সাদা মিহি বালি
প্রথম অধ্যায়
(দ্বিতীয় পর্ব)
এ অঞ্চলে, ঘোষাল বংশের আদি পুরুষ বিশ্বম্ভর ঘোষাল বসতি স্থাপন করেন। সে কি আজকের কথা! পর্তুগিজ, ডাচ, ওলন্দাজদের ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে, বিশ্বম্ভর ঘোষালও তাদের সঙ্গে দহরম মহরম বাড়িয়েছেন, মো- সাহেবগিরি ও
দো- ভাষীর কাজ করে, এদেশের
মানুষের মান, ইজ্জতকে ধুলোয়
মিশিয়ে, তিনি সম্পদ আহরণ করেছেন; পরে, ইষ্ট- ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে প্রভূত অর্থ
উপার্জন করে, এ অঞ্চলে এসে স্থিতু হন। তাঁর আদি নিবাস অজ্ঞাত। তাঁর উত্তর- পুরুষদের মধ্যে দু’ভাই দিগম্বর ঘোষাল ও হরেকৃষ্ণ ঘোষাল মশাইও ইংরেজ- দের উমেদারী করে,জঙ্গল পরিষ্কার করে এ অঞ্চলে দু’টো প্রাসাদ তৈরি করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক এনে, জমি বিলি করে, প্রজা পত্তন করান। দু’টো প্রাসাদের মধ্যে দূরত্ব, মাইল খানেক হবে; মাঝে বিশাল মাঠ;তার পুবে গঙ্গা নদী। নদীর পশ্চিম-পার বরাবর, অঞ্চলের প্রধান রাস্তার পশ্চিমে, মাঠের ধারে গড়ে ওঠে, নূনের গোলা , পাটের গুদাম, আরও কত কী! মাঠের মাঝে সরু পায়- চলা পথ; ঐ পথে দু’বাড়ির মেয়েরা পালকী যোগে
এ বাড়ি, ও বাড়ি যাতায়াত করতো। মাঠের অন্যদিকে, প্রাসাদের কাজের লোকেদের ও লেঠেলদের আবাসস্থল। অনতিদূরে, গঙ্গার ঘাটে বাঁধা থাকতো বজরা ও বড়, বড় নৌকো;বাণিজ্য- সামগ্রী, ঐ সব নৌকো সহযোগে চলে যেত দেশের একপ্রান্ত হতে অন্যপ্রান্তে। সে সব এখন ইতিহাস; গঙ্গা দিয়ে বহে গেছে অনেক জল, হয়েছে কত উত্থান- পতন, হয়েছে ইতিহাস, থেকেছে অনেক কিছুই
অনুচ্চারিত।
দিগম্বর ঘোষালের প্রাসাদ, উত্তর- পুরুষদের( ্দে্দে্দে্দ্দে্দে্দে্্দে্দে্দে্দ্দে্দে্দে্) মধ্যে ভাগ হতে হতে, অংশীদারদের অবহেলায় এখন প্রায় ভগ্নস্তূপ অবস্থায়; রোজই কড়ি- বরগা খুলে পড়ছে। অংশীদারেরা, প্রায় সবাই এখন ভিন- দেশে স্থিতু; কেবল দু’আনার অংশীদার, নৃপেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল, এখনও দখলি স্বত্ব বহাল রেখেছেন; স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটিও প্রাসাদটিকে বাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। বিপত্নীক হওয়ার পর, নৃপেন্দ্র নারায়ণ, পাশেই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রায় বিঘাখানেক নিজের জমিতে কয়েকটা বসবাসের ঘর, ছিন্নমস্তার মন্দির ও ভৈরবের মন্দির করে, ভগ্ন- প্রাসাদ ছেড়েছেন; মন্দিরের সামনে রয়েছে আ্যসবেসটসে ছাওয়া পুজো- আটচালা; মাটিতে পোঁতা হাড়িকাট; আর রয়েছে,তার আশেপাশে,বিক্ষিপ্ত ছড়ানো
কিছু শুকনো ফুল-বেলপাতা। নৃপেন্দ্র নারায়ণ, এই আস্তানায় নিজেকে তন্ত্র সাধনায় নিয়োজিত করেছেন ;হাতে লোহা ও তামার বালা, গলায় ঝোলে রুদ্রাক্ষের মালা; চোখ দুটো,সব সময় জবা ফুলের মত লাল; তা যে গাঁজা বা চরস জাতীয় দ্রব্যগুণের আধিক্য জনিত প্রভাবে, বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মাঝে, মাঝেই
ঘেরা জায়গার ভিতর থেকে ‘মা’, ‘মা’ চিৎকার, আশেপাশের অধিবাসীদের হৃদকম্পনের কারণ
হয়ে থাকে; পথচারীরা,ভয়ে, দিনের বেলাতেও ঐ মন্দির সংলগ্ন স্থানটুকু পেরোতে পারলে , যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে । রাতের বেলা, পারতপক্ষে, কেউই একলা এ পথ মাড়াতে সাহসী হয় না। পুত্র, নীলাদ্রিনারায়ণ, আরও ভয়ংকর; নদীর ওপার থেকে আসা, অন্ধকার জগতের লোকজনই ওর সঙ্গী, সাথি। সবাই পুলিশের খাতায় দাগী আসামী।
চলবে