলোচনার রেশটি ঐ দিকেই থাকবে। অন্য মুরগি না আসা পর্যন্ত ওকে ঐখানেই কথায় আটকে রাখা হবে।

চা খাওয়ার প্রায় মোটামুটি শেষ পর্যায়ে দোকানের বয়-ছেলেটি এসে বলবে
” বাবু, তিন টাকা হয়েছে “।
” আচ্ছা, ওঃ,তুমি দিচ্ছ, দাও”বলেই লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকবে। লোকটি টাকা দিয়ে, বাড়ির খবর দিয়ে, দুঃখ হ’লে সান্ত্বনা নিয়ে, আর মনে মনে তিন টাকা গচ্চা যাবার দুঃখ হজম করতে করতে চাতাল ছেড়ে চলে যাবে। এটা নিত্যদিনের ঘটনা।
আমরা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি, হাতে অফুরন্ত অবসর। পাড়ার ছেলেরা সময় কাটানোর জন্য মৃগেদার কাছে গিয়ে মাঝে মাঝে বসতাম। অবশ্যই, চা-বিস্কুটের দাম আমাদেরই দিতে হোত, তা হোক, এরকম নির্ভেজাল সরস বক্তিয়ার গুল তো আর ছায়ামূর্তি-সিরিজে থাকে না। আর কিরীটী -রতনলালের রহস্য উদ্ঘাটনের মত মাথা ও ঘামাতে হয় না। মৃগেদাকে ওর জীবনের কথা জিজ্ঞাসা করলেই বলবে
“ওরে, আমি হাওড়ার শিবপুরের ছেলে, ওখানে যে রকম মস্তান, গুণ্ডা দেখেছি, তা তোদের গোয়েন্দা-উপন্যাসে পাবি না, তা তোরা শুনতে চাস তো বলতে পারি”;ইতিমধ্যে, চা-বিস্কুট এসে গেছে, চা’র গ্লাসে চুমুক দিয়ে মৃগেদার মুখে বুলি ছুটতে আরম্ভ করেছে, আসর জম-জমাট, আমরাও উন্মুখ।

” ঐ রমেশ(সমাদ্দার) গুণ্ডা, একবার সিনেমার টিকিট ব্লাকে বিক্রী করছে, পাঁচ টাকার টিকিট কুড়ি টাকা, তিন টাকার টিকিট পনেরো টাকা;কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে সব ওর সাগরেদ। সাধারনকে বাধ্য হ’য়ে রমেশ গুণ্ডার শরণাপন্ন হতেই হবে। এমন সময় কী একটা ঝামেলা শুরু হতেই ঐ রমেশ পাশের পান-বিড়ির দোকান থেকে সোডা বোতল নিয়ে দেওয়ালে ভাঙ্গছে আর প্রতিপক্ষের পেটে ঢোকাচ্ছে, ভাঙ্গছে আর ঢোকাচ্ছে;ঝপাঝপ সব দোকানের ঝাঁপ নামানো শুরু হ’য়ে গেছে। টিকিট-কাউন্টার বন্ধ হয়েছে, লোকেরা যে দোকানে পারে সেখানে ই আশ্রয় নিয়েছে। ভিতরে সিনেমা-শো শুরু হয়ে গেছে, প্রাণ আর দিলীপ কুমারের
ফাইটিং চলছে, আওয়াজ আসছে, ডিসুম, ডিসুম আর তখন বাইরে রমেশ ভার্সেস ভোমলার বোতল-বাজি চলছে, মাঝে মাঝে ঝনঝন শব্দ, ঐ তোদের মহাভারতের কর্ণ -অর্জ্জুনের তিরে তিরে ঠোকাঠুকি আর কী!কিছুটা পরেই দু’দল ক্লান্ত হয়ে পড়লো। এবার পুলিশের আবির্ভাব হ’ল। এসে বললো”রমেশ দা, অনেক হয়েছে, এবার থামুন”
“তোমরা বলছো, তা বেশ, তোমরা উর্দ্দিধারী, আমি তোমাদের অমান্যি করি না, ” বলেই রমেশ গুণ্ডা হাতের ভাঙ্গা বোতলটা ফেলে দিল, আর অমনি সঙ্গের পুলিশ টা পকেট থেকে রুমাল বের করে প্যাকেটস্থ করেছে
“দাদা, এবার যে একবার বড় বাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে” বলেই পুলিশ টা একটু হেসে দিল। পান-দোকানী ছুটে এসে বললো”দাদা আমার পাঁচটা বোতল”।
“লিখে রাখ, আর হ্যাঁ, আরও আনিয়ে রাখ, কাজে লাগতে পারে” বলে পুলিশ কে সঙ্গে নিয়ে রমেশ দাদা থানার দিকে রওনা হ’ল।
থানার সামনেই বড়বাবু হেসে বললো “এসো রমেশ, আজ কত লাভ হ’লো? ”
“আর, বলেন কেন, শেষের দিকে ও পাড়ার ভোমলা আর ওর দলবল এসে ঝামেলা পাকালো,আজ অনেক লস হ’ল;যাক্ গে,
পরের শো-তে বা কাল ওসব মেক- আপ হ’য়ে যাবে” বলে রমেশ দাদা থামতেই বড় বাবু বললেন”ওদিকে ভোমলা তো তোমার নামে নালিশ ঠুকে গেছে, ভাঙ্গা বোতলে তোমার হাতের ছাপ
ও তো রয়েছে ”
“ভোমলা, আপনাকে যা দিয়েছে, আমি তার চেয়ে বেশি দিচ্ছি” বলে পকেট থেকে এক গোছা কলা-গাছ মার্কা নোট বের করে টেবিলের ওপর রাখলো”।
বড় বাবু, হেঁকে পাশের ঘরের এ এস আইকে বললেন”রমেশ বাবু, এবার যে কাগজগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়”।
রমেশ দাদা বললো”আমি তাহ’লে আসছি, বড় বাবু”।
বড়বাবু, হাসতে হাসতে বললেন”আবার এসো”। চেয়ার থেকে উঠে রমেশ দাদাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
আমাদের মধ্যে শশাঙ্ক ওরফে ফুটো, কথার মাঝখানে ফুট কেটে বলে উঠলো “আচ্ছা, মৃগেদা, তুমি তো বললে রমেশ সমাদ্দার, তবে ও গুণ্ডা কী করে হ’লো;মাথায় একটা আলতো গাঁট্টা
মেরে উত্তর এলো” গোপাল মুখুজ্জ্যে যদি গোপাল পাঁঠা হতে পারে তবে সমাদ্দারের গুণ্ডা হলে তোর আপত্তি কোথায়”? ফুটো কথাটা হজম করে যেই বলেছে “এতো টাকা কোথায় পেল”। এবার পিঠ চাপড়ে মৃগেদা র উক্তি” ওরে,ওদের কি আর টাকার অভাব, শিবপুরের সব ব্যবসাদারদের ওরা প্রোটেকশন দেয়, সেই বাবদ ফিজ পায়, তোরা যেমন তোলার কথা বলিস না, সেরকম নয়, একটু আলাদা, আর ফিজের টাকা কত হ’তে পারে তা তোরা আন্দাজ করতে পারবি না; ব্যবসাদাররা তো রমেশ দাদা বলতে অজ্ঞান”।
ফুটোর সব কথাই নাকোচ হ’য়ে যাচ্ছে দেখে সে এবার মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করলো”আচ্ছা, মৃগেদা, তুমি যে বললে রমেশ গুণ্ডা বোতল ভাঙ্গছে, আর ঢোকাচ্ছে, তা তুমি তখন কোথায় ছিলে?”প্রশ্ন শুনে আমার দিকে তাকিয়ে হাতটায় টান দিয়ে বললো” ইস, একটা বেজে গেছে, অনেক দেরী হ’য়ে গেল, সবাই এসে গেছে বোধ হয়,” বলেই সোজা উঠে উল্টো দিকে হাঁটা দিল।
পরের দিন মৃগেদাকে জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল, গত দিন এক বাড়িতে ব্রাহ্মন-ভোজনের নেমন্তন্ন ছিল, তাই সে তাড়াতাড়ি চলে গেছে। এবার বাবু হ’য়ে বসেছে। দোকানের বয়-ছেলেটি ও চা-বিস্কুট নিয়ে হাজির। হঠাৎই মৃগেদা পকেট থেকে তিনটে ফুটো পয়সা বার করে আমাদের দেখিয়ে বললো”বল তো এগুলো কী?” আমরা অবাক, ফুটো পয়সায় আবার কী মাহাত্ম্য আছে রে বাবা!
“বলতে পারলি না তো, আমিও প্রথমে তোদের মত ঘাবড়ে গেছিলাম , তবে শোন; আমার রংদার বাবা এগুলো আমায় কৃপা করে দিয়েছেন”, বলেই নিজের মাথায় ছুঁইয়ে, আমাদের প্রত্যেকের মাথায় ছোঁয়ালো।
আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম”রংদার বাবা, সেটা আবার কে? ” উঁহু, উঁহু ওরকম করে বলিস না, উনি আমার গুরুদেব”।
“তবে বলি শোন, ছোটবেলায় আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে সন্ন্যাসী হব ভেবে ঐ রংদার বাবার দলে ভিড়লাম;বাবা তো পাত্তাই দেয় না, আমি ও ছোড়েঙ্গে নেহি, বাবা!হাম শিবপুর কা লেড়কা হ্যায়; অনেক পদ -সেবার পর বাবার মন টললো:আমি তাক বুজে বললাম, বাবা, হামকো, আপ চেলা বানাইয়ে, হাম আপকা পদ সেবা করেঙ্গে;তোরা তো জানিস বোধ হয়, আমার বাবা মনীন্দ্রনারায়ন চক্রবর্তী, হাওড়া কোর্টের একজন নামকরা ক্রিমিনাল ল- ইয়ার ছিলেন, হাওড়ার ক্রিমিনাল রা যমের মত বাবাকে ভয় খেত। বাবার নাম শুনে বললো, “বাচ্চু, তোমারা কাম অনেক বড় ক্ষেত্রমে
হোগা, সন্ন্যাস, তোমারা লিয়ে নেহি হ্যায়”;আমি ও না ছোড়বান্দা। শেষে আমার মাথা য় হাত ঠেকিয়ে
বললেন, “লে বেটা, লে এই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর কে ধর, বলে এই তিনটে আমায় দিয়ে বললেন, কখনও কাছ ছাড়া করবি না”, সেই থেকে আমি ঐ তিনটি কে চান করাই, সিঁদুর দিই, সব সময় পকেটে রাখি, খরচা করার কথা ভাবিই না। গুরুর আদেশে আমি পয়সা ও খরচ করি না”। আমি বললাম”কিছু মনে করবে না, তোমার চলে কী করে? ”
মৃগেদার উত্তর “সব বাবার মহিমা, চলে যায়, নেমন্তন্ন বাড়ি থাকে প্রায়ই, এই দেখ
আজ পাশের গাঁ-য় যেতে হবে, ব্রাহ্মণ-ভোজন;শ্রাদ্ধ-বাড়ি, দক্ষিনা দেবে, আবার গীতা, রেকাবি, চামর কত কি! আমি শুধু দক্ষিনা নিই, আর ওসব জিনিষের জন্য মূল্য ধরে দিতে বলি;ওতেইআমার চলে যায়। নে ওঠে, আমাকে আবার সময় মত পৌঁছোত হবে”
হরিহর ভট্টাচার্য মশাই, এ অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট জন ছিলেন, স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনিই আমাদের মৃগেদার জামাইবাবু। অপুত্রক ছিলেন। তাই তিনি ও মৃগেদার দিদি ,ভাইকে লেখাপড়ার জন্য নিজের কাছে নিয়ে আসেন। শিবপুরে ওর বাবা মনীন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী মহাশয়, পুত্রের লেখাপড়ায় অমনোযোগিতায় হতাশ হ’য়ে সেরিব্রাল আ্যটাকে চলে গেলেন;মা আগেই ওপারে চলে গেছেন। পিতৃ-মাতৃহারা ভাইকে নিজেদের ছেলের মত মানুষ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হায়! যে শিখতে চায় না, তাকে শেখানো বড় কঠিন:হরিহরবাবু, সব চেষ্টার পর পূর্ব-জন্মের কর্মফল ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি দুঃখ করে বলতেন”বামুনের ঘরে একটা গরু;সেটাও তবু কিছু উপকারে লাগে, মৃগে একটা অকাল কুষ্মাণ্ড
ষাঁড়। কী আর করা যাবে, অন্ততঃ যদি ভদ্র হয়, তবু মরে শান্তি পাবো। “দিদি-জামাইবাবু, দু’জনেই হা-হুতাশ অবস্থায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। বাড়িতে মৃগেদা একা, নিঃসঙ্গ, মাসের অর্ধেকের বেশি তার নেমন্তন্ন খেয়েই কেটে যায়।
হ্যাঁ, অবশ্যই ভদ্র ও নম্র, পরোপকারী;প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দিতেও পিছপা নয়। কোন লোকের অসুখ হ’লে তার সেবা ইত্যাদির জন্য পাড়ার লোকেরা ভালোবাসে। হরিহর বাবুর মৃত্যুর পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুলের বেয়ারার চাকরি করতে বলেছিলো, কিন্তু মৃগেদা রাজী হয়নি, ঐ যে রংদার বাবা ওর মাথায় ঢুকিয়ে ছিল “তোমারা কর্মক্ষেত্র বহুত বড়া হোগা, তোম্ কেতনা লোককা সাহারা হোগা”ইত্যাদি, ইত্যাদি, সে যাক গে
বহুদিন আগেকার ব্যাপার। বামুনের ঘরের ছেলে বেকার, অশিক্ষিত এমনকি পুজো- পুজো করতে জানে না, তাই কোন মেয়ের বাবাও মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি;অবশ্য মৃগেদার তার জন্য কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। তার মতে নাংটার নেই বাটপারের ভয়,
দে গরুর গাড়ি ধুইয়ে, চালাও পানসি সজোরে, ঝাড়াহাত-পা, যা মজা, সে যে যাই বলুক,হোক না নিস্কর্মা।
রাস্তায় বসে থাকো, সকালের টিফিন জোগাড় হ’য়ে যাবে, আর পূর্ব-পুরুষরা ব্রাহ্মণ-ভোজনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে গেছে। সুতরাং, দিব্বি চলছে। মৃগেদার যে ঠাকুর ভক্ত তা নয় বরং উল্টো। কখনও কোন মন্দিরে যেত না, প্রসাদ খেত খাবার ভেবে, ভগবানের প্রতি তার ছিল ক্ষোভ, কেন জানি না।
মৃগেদার বাবা চক্রবর্তী, আর সে চক্কোর্তী হ’ল কী ভাবে, খোঁজ করতেই জানা গেল এক অদ্ভুত ব্যাপার। আমরা এবার হাফ-প্যান্ট ছেড়ে, পা-জামা পড়ছি, এক রঙা ছিট-কাপড়ের বুক-চেরা হাওয়াই শার্ট। তখনকার দিনে এটাই প্রচলিত ছিল। কিন্তু, মৃগেদার পছন্দ ছিল রংচংওয়ালা ছিটের কাপড়, তাতে কখনও থাকে নামাবলী, কখনও সেটা হয় খবরের কাগজের প্রতি লিপি;
ঐ সব চকরবকর দেখে কেউ একজন ওর নাম দেয় চক্কোর্তী;ব্যস সেই থেকেই পদবীর রূপান্তর ঘটেছে। মৃগেদার কোন হেল-দোল নেই, পৈতেটা কোমরে ঘুনসির কাজে লাগে, ঘরের তালার চাবি টা আটকানো থাকে, ওটাকে রাখতে হয়েছে, না হ’লে বামুন গুলো খাবার সময় ঝঞ্ঝাট পাকাবে, ওটাই ব্রাহ্মণ-ভোজনের ছাড়পত্র।
আগে পাঁচুর দোকান থেকে টুল নিয়ে ঐ বটগাছের তলায় বসতো।
কন্ট্রাক্টর, রাস্তা করার সময় ঐ চাতাল করে দিয়েছে, পাছে না কেউ রাস্তা তৈরীতে ফাঁকির কথা উপর-মহলে না জানায়, কে আর এ দেশে ও সব নিয়ে মাথা ঘামায়, এটা কন্ট্রাক্টরের বদান্যতাই ভাবা ভালো। আমাদের মূগেদা পা ছড়িয়ে আরাম করে গল্প করে,সময় কাটায়।
যে দিন বাড়ি তে রান্না করার ইচ্ছা হয়, মুদির দোকানে যায়, ডান হাত মুঠো থাকে। আমরা যেমন খুচরো পয়সা হাতের মুঠোয় রাখি না, ঐ রকম আর কী। দোকানী মুঠোয় পয়সা আছে ভেবে জিনিষ দেয়, নেওয়া র সময় সে হাত খোলে, লিখে রাখ বলে। দোকানী তো আর মাল কেড়ে নিতে পারে না, হাজার হোক পরিচিত। তাই মৃগেদাকে মাঝে মাঝে দোকান পাল্টাতে হয়।
বেশ কিছু দিন মৃগেদাকে চাতালে দেখা যাচ্ছে না। পাঁচুর কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মৃগেদা আসছে না। আমরা সবাই ঠিক করলাম ওর বাড়ি যাবো, যদি অসুস্থ হয়, জানা যাবে, ব্যবস্থাও করা যাবে। চুপচাপ ওর ঘরের জানালার কাছে যেতেই একটা চাপা কান্নার আওয়াজ আমাদের কানে এলো, আমরা আর অপেক্ষা না করে সদর দিয়ে ওর বাড়ি তে
ঢুকলাম। আমাদের সবাইকে দেখে হাসতে হাসতে বললো”আয়, আয়”। আমরা সবাই একসঙ্গে বললাম”মৃগেদা, তুমি কাঁদছিলে ছিঃ! মৃগেদা, তুমি না পুরুষ মানুষ, তুমি সবাই কে মজিয়ে রাখ, আর তুমি ই কী না! মৃগেদা হাসতে হাসতে বললো”তোরা এ অঞ্চলের গৌরব, তোরা ভালো করে লেখাপড়া শিখে বাবা-মা’র মুখ উজ্জ্বল কর, মানুষের মত মানুষ হ। আমি তো সমাজের আবর্জনা, সময়ে লেখাপড়া না শেখায় পরগাছা হ’য়ে সমাজে পড়ে আছি, তাই নিজের প্রতি নিজেই প্রতি- শোধ নিচ্ছি”। সব শুনে ভারাক্রান্ত মনে সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছি।
পরের দিন রাষ্ট্র হয়েছে মৃগন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী আত্মহত্যা করেছে—-চিঠি লিখে গেছে,
“সমাজের আবর্জনা এবার পরিষ্কার হ’ল”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।