সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ৩৮)

সাদা মিহি বালি

সপ্তম অধ্যায়

দ্বিতীয় পর্ব 

ভাগীদার পার্টির জেলা সভাপতির সংগে শিবশংকর ও
মাধবের ঘোষালের সম্পর্ক খুবই ভালো; ওদের দলবলই তো পার্টির সম্পদ; অর্থভাণ্ডার পূরণের ক্ষেত্রে ঐ ঘোষালরা কখনও কথার খেলাপ করে না, সুতরাং ওদের প্রতি পার্টির উপরতলার নেতৃত্বও
সদয়। এদেশে, রাজনীতিতে দেওয়া- নেওয়ার সম্পর্কটাই তো প্রাধান্য পায়; ‘আদর্শ- টাদর্শ’ মুখে
আউরাতে হয়, ভোটারদের ওসব
বলে উদ্দীপ্ত করতে হয়; অবশ্য, ভোটাররাও আজকাল খুব সেয়ানা হয়ে গেছে, নিজেদের কিছু হিস্যা না পেলে, ওরাও নেতাদের মত দল বদলাতে পিছপা নয়, তাই তো শিব-শংকর ও মাধবকে,জেলা
সভাপতি তোয়াজ করেন। অনেক দিন ধরে, উভয়েই জেলা থেকে বিধায়ক হবার জন্য আবেদন করে আসছে। ওদের অঞ্চল থেকে তো একজনকে নির্বাচনে টিকিট দেওয়া যেতে পারে, তাই সভাপতি,  নিজের বাড়িতে, গোপনে দু’জনকে আলোচনা করার জন্য ডেকেছেন।

শিব-শংকর ও মাধব, সভাপতির ড্রইংরুমের চেয়ারে বসে, সামনে রয়েছেন সভাপতি।
আলোচনা শুরুর আগে সভাপতি নিজের সেক্রেটারীকে বললেন, “তুমি বাইরে অপেক্ষা কর, দেখবে, কেউ যেন না  ঢুকে পড়ে, আমি বললে, তুমি ভিতরে আসবে। ”
সেক্রেটারী, বাইরে চলে গেলে, সভাপতি শুরু করলেন, “দেখ, শিবু ও মাধব! তোমরা যদি নিজেদের মধ্যে একটা আপোষে আসতে পারো, তবে তোমাদের মধ্যে একজনের এবার টিকিট হতে পারে, আমার উপর এ নির্দেশ এসেছে। এখন ঠিক কর, কে নির্বাচনে লড়বে; শিবু লড়লে, ওকে চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ করতে হবে, তখন মাধব হবে চেয়ারম্যান। এই শর্তে যদি তোমরা রাজি হও, ভালো, না হলে, অন্য অঞ্চল থেকে  লোক এসে এ অঞ্চলের বিধায়ক হবে, আমারও সেটা মনঃপূত নয়। তোমরা আমাকে লিখে দেবে। মাধব হবে চেয়ারম্যান, তো তার লোকেরা টেন্ডার দিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির
সব কাজ পাবে; আর শিবুর বিধায়ক তহবিল থেকে যে কাজ হবে, সব পাবে শিবুর ছেলেরা; ব্রীজের টোল- টাক্স, একদিকে তুলবে শিবুর ছেলে, তো অন্যদিকে
মাধবের দল। হাইকমান্ডের ভাগ
ঠিক মত তোমরা পাঠাবে। এ চুক্তি পত্রে তোমাদের সই  থাকবে, এবং আমার কাছে সর্বতোভাবে তা গোপন থাকবে।

বাইরের লোক এসে টিকিট নেবে শুনে দু’জনেই একটু নড়েচড়ে বসলো; সত্যই হোক প্রবচন, ‘blood is thicker than water’,
নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, গণ্ডগোল হলেও বাইরের লোকের বিরুদ্ধে একজোট। দু’জনেই সম্মতি দিয়েছে; শিব-শংকর, বিধায়কের জন্য লড়বে, উভয়ের লোকজন তা সমর্থন করে জেতাতে তৎপর হবে; মিউনিসিপ্যালিটির  চেয়ারম্যান হবে মাধব ঘোষাল, ও অন্যান্য বিষয়ে তারা সহমত জানানোয়, সভাপতি, এবার সেক্রেটারীকে ভিতরে আসতে বলে, সব কিছু লিখিত আকারে করে, দু’জনকে দিয়ে সই করিয়ে নিতে বলেছেন; এ ব্যবস্থায়, উভয়েরই স্বার্থ বজায় থাকবে।

নির্বাচনে শিব-শংকর বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। মাধব হয়েছে চেয়ারম্যান। দু’দলের বোমা বাজি, রেষারেষি কমেছে; উন্নয়নের টাকা, দু’দলই লুটছে। কল্যাণীর দিক থেকে আসা গাড়ি- র টোল- ট্যাক্স  তুলছে শিবের দল, তো বাঁশবেড়িয়ার দিক থেকে যাওয়ার টাকা যাচ্ছে মাধবের দলে; হাই- কম্যান্ডকে প্রাপ্য মিটিয়ে চলছে,উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার বহিঃপ্রকাশই মাত্র।

অমরের খুনিরা ধরা পড়েছে, বিচার চলছে, তবে, তারা একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের বলে, হাইকমান্ড এ বিষয়ে পুলিশকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে; ঐ সম্প্রদায়ের লোকই সব রাজনৈতিক- ফড়েদের ভোট- ব্যাঙ্ক, তাই বিচারের নামে হবে প্রহসন; শিব-শংকর, দলের এম এল এ হলেও, কিচ্ছু করার নেই, এদেশে ভোট বড় বালাই—এ দেশে সোনার ডিম দেওয়া হাঁস ওরা,করবে কিচির- মিচির, সব সহ্য করে থাকতে হবে, রইতে হবে
নির্বিকার।

বংশের পৈতৃক ব্যবসার হাল ধরেছে গুঞ্জন ;সে, প্রয়োজনে জেঠুর কাছ থেকে পরামর্শ নেয়।
রাঘবেন্দ্র বাবু , ছোটভাই’র পরিণতিতে কেমন যেন হয়ে গেছেন। জেঠু-জেঠিমা সব সময় মনমরা হয়ে থাকে, তাই তাদের দেখাশোনা করার জন্যও  একজনের থাকা দরকার ভেবে রমেন্দ্র ঘোষাল, পুত্র গুঞ্জনকে নতুন বাড়িতে সারাদিনই থাকতে বলেছে। নীচের অফিস ঘরে, সকাল থেকেই গুঞ্জন এসে বসে; জেঠু -জেঠিমার  এখন একমাত্র বল- ভরসা। ইন্দরও মাঝে মাঝে আসে, দিদি,রমনীর সঙ্গে সময় কাটায়। ওদিকে, আসানসোলের বাপের বাড়ির সঙ্গেও যোগসূত্র নতুন করে শুরু হয়েছে; অবশ্য, সেটা গুঞ্জন ও ইন্দর’র ভাই’র ছেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।