ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ১৫)

আলাপ

খেয়াল ঘরানাগুলির কথা শেষ। এবার কয়েকজন বিখ্যাত খেয়ালিয়া, যারা আজও শ্রোতার মন হরণ করে চলেছেন তাঁদের গান দিয়ে, অথচ তাঁদের শিক্ষা মিশ্র ঘরানায়, এবার বলবো তাঁদের কথা। বিভিন্ন ঘরানার সৌরভে তাঁদের সঙ্গীত এক অন্য মাত্রা পেয়েছে এবং ভারতের গন্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে।
আসামের নওগাঁর ঢাকাপট্টি অঞ্চল। আনমনে নিজের গানের ঘরে বিস্তৃত পারস্যের গালিচায় বসে সুর ভাঁজছিলেন ইক্রাম-উল-মজিদ সাহেব। বয়স হয়েছে। আজকাল আর গলা বলে না তেমন। বেগম মহরুফা নাস্তা সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। তা খাওয়ার কথা মনেই নেই ইক্রাম সাহেবের। গান ধরলে তাঁর মন অন্য কোথা অন্য কোনখানে চলে যায়। সেই সুদূর আফগানিস্থানের পার্বত্য গিরিপথে কিংবা ধূসর মরুতে হারিয়ে যায় মন। কতদিন দেখেননি নিজের দেশ! দেখেননি আঙ্গুরলতা, খাননি খুবানি, আখরোট! ওয়ালিদ সাহেব কবেই আফগানিস্থান থেকে ইরান চলে যান । সেখানেই মহরুফার সঙ্গে নিকাহ হয় ইক্রাম সাহেবের আর তারপর একদিন আব্বার বদলি হলো এই আসামের জঙ্গলে কাঠের কাজে। সবাই চলে এলেন এখানে।
ইক্রাম সাহেবের চিন্তা ছিন্ন করে একটি পরীর মতো সুন্দরী মেয়ে এসে বসলো গালিচায়। পরভীন, তাঁর একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আব্বুর কাছে আর দাদ্দুর কাছে গান শিখেছে পরভীন। হুরীর মতো সৌন্দর্যের সাথে সাথে তীক্ষ্ণ সুরেলা কণ্ঠ পরভীনের! দিলে গিয়ে ছুরির মতো বেঁধে যেন! বীরেন্দ্র কুমার ফুকন আর হীরেন শর্মার কাছে অসমিয়া গানও শিখেছে। দেখতে দেখতে পনেরো বছর বয়স হলো পরভীনের। কিন্তু আজ কন্যার মুখখানা ম্লান। ইক্রাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন “কী হয়েছে বেটি?“ পরভীণ রিনরিনে স্বরে বললো “আব্বু, এই আসামের জঙ্গলে পড়ে থেকে আর গান শিখে আমার কিছু হবে না।“ “কেন? কী হয়েছে আমায় বল!“ “আব্দুল মজিদ স্যারের ‘মরম তৃষ্ণা’ রিলিজ করেছে! শুনলাম আমার গান নাকি লোকের মুখে মুখে ফিরছে!“  “সে তো খুব ভালো কথা বেটি! সাবাশ!“  “কিন্তু আমি সে গান শুনেছি আব্বু। আমার একটুও পছন্দ হয়নি নিজের গান! তুমিই তো বলো লতা মঙ্গেশকরজী ছাড়া আর কারো আধুনিক গান না শুনতে! কতো জোর দাও আমার রিওয়াজে! কিন্তু তুমিই শুনে বলো, লতাজীর গলার ধারে কাছেও কি আমি পৌঁছতে পেরেছি? সে তৈয়ারীই আমার নেই। সেই রাস্তা দেখাবার কেউ নেই আব্বুজী। আপনার বয়স হয়েছে। দাদ্দুজী নেই।“  “আয়সি বাত? বেশ, আজ থেকেই গুরুর সন্ধান করছি আমি। তবে আসামে কাউকে পাবো বলে মনে হয় না। কিন্তু বেটি তোর জন্য আমি বেহেস্ত থেকে দোজখ সব জায়গায় যেতে পারি। তোকে হিন্দুস্থানের সবসে আচ্ছা ফিমেল সিঙ্গার হতেই হবে!“ ঘরে এলেন মহরুফা বেগম। আশ্চর্য হয়ে বললেন  “হা আল্লা! নাস্তা তো পানি পানি হয়ে গেলো! আর এই লড়কী কী বলে? আমিই ওর গলা শুনে ওকে গান শেখাতে বলেছিলাম। তা সে তো অনেক হলো। ওর জন্য এবার ভালো পাত্র খোঁজো। বেটি কো বাঈ বানানি হ্যায় ক্যা? অভি সে বিরাদরি মে শুননা পড়তা হ্যায় বেটি সিনিমা মে গা রহি হ্যায়! শরিফ ঘরে এমন হয় নাকি? ইতনা খেয়াল আদি শিখকে ক্যা হোগা?“  “দেখো বেগম জো সমঝতি নহি উসমে দখল মত দো। ম্যায় ইয়ে নহি মানতা কি লড়কা লড়কী মে কোই ফারক হোতি হ্যায়। পরভীন গায়েগি অঔর জরুর গায়েগি। খয়াল সব গানে কা বাপ হ্যায়। উয়ো ওহি শিখেগি! “
অনেক খুঁজে কলকাতায় আচার্য চিন্ময় লাহিড়ীর সন্ধান পেলেন ইক্রাম সাহেব। প্রচুর ছাত্রছাত্রী তাঁর। খুব ভালো শেখান বলে সুনাম। চিন্ময় লাহিড়ী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা আগ্রা ঘরানার বিখ্যাত পন্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতনঝঙ্কারজীর কাছে লক্ষ্ণৌতে মরিস কলেজে। অপূর্ব তাঁর কন্ঠ। ইক্রাম সাহেব নিজে কলকাতায় গেলেন তাঁর কাছে। কিন্তু অতো ছাত্রছাত্রী ফেলে আসামে শেখাতে যেতে একেবারেই রাজী হলেন না আচার্য। এদিকে ইক্রাম সাহেবের কলকাতায় মেয়েকে রাখার কোন জায়গা নেই। কোন আত্মীয় স্বজন নেই । তবু হার মানলেন না। আল্লার কৃপায় তাঁর পয়সার তো অভাব নেই। নিজের শেষ কপর্দক দিয়েও পরভীনকে শেখাবেন তিনি। শুরু হলো পরভীনের শিক্ষা। ট্রেনে এলে আসতে দু তিন দিন, যেতেও তাই। গোটা সপ্তাহ ট্রেনেই কেটে যাবে। অগত্যা প্রতি রবিবার ভোরের ফ্লাইটে মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় আসতেন আর সন্ধ্যার ফ্লাইটে ফিরে যেতেন। ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে গেলো পরভীন। তখন একাই সে আসতে লাগলো।
চিন্ময় লাহিড়ীর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রী তখন পরভীন। গুরুজী তাঁর সব শিক্ষা উজাড় করে দিচ্ছেন তাঁকে আর পরভীনও অনায়াসে সে সব তুলে নিচ্ছেন তাঁর গলায়। তাঁর রূপের ও গানের খ্যাতি সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়লো কলকাতায়। ততোদিনে কুড়ি বছরের যুবতী। কলকাতার বড় বড় আসরগুলিতে গাইতে শুরু করলেন। আকাশবানীতে নিয়মিত গাইতেন। বেশ কটা রেকর্ডিংও হলো তাঁর। এইরকমই একদিন গুরু চিন্ময় লাহিড়ীর ক্লাসে গিয়ে দেখেন একটি ছেলে গান গাইছে। সুন্দর সৌম্য চেহারা । গুরুজী সবাইকে বললেন তাঁর গান শুনতে বললেন । পরভীন মুগ্ধ হয়ে গেলো ছেলেটির গান শুনে! আহা, একেবারে অন্যরকম গায়কী! গলায় পাঞ্জাবী হরকৎ, চঞ্চল বিদ্যুতের মতো তান! যেন বড়ে গুলাম সাবকে মনে পড়ে যায়! কে ছেলেটি! গাইতে গাইতে বেশ কয়েকবার পরভীনের সঙ্গে চোখাচুখি হয়েছে। ততোবারই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছেন পরভীন। গান শেষ হলে গুরুজী পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন যে ছেলেটি বিখ্যাত সরোদ শিল্পী বুদ্ধদেব দাসগুপ্তর ছোট ভাই অরবিন্দ দাসগুপ্ত। পাতিয়ালা ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা। পরে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছেও শিখেছেন। প্রায়ই এরপর গুরুজীর ক্লাসে আসতে লাগলেন অরবিন্দ দাসগুপ্ত। আসলে তিনি ছিলেন গানপাগল। ভালো সঙ্গীতের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন গুরুদের সন্নিধানে। একদিন ক্লাস থেকে সবে বেরিয়েছেন পরভীন। হঠাৎ পিছনে ডাক শুনে ফিরে তাকালেন। দেখলেন অরবিন্দ। বললেন “আপনি কোথায় থাকেন? খুব ভালো লাগে আপনার গান!“ পরভীনের গালদুটি লাল হয়ে উঠলো। এরপর আলাপ বাড়তে বাড়তে একদিন আসামে ইক্রম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন অরবিন্দ। সরাসরি পরভীনকে নিকাহ করার প্রস্তাব দিলেন! কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে কিছুই জানেন না ইক্রাম সাহেব। তাঁর বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষা, কাজকর্ম না জেনে কী করে একমাত্র মেয়েকে তাঁর হাতে তুলে দেবেন? জিজ্ঞাসা করে জানলেন যে ছেলেটি হিন্দু! তাঁর শিক্ষা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। তিনি রাহুল দেব বর্মণের ক্লাসমেট এবং বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের ভাই। কিন্তু তখনকার দিনে এক আফগান মুসলিম মেয়েকে হিন্দু ছেলের সঙ্গে নিকাহ দেওয়া যে অসম্ভব আর গান গাওয়া ছাড়া তো ছেলেটি কিছুই করে না। কীভাবে চলবে নিকাহের পর? পরভীন বায়না ধরে বসলেন অরবিন্দ ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবেন না। গানও শিখবেন তাঁরই কাছে। পাতিয়ালা ঘরানার সঙ্গীত বড় ভালো লেগেছে তাঁর! বাধ্য হয়ে রাজী হতে হলো ইক্রাম সাহেবকে কিন্তু শর্ত হলো যে ধর্ম পরিবর্তন করতে হবে অরবিন্দকে। পরভীনকে ভালোবেসে এক কথায় রাজী হলো অরবিন্দ। তার নতুন নাম হলো উস্তাদ দিলশাদ খান। নিকাহের পর আসামেই থাকতে লাগলেন তারা এবং গানই হলো তাদের পাথেয়।  দিলশাদের শিক্ষায় আগ্রা ঘরানার সাথে সাথে পাতিয়ালা ঘরানার সঙ্গীতে বুনিয়াদ আরো পোক্ত হলো পরভীনের। তৈরী হলো তাঁর নিজস্ব স্টাইল। শ্রোতারা মুগ্ধ হতে লাগলেন বেগম পরভীন সুলতানার অপূর্ব কন্ঠস্বরে, ত্রিসপ্তকবিহারী আবেগপূর্ণ বিস্তারে, বিদ্যুৎগতি তানে। একসঙ্গে বহু যুগলবন্দী অনুষ্ঠানও করতে লাগলেন দুজন।
পরভীন একদিকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর মাত করতে লাগলেন, অপরদিকে হিন্দী সিনেমার জগতের মানুষজনও তাঁর মিষ্টি তীব্র কন্ঠটিকে ব্যবহার করতে লাগল। একের পর এক গদর, কুদরত, পাকীজা ছবিগুলিকে তাঁর গানে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন তিনি। বিখ্যাত হল “হামে তুমসে প্যার কিতনা ইয়ে হাম নহি জানতে”। পেলেন ফিল্মফেয়ার বেস্ট ফিমেল সিঙ্গার। পেলেন একে একে পদ্মশ্রী, পদভূষণ, গান্ধর্ব কলানিধি, মিয়াঁ তানসেন পুরস্কার, সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী পুরস্কার এবং সঙ্গীত নাটক আকাদেমী পুরস্কার। আজও বেগম পরভীন সুলতানার গান শুনতে ডোভার লেনে ভীড় করেন শ্রোতারা। সমবেত করতালিতে হল ভরে যায় যখন লাল বেনারসী, স্বর্নালঙ্কার, ফুলের গজরায় সেজে স্টেজ আলো করে বসেন বেগম আর রাত গভীর হলে যোগকোশের সঙ্গে সঙ্গে ঝলকে ওঠে তাঁর নাকের হীরের নাকছাবি।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।