ক্যাফে ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ৩)

শহিদ ভগৎ সিং চরিত
প্রথম অধ্যায় || তৃতীয় পর্ব
পুত্ররা আন্দোলন ও বিদ্রোহ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত, কখন ওদের পাওয়া যাবে, তা অনিশ্চিত; অধিকাংশ সময়ই তারা হয় জেলে অথবা আন্ডারগ্রাউন্ডে, তাই নাতি জগৎ সিং ও ভগৎ সিং ছিল তাঁর নয়নের মণি। তাঁর অধ্যবসায় ও অদম্য সমাজ- সংস্কারের স্পৃহা, তিনি নাতিদের মধ্যে সঞ্চার করতে পেরেছিলেন; নাতিরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে- ছিল , তাই পরবর্তীকালে ভগৎ সিং কে একজন গোগ্রাসী পাঠক হিসাবে দেখতে পাওয়া যায়। অর্জন সিংজি, আমূল সংস্কারের পক্ষে ছিলেন, আংশিক ছিল তাঁর না- পসন্দ। 1898 সালে সরকার থেকে লায়েলপুর জেলার ক্যানাল কলোনীর বাঙ্গা গ্রামে 25 একর জমি তাঁর নামে বিলি হলে, তিনি সপরিবারে এখানে চলে আসেন। আমাদের শহিদের শৈশব ও বাল্যের বেশ কয়েকটা বছর এখানেই কেটেছে।
সর্দার অর্জন সিংজি, ভীষণ কায়িক পরিশ্রমী ছিলেন। নিজেই আম- বাগানের পরিচর্যা করতেন। একদিকে গুরুদ্বারের পুনঃনির্মাণ, অন্যদিকে আর্যসমাজ কর্মীর ক্রিয়া- কলাপে, ভারতীয় সমাজে বেদের গৌরব ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে লক্ষ্য ছিল স্বজাত্যবোধ গড়ে তোলা; না, তাঁর কাছে কোন গোঁড়ামি ছিল না। আকালি আন্দোলন ও গুরুদ্বারের সংস্কারের প্রতি সহমত বোঝাতে তিনি কালো রং’র পাগড়ি পরতেন; অচ্ছুৎপন্থীরা, ছিল তাঁর কাছে অচ্ছুৎ।নিজের জীবনে যুক্তিকেই প্রাধান্য দিতেন; তাই দেখা যায়, 1920 সালে, নিজের পতাকা ‘ওঁ’ সরিয়ে রেখে অসহযোগ আন্দোলনে ‘ভারতমাতা কী জয়’ সম্বলিত পতাকা কাঁধে সত্যাগ্রহী হতে পিছপা হননি। এই রকম লোক যদি, নাতিদের পরামর্শ দাতা হয়, যদি মার্গ দর্শনকারী হয়, তবে সে সব নাতি যে ইতিহাস লিখবে, তাতে আর আশ্চর্য কোথায়! বড় ছেলে স্বদেশী করার জন্য ফেরার, মেজ ছেলে নির্বাসনে, ছোট ছেলে, বিয়ের পরপরই রহেছে জেলে, এ রকম লোক যে নাতিদের গুরুদ্বারে ধর্মীয় সংস্কারের সময় ‘যজ্ঞোপবীত’ প্রদান কালে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে দুই নাতিকেই দেশের কাজে উৎসর্গ করবেন, এতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।জমিতে বীজ বপন করলে, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া বা পরিবেশের প্রভাব থেকেই যায়; আমাদের শহিদও পেয়েছে অনুকূল পরিবেশ, পেয়েছে উন্নত- ধারা— সে ধারার গতি রুধিবে কে?”
দ্বিতীয় অধ্যায় || প্রথম পর্ব
বায়োস্কোপওয়ালা লোকটি,
এবার সবাইকে খোপের মুখে চোখ রাখতে বলে, হ্যান্ডেল ঘোরাতে শুরু করে বলছে, ” দেখ খোকারা, ঐ তোমাদের শিশু ভগৎ, গ্রামের পাঠশালা থেকে বাড়িতে ঢুকেই চাচী হরনম কাউকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘চাচী! চাচার( অজিত সিং) কোনো চিঠি এসেছে কি না? ‘ছোট্ট শিশু, সে তো বোঝে না; শোনা মাত্রই, চাচীর মুখটা অন্যরকম হয়ে গেল। দেখ, শিশুটা বলছে, ‘আমি বড় হই, বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করে চাচাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো’। নির্দোষ উক্তির মধ্যে দেখ কী অসাধারণ বলিষ্ঠতা। অজিত সিংজি তো দক্ষিন আমেরিকায় আশ্রয় নিয়ে তৈরি করছেন বিপ্লবী- সংস্থা। চাচার সংগে কয়েকবার চিঠি- চাপাটিও চলেছে; চাচা,ভাতিজাকে বিদেশে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছিলেন।
“দেখ, স্কুলে কী রকম সবার সাথেই বন্ধুত্ব করে ফেলছে; শুধু স্কুলে নয়, ছোটরা নয়, বড়দের সঙ্গেও কী রকম অবলীলায় মিশে যাচ্ছে। গ্রামের ঐ দর্জি লোকটাকে দেখছো, হ্যাঁ, ওর সঙ্গেও ভগতের দারুণ ভাব। কথা বলার ভঙ্গিমাই ওর আলাদা। প্রবচনে, সত্য বলে মনে হচ্ছে না? নেতারা, নেতা হবার জন্যই জন্মায়, তৈরি হয় না। তোমরা তো পড়েছ, শিবাজী মহারাজও, ছোটবেলায় ঐ রকম নিজের চেয়ে বয়সে বড়দের সংগেও সহজভাবে মিশতেন, আর সবাই তাঁর আনুগত্য মেনে চলতো। দেখ, একদিন স্কুলে বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করছে, ‘এই তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও, যেমন তোমরা সাথীদের সাথে কথা বল আর কী! কেউ বলছে আমি সরকারি নকরি করবো, কেউ বলছে, দোকান দেব, কেউ বলছে চাষ করবো, আবার কেউ মজা করে বলছে, বিয়ে ্বো্ব্বো্্বো্ব্বো্বো্ব্বো্্বো্ব্বো) করবো। শুনে, এবার দেখ, ভগতের কী মূর্তি! ওরে ব্বাস! সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, ‘ বিয়ে করাটা একটা কাজ হলো? আমি জীবনে বিয়ে করবো না, আমার দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়াবো’। চাচীদের মনমরা ভাবনায় হয়তো তার মনে বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগিয়েছে।”
” বাড়িতে তো রহেছে রাজনীতি- র বই, দেশাত্মবোধক বই, লিফলেটের ছড়াছড়ি; সেগুলো সব যাতে আধা- শিক্ষিতরা বুঝতে পারে, সে-ভাবেই লেখা। বাচ্চা ভগতের মনে সেগুলো দেশপ্রেমের বীজ বুনতে শুরু করেছে। বাড়িতে সব সময় লোক আসা- যাওয়া লেগেই আছে। ‘গাদার(বিপ্লবী) পার্টির লোকও আসছে, আবার অহিংসা- বাদীর লোকও আসছে। পিতাজি অহিংসা- নীতির সমর্থন করলেও, গাদার পার্টির সঙ্গে রহেছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তাদের গোপন ক্রিয়া- কলাপ চালাতে তখনকার দিনে এক হাজার টাকা ডোনেশন দেন। ঐ আসা- যাওয়া লোকের মধ্যে ভগতের আইকন, কার্তার সিং সারভারও থাকতে পারে। তিনিই ছিলেন গাদার পার্টির সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য; মাত্র উনিশ বছর বয়সে 1925 সালে লাহোর জেলে শহিদ হন। তিনিই ভগতের আইকন, সব সময় তাঁর ছবি ভগতের বুক পকেটে; পরে দেখা যাবে, যে কোন পাবলিক মিটিং শুরু হবার সময় চলছে কার্তার সিং সারভারের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, বিপ্লবীর প্রতি কী অশেষ টান!
চলবে