ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৩৫)আলাপ

আলাপ

“ইয়ে কাহাঁ আ গয়ে হম
ইউঁ হি সাথ সাথ চলতে”
এখনো আমাদের মনের তন্ত্রীতে আঘাত করে যখনই লতাজীর সুরেলা আওয়াজে গানটি বেজে ওঠে রেডিও বা টিভিতে! যাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন এই অমর মেলডি, এবার আলাপে তাঁদের কথা। এমন দুজন শাস্ত্রীয় যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী যাঁদের কথা না বলে শাস্ত্রীয় যন্ত্রঘরানার কথা সম্পূর্ণ করা যাবে না। দুজনেই এমন দুটি যন্ত্র বাজান যা তথাকথিত শাস্ত্রীয়সঙ্গীত যন্ত্র নয়, বরং মূলতঃ লোকসঙ্গীত যন্ত্র! উস্তাদ বিসমিল্লা খানের মতো তাঁরাও এই দুটি যন্ত্রকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙ্গিনায় এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এবং মুগ্ধ করেছেন পৃথিবীকে!
এ হলো শিব-হরির কথা, অর্থাৎ পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া এবং পন্ডিত শিবকুমার শর্মা। দুজনেই ঘরানার অনেক ঊর্ধে নিয়ে গেছেন নিজেদের বাদনশৈলীকে এবং নানা ঘরানার শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলি আত্মীকরণ করে তৈরী করেছেন নিজস্ব স্টাইল যেটি একান্তই তাঁদের নিজস্ব। তবু ঘরানা ও শিক্ষা ছাড়া তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হয় না। তাই একে একে বলি এই অসাধারণ দুই শিল্পী ও তাঁদের শিক্ষা যে ঘরানায় তার কথা।
প্রথমে পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার কথা। তাঁর জীবন তাঁর বাঁশীর সুরের মতোই বিচিত্র! ১৯৩৮ সালে এলাহাবাদে অর্থাৎ বর্তমান প্রয়াগরাজে হরিজীর জন্ম। হরিজীর বাবা ছিলেন নামকরা পালোয়ান ও কুস্তিগীর! তাঁর স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে তাঁর চেয়েও বড়ো কুস্তিগীর বানাবেন! হরিজীর শিশুকাল কেটেছে আখড়ায়! সারা গায়ে মাটি মেখে মুগুর ভাঁজতেন, কুস্তি করতেন এবং তারপর গা থেকে মাটি ছাড়ানোর জন্য ঝাঁপ দিতেন গঙ্গায়! শিশু হরিপ্রসাদকে ছোট্টবেলা থেকে আকর্ষণ করতো সুর! ঘরে মা যখন লোরি শুনিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়াতেন, বালক বড়ো শান্তি পেতো সেই সুরে! কিংবা যখন পিতাজী মন্দিরে ভজন গাইতেন, বালক একমনে বসে থাকতো মন্দিরের কোণে! ক্রমে নিজের মনেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ভজন গাইতে শুরু করলো সে! শুনে একদিন মন্দিরের পুরোহিত হরিজীর বাবাকে বললেন “পালোয়ানজীর তোমার ছেলে তো খুব সুরে গান গায়! তুমি বরং ওকে কুস্তি না শিখিয়ে গান শেখাও!” পালোয়ানজী চোখ পাকিয়ে বললেন “কী! আমার ছেলে গান গাইবে! গান তো বড়োলোকের জিনিস! আমরা হলাম গরীব মাটির মানুষ! আমাদের জন্য গান নয়। আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কুস্তি!” ছেলেটির এ সবে মন নেই। মন নেই পড়াশুনাতেও! গায়ে মাটি মেখে একবার গঙ্গায় ঝাঁপাতে পারলে বেশ খানিকক্ষণ মুক্তি! কুস্তি করে করে গায়ে বেশ শক্তি হয়েছে ততদিনে! দিব্যি নদী পেরিয়ে যেতে পারেন এক দমে! অন্য পাড়ে প্রচুর ফলের গাছ! সেখান থেকে দিব্যি পেড়ে আনেন শশা, তরমুজ! বাবা হরিজীকে খুঁজে না পেয়ে ততক্ষণে চারিদিকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন এবং এরপর পিঠে পড়ে মার!
ইতিমধ্যে বাড়ির পাশে জিনিসপত্র নিয়ে এক দম্পতি এসে ওঠেন। হরিজীর অসীম কৌতুহল! দু চারদিনের মধ্যেই বুঝলেন ভদ্রলোক গায়ক! গান করে এবং শিখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন! পাঁচিল ডিঙিয়ে হরিপ্রসাদ চলে যেতেন লাগলেন সেই বাড়ি! উঠোনে বসে অধীর অপেক্ষা করতেন যদি একবার ভিতরে ডাক পান – যদি গান শিখতে পারেন! একদিন তো চেঁচিয়ে ভজন গাইতেই শুরু করলেন! ভদ্রলোকের নাম ছিলো রাজারাম। তাঁর স্ত্রী গান শুনে বাচ্চা ছেলেটিকে ডেকে নিলেন বসিয়ে নিজের হাতে তৈরী নানা খাবার খেতে দিলেন! তাঁদের কোন সন্তান ছিলো না। খুব মায়া পড়ে গেলো গোলগাল মোটাসোটা ছেলেটির প্রতি! রাজারাম দেখলেন ছেলেটি সুরে গায় আর শেখার ইচ্ছা প্রবল! ক্রমে বাবার আড়ালে ছেলেটিকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নানা রাগ রাগিনী শেখাতে লাগলেন রাজারাম! কিন্তু ক্রমে তিনি আবিষ্কার করলেন যে ছেলেটির গায়নের রেঞ্জ খুবই সীমিত। নীচের সপ্তকের ওপরে তাঁর আওয়াজ ওঠে না অথচ দম প্রচুর! একই স্বরে সে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে ত্থাকতে পারে! তিনি তখন পরামর্শ দিলেন যে ছেলেটি যদি গান না শিখে এমন একটি বাজনা শেখে যাতে প্রচুর দম লাগবে, তাহলে সে আরো অনেক ভালো করতে পারবে! ততদিনে হরিজীর বয়স পনেরো বছর হয়েছে! মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অস্থিরতা! গান তাঁর হবে না। তাহলে? কী বাজাবেন তিনি? সেই সময় বিখ্যাত যন্ত্র সেতার! কিন্তু তা কেনার পয়সা তো তাঁর নেই! বাবাকে বললে মেরেই ফেলবেন!
একদিন বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবছেন, এমন সময় এক বন্ধু জগন্নাথ এসে পাশে বসলো। বললো “চল, বম্বে যাবি? সেখানে তুই সিনেমায় গান গাইবি আর আমি অভিনয় করবো! ওখানে অনেক সুযোগ!” হরিজীর দেখলেন বাড়িতে থাকলে কুস্তির আখড়ার বাইরে বেরোনো হবে না। গানও হবে না। তাই এক কথায় বন্ধুর সঙ্গে রাতারাতি পালিয়ে ট্রেনে উঠলেন। যথারীতি টিকিট কালেক্টরের হাতে ধরা পড়ে গেলেন এবং তিনি তাঁকে এবং তাঁর বন্ধুকে আলাদা দুটি অচেনা স্টেশনে নামিয়ে দিলেন যাতে তাঁরা বাড়ি ফিরে যান! উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের মাঝামাঝি এক অন্ধকার স্টেশনে রাত্রিবেলা কোন জল নেই, খাবার নেই – তিনি একা অসহায় ভাবে পরের ট্রেনের অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুতেই বাড়ি ফিরে যাবেন না! সৌভাগ্যক্রমে পরের ট্রেন এলো এবং তাতে উঠে তিনি আবার বন্ধুর দেখা পেলেন! আবার টিটির থেকে লুকোতে লুকোতে বাথরুমে ঢুকে কোনক্রমে কাটিয়ে শেষে বম্বে পৌঁছলেন! কিন্তু অচিরেই বুঝলেন দুজন বাচ্চা ছেলের বিশাল বম্বে শহরে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই! হাতে একটি পয়সা নেই! ক্রমে তাঁদের মাথায় এলো বাবা বিশ্বনাথের শহর কাশীতে গেলে কিছু একটা ব্যবস্থা হতেও পারে! কাশীতে এসে উঠলেন হরিপ্রসাদ। ট্রেনে আসতে আসতে হরিপ্রসাদজী শোনেন এক অন্ধ ভিখারী বাঁশী বাজাচ্ছে! হঠাত হরিপ্রসাদের মনে হলো বাঁশী তো এমন এক যন্ত্র যেটি সস্তায় গ্রামে গঞ্জে সব জায়গায় পাওয়া যায়! সাধারণ বাঁশের একটি যন্ত্র! অথচ এই বাঁশী থাকে স্বয়ং কানহাইয়াজীর হাতে! ভগবান যে যন্ত্র বাজান, সেটি যদি হরিপ্রসাদ বাজান তাহলে ক্ষতি কী! হরিপ্রসাদ শুনেছিলেন বেনারসে অর্থাৎ কাশীতে অনেক সঙ্গীত গুণী বাস করেন! বন্ধুটি বাড়ি ফিরে গেলেও হরিপ্রসাদ বেনারসে এসে গুরুর সন্ধান করতে লাগলেন!
ক্রমে ভোলানাথ প্রসন্নাজীর দেখা পেলেন! শুরু হলো তাঁর বাঁশী শিক্ষা! গুরুকূল পদ্ধতিতে গুরুর ফাই ফরমাশ খাটতেন এবং গুরুর কাছে থেকেই শুরু করলেন বাঁশী বাজানো! দীর্ঘ আট বছর কোথাও যাননি হরিজী! নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিলেন বাঁশীতে! তাঁর প্রথম ঘরানা হলো বেনারস!
দীর্ঘ আট বছর শিক্ষার পর জীবিকার সন্ধানে আকাশবানী উড়িষ্যাতে যোগ দেন হরিজী। সেখানে তিনি সঙ্গীতরচনা, গানে সুর দেওয়া, নানা ধরণের প্রোগ্রাম সঞ্চালনা, বাজানো সবই করতে লাগলেন। বেশ কিছু ওড়িশী সিনেমায় সুরও দিলেন!
তিনি উড়িষ্যায় আছেন এই খবর পেয়ে তাঁর বাবা অত্যন্ত আহত হলেন! তাঁকে খবর দিলেন বাড়ি ফেরার জন্য! বললেন “তোমার মা মারা যাওয়ার পর আমি আর বিবাহ করলাম না শুধু তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে! আর তুমি আমাকে একা ফেলে পালিয়ে গেলে!” কিন্তু পন্ডিতজীর কাছে কোন উত্তর ছিলো না তাঁর বাবাকে দেওয়ার মতো! তিনি তখন সঙ্গীতের রসে পাগল! তিনি কথা দিলেন যে শিক্ষা সম্পূর্ণ হলে তিনি বাবার কাছে ফিরে আসবেন! কিন্তু সে সময় আর আসেনি।

উড়িষ্যায় সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্টের চাকরী করছেন রেডিওতে, কিন্তু পন্ডিতজীর মনে এক অপূর্ণতা! সর্বদাই মনে হয় কিছুই যেন শেখা হলো না! আরো কতো কী শেখার আছে!
এমন সময় মুম্বই রেডিও থেকে ডাক পেলেন। উড়িষ্যা থেকে মুম্বই চলে গেলেন হরিজী! সেখানে তাঁর জীবনে এক বাঁক অপেক্ষা করছিলো! একদিন এক বন্ধুর কাছে কাছে খবর পেলেন সেনিয়া মাইহার ঘরানার বিখ্যাত সেতারবাদিকা অন্নপূর্ণা দেবী তখন মুম্বইতে! কী এক অজানা টানে একদিন অন্নপূর্ণা দেবীর ফ্ল্যাটে ছুটে গেলেন হরিজী! তিনি একা থাকেন, প্রায় কারো সঙ্গে দেখা করেন না। কিন্তু সেদিন কোন এক ছাত্রকে শেখাচ্ছিলেন। বাইরের ঘরে বসে সেই অপূর্ব সুরমূচ্ছনা শুনে আত্মহারা হয়ে গেলেন হরিপ্রসাদ! তিনি স্থির করলেন অন্নপূর্ণাজীর পায়ে নিজেকে নিবেদন করবেন! এই সঙ্গীত তাঁকে শিখতেই হবে!
তাঁর বাজনা এবং তাঁর আত্মসমর্পণ দেখে তাঁকে শেখাতে রাজী হলেন অন্নপূর্ণা দেবী! কিন্তু তাঁর শর্ত ছিলো আগে যা কিছু শিখেছেন তা সম্পূর্ণ ভুলে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, পালটে ফেলতে হবে বাঁশী ধরার কায়দাও! ডান হাতি থেকে বাঁ হাতি হলেন পন্ডিতজী! সম্পূর্ণ নতুন ভাবে সেনিয়া মাইহার ঘরানায় শুরু হলো তাঁর শিক্ষা!
ক্রমে এক অন্য স্তরে উন্নীত হলো তাঁর বাজনা! তিনি বলেছেন যে তিনি শুধু অন্নপূর্ণা দেবী যা বলতেন তা অনুসরণ করতেন। আর কিছু নয়! কীভাবে যে তাঁকে নতুন ভাবে গড়ে নিলেন অন্নপূর্ণা দেবী, তা তিনি নিজেই জানেন না!
তবে পন্ডিতজী বাঁশীকে লোকযন্ত্র থেকে শাস্ত্রীয়যন্ত্রে রূপান্তরের কৃতিত্ব দেন বিখ্যাত সেনিয়া মাইহার ধরানার বাদক শ্রী পান্নালাল ঘোষকে। রবিশংকর ও আলি আকবরের পাশাপাশি বাবা আলাউদ্দীনের কাছে শিখতেন পান্নালাল। তিনি একটি বাঁশের বাঁশীর স্ট্রাকচারকে অনেকভাবে পরিবর্তন করেন তার সুরের গাম্ভীর্য বাড়ানোর জন্য, মীড় ও অন্যান্য কাজ যেগুলি শাস্ত্রীয় রাগরাগিনীতে প্রয়োজন সেগুলি আনার জন্য। তাঁর সারা জীবন এই কাজে ব্যায়িত হয়! এই কাজকেই আরো এগিয়ে নিয়ে যান হরিপ্রসাদ।

শিক্ষার পাশাপাশি নানা মঞ্চে বাজাতে লাগলেন হরিপ্রসাদ। ক্রমে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়লো গোটা ভারতবর্ষে! এমন কোন সঙ্গীত সম্মেলন নেই যেখানে তিনি বাঁশী বাজাননি! ভারত ছাড়াও পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণায় বাঁশী বাজিয়েছেন তিনি! আফ্রিকার এমন এমন জায়গাতেও গেছেন যেখানে তিনি ছাড়া আর কোন সঙ্গীতজ্ঞ যাননি! বাজিয়েছেন রয়াল অ্যালবার্ট হল থেকে শুরু করে সমস্ত প্রেস্টিজিয়াস হলে, মুগ্ধ করেছেন ব্রিটিশ, আমেরিকান, ইউরোপিয়ান সহ পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তের সঙ্গীতরসিক মানুষকে! বাঁশীর মতো একটি লোকযন্ত্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীরতা নিয়ে এসেছেন অনায়াসে!

একসময় যেমন পন্ডিতজীকে প্রায় বিনা পয়সায় বাজাতে হয়েছে! অনেক সময় সঙ্গে একটি তবলিয়াকেও নিয়ে যেতে পারতেন না, তেমনই পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে যেতো তাঁর পুরো টিম যার মধ্যে একাধিক বাঁশী বাজিয়ে, তবলা, তানপুরা, টিকারা সব থাকতো! একদিন যেমন ট্রেনে থার্ড ক্লাসে ভ্রমণ করতে হয়েছে, পরবর্তীকালে বিমানে বিজনেস ক্লাসে ছাড়া ভ্রমণ করেননি পন্ডিতজী!
পন্ডিতজী স্মরণ করেন নরওয়ের ভোসা ফেস্টিভ্যাল! এমন একটি জায়গায় যেখানে শীতকালে শুধুই অসীম অন্ধকার ও ঠান্ডা! তার মধ্যে আট থেকে দশটি স্টেজে গান বাজনা হচ্ছে! পন্ডিতজী একমাত্র ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ রক এবং জ্যাজের মাঝে! তবু সবাই মুগ্ধ হয়ে শুধু তাঁর বাঁশীই শুনেছে!
বম্বেতে আর একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটে পন্ডিতজীর জীবনে! একদিন তিনি রেডিও স্টেশনে বসে আছেন। এমন সময় শোনেন ভিতরে রেকর্ডিং চলছে এক যন্ত্রের! টুং টাং শব্দে অপূর্ব বাজছে যন্ত্রটি, অথচ তাতে নির্ভুল ফুটে বেরোচ্ছে নানা রাগরাগিনী! সবশেষে পাহাড়ি ধুন শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন পন্ডিতজী! যিনি বাজাচ্ছিলেন, তিনি বেরোনোর পর দেখেন এক অপূর্ব চেহারার যুবক! টকটক করছে গায়ের রঙ! মাথায় কোঁকড়া চুলের রাশি কাঁধ পর্যন্ত! প্রথমেই কেন যেন মনে হলো অনেক জন্ম ধরে চেনেন ছেলেটিকে! অথচ কোনদিন দেখেননি! আলাপ করে জানলেন ছেলেটি এসেছে তাঁরই মতো বাইরে থেকে। তাঁর বাড়ি সুদূর জম্মুতে! ক্রমে বারবার তাঁর সঙ্গে দেখা হতে লাগলো নানা সঙ্গীত সমারোহে! অপূর্ব সন্তুরের হাত ছেলেটির! যেখানে বাজান শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়! দুজনের ভাব জমে উঠলো! দুজনের চিন্তা ভাবনার অনেক মিল! দুজনেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে পছন্দ করেন হিন্দী ফিল্মে লতাজী, রফিজী, মান্না দের গাওয় অপূর্ব সব গান! একদিন দুজন ঠিক করলেন ফিল্মের গানে সুর দিলে কেমন হয়? যে কথা সেই কাজ! দুজনে শিব-হরি নাম নিয়ে সুর দেওয়া শুরু করলেন সিনেমার গানে!
কিন্তু সেই ছেলেটির কথা অর্থাৎ পন্ডিত শিবকুমার শর্মা ও শিব-হরির কথা হবে পরের পর্বে।
আজ শুধু পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়াজীর কথা বলে শেষ করবো।
পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাজনা আমি ব্যক্তিগত ভাবে বহুবার শুনেছি! একবার মনে পড়ে এক অদ্ভুত ঘটনা! কী খুঁতখুঁতে রাগের ব্যাপারে পন্ডিতজী! সেবার রাত্রি তৃতীয় প্রহরে তাঁর বাজনা। তাঁর আগে মধ্যরাতে সেতার বাজাচ্ছিলেন আর এক শিল্পী! তিনি শেষ করলেন ভৈরবী দিয়ে! ভৈরবী এমন একটি রাগ যেটি যে কোন অনুষ্ঠানের শেষে বাজানো হয়। যদিও ভৈরবী সকাল বিকাল যে কোন সময় বাজানো যায়, কিন্তু এরপর আর কোন রাগ বাজানো দুরুহ! পন্ডিতজীর ধারণা হলো শিল্পী ইচ্ছা করে এই রাগ বাজিয়েছেন তাঁর বাজনা নষ্ট করার জন্য! তিনি কিছুতেই স্টেজে আসতে রাজী হলেন না। উদ্যোক্তারা বহু সাধ্য সাধনা করে তাঁকে স্টেজে নিয়ে এলে, তিনি বললেন তাঁকে আগে আবহাওয়া শুদ্ধ করতে হবে! তবেই তিনি বাজাতে পারবেন! তিনি বললেন ভৈরবীর ঐ সুরের প্রভাব দূর করতে পারে একমাত্র হেম-বেহাগ! যা প্রথম সন্ধ্যায় বাজানো হয়! তিনি হেম-বেহাগ বাজাবেন! সবাই সমবেত হাততালি দিয়ে সমর্থন করলেন! পন্ডিতজী বাঁশীতে ফুঁ দিলেন! বাজান আর শুরু মাথা নাড়েন! প্রায় আধ ঘন্টা শুধু আলাপ করেই চলেছেন! হেম-বেহাগের সুরে সুরে নিংড়ে বেড়োচ্ছে তাঁর হৃদয়ের ব্যাথা, কিন্তু তবু শান্তি হচ্ছে না! সেদিন প্রায় দেড় ঘন্টা এই রাগ বাজিয়ে তবে তাঁর শান্তি হয়! তারপর তিনি অন্য রাগ বাজান! অসাধারণ ছিলো সেই বাঁশী শোনার অভিজ্ঞতা!
বৃন্দাবনে একটি গুরুকূল স্থাপন করেন পন্ডিত হরিপ্রসাদ। এ ছাড়াও তিনি রটেনবাম মিউসিক কন্সারভেশন নেদারল্যান্ডের আর্টিস্টিক ডিরেকটর হিসাবে দেশের বাইরেও গুরুকূল তৈরী করেন। প্রত্যেক বছর যান এখানে।
১৯৬৭ সালে শিবকুমার শর্মা ও ব্রিজ ভূষণ কাবরার (গীটার) কল অফ ভ্যালি বলে তাঁদের অ্যালবাম সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। বিটলসের সিঙ্গলসে তিনি বাজিয়েছেন! জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে বাজান, বাজান ম্যাডোনার সঙ্গে।
শিব-হরি নামে সঙ্গীত দেন চাঁদনী, সিলসিলা, লমহে, ডর প্রভৃতি সিনেমায়। তৈরী করেন অসাধারণ সব গান!
নোবেল পিস প্রাইজের অনুষ্ঠান ১৯৯৮ সালে অসলোতে একমাত্র বাজানোর সুযোগ পান তিনি! অসংখ্য পুরস্কারের মধ্যে আছে সঙ্গীত নাটক আকাডেমী, পদ্মবিভূষণ, খড়গপুর আই আই টির অনরারী ডক্টরেট ও আরো অনেক অনেক পুরস্কার দেশে ও বিদেশে! আজও এই বয়সে তিনি প্রতিদিন ছুটে বেড়ান দেশ বিদেশের নানা প্রান্তে! শ্রোতারা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে তাঁর অপূর্ব বাঁশী শুনবে বলে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।