প্রথমেই শুরু করি আমার প্রিয় শিল্পী আমীর খানকে দিয়ে । তিনি হলেন ইন্দোর ঘরাণার প্রতিভূ। এই ইন্দোর ঘরাণার ইতিহাস আবার জুড়ে আছে ভেন্ডিবাজার ঘরাণার সাথে।
তাই প্রদীপ জ্বালার আগে সলতে পাকানোর মতো বলে নিই ভেন্ডিবাজার ঘরাণার কথা । ভেন্ডিবাজার শুনলেই মনে হয় ঠেলার ওপর শাক, সব্জী, বিশেষ করে ভেন্ডি, ফল ইত্যাদি চড়িয়ে স্তুপ করে দরদাম, বিক্রিবাটা চলেছে ঘিঞ্জি বাজার অঞ্চলে। হাতে আলু পেঁয়াজ শাকের আঁটি নিয়ে ঘরে ফিরছে লোকে! এমন একটি নামের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত? নাঃ কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না । কেমন মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো – শেষে কি না ভেন্ডিবাজার একটা ঘরাণার নাম! যাই হোক, জানা গেলো অধুনা মুম্বই-এর ভেন্ডিবাজার অঞ্চলে গড়ে উঠেছিলো এই ঘরাণা । এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ছাজ্জু খান, নাজির খান এবং খাদিম হুসেন খান। এঁরা আবার রাজস্থানের জয়পুর, উত্তরপ্রদেশের আত্রাউলি এবং আগ্রা থেকে এসে মুম্বইয়ের ভেন্ডিবাজার অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন । এঁদের গায়নশৈলীতে অতএব ঐ সব অঞ্চলের ও ঘরাণার ছায়া ছিলো । কিন্তু তার সঙ্গে এঁরা এই ঘরাণাকে আলাদা করে দেওয়ার মতো কিছু বৈশিষ্ট যোগ করলেন । এঁদের মধ্যে খাদিম হুসেন খান ঠিক করেন তিনি নিজের জীবন দিয়ে যাবেন মূলতঃ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষাদানে এবং ছাত্র তৈরীতে। যদিও রেডিওর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি গান করতেন, তবে মূলতঃ গুরু হিসাবেই তিনি বিখ্যাত। এই ঘরাণার বৈশিষ্ট হলো নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে অর্থাৎ দম বাড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে গানের এক একটি পঙক্তি গাওয়া, দীর্ঘ আলাপে মীরখন্ডের ব্যবহার, গমক তান ও সরগম এবং বেশ কিছু কর্ণাটকী অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতীয় রাগের ব্যাবহার।
এখানে প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে মীরখন্ড কি । মীরখন্ড বা মেরুখন্ড হলো কয়েকটি স্বর নিয়ে নানারকম প্যাটার্ণ তৈরী করা ও তার অনেকগুলি পারমুটেশন কম্বিনেশন করে খেলা করা । ধরা যাক সা রে গা মা চারটি স্বরকে কতভাবে বলা যায় দেখা যাকঃ
সা রে গা মা, রে সা গা মা, গা রে সা মা, মা গা রে সা, সা রে মা গা, রে গা সা মা, গা রে মা সা, মা গা সা রে, সা গা রে মা, রে সা মা গা, গা সা রে মা, মা রে গা সা, সা গা মা রে, রে গা মা সা, গা সা মা রে, মা রে সা গা, সা মা রে গা, রে মা গা সা, গা মা সা রে, মা সা রে গা, সা মা গা রে, রে মা সা গা, গা মা রে সা, মা সা গা রে = ২৪ টি প্যাটার্ণ!
এগুলি দ্রুত পরপর সুরে গেয়ে গেলেই তৈরী হয় মীরখন্ড যা খেয়ালের আলাপ বা বিস্তারে যোগ করে এক নতুনত্ব ।
এই ঘরাণার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে আছেন ছজ্জু খানের পুত্র আমান আলি খান (১৮৮৮ – ১৯৫৩) । তিনিই ঘরাণায় কর্ণাটকী রাগের প্রয়োগ শুরু করেন । আমান আলি দক্ষিণ ভারতীয় রাগ শিক্ষা করেন মাইসোরের রাজার সভাগায়ক কলানিধি বিদারাম কৃষ্ণাপ্পার কাছে । অর্থাৎ এটা পরিষ্কার যে সে যুগে একটি ঘরাণার গায়কের অন্য অঞ্চলে গিয়ে সঙ্গীত শিক্ষা করা ও তার মাধ্যমে নিজের ঘরাণাকে আরো সমৃদ্ধ করার প্রচলন ছিলো । আমান আলি লয়কারী অর্থাৎ তাল ও লয় নিয়ে খেলা এবং সরগম দিয়ে বিস্তার ও তান নিয়ে আসেন ঘরাণায় । বিখ্যাত খেয়ালিয়া আমীর খান এই আমান আলিকেই তাঁর গুরু মানেন এবং নিজের গানে তাঁর প্রভাবের কথা বারবার বলেছেন । মান্না দের কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে মুম্বই যান সিনেমার গানে সুর দিতে। তাঁর সঙ্গে যান তাঁর ভাইপো মান্না দে । মুম্বইতে থাকাকালীন গলা তৈরী করার জন্য আমান আলির কাছে বেশ কিছুদিন সঙ্গীতশিক্ষা করেন মান্না দে । শিল্পী তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন আমান আলির কাছে সঙ্গীত শিক্ষার দিনগুলির কথা । লতা মঙ্গেশকরও আমান আলির কাছে খেয়াল চর্চা করেন । শেষ জীবনে আমান আলি পুণাতে চলে যান ।
এবার আসি এই ভেন্ডিবাজার ঘরাণার সাথে জুড়ে থাকা ইন্দোর ঘরাণা ও আমার প্রিয় খেয়াল শিল্পী আমীর খানের কথায় । কোন সূত্রে জুড়ে আছে এই দুই ঘরাণা? ইন্দোর ঘরাণার প্রতিষ্ঠাতা আমীর খানের পিতা শাহমীর খান ছিলেন ভেন্ডিবাজার ঘরাণার এক সারেঙ্গী ও বীণাবাদক। তিনি মুম্বই থেকে ইন্দোরে চলে আসেন এবং ইন্দোরের হিন্দু রাজা হোলকারদের সভায় সভাবাদকের স্থান গ্রহণ করেন। এই ইন্দোরে থাকাকালীনই আমীর খানের জন্ম হয় ১৯১২ সালের ১৫ই আগস্ট । ছোটবেলায় তাঁর বাবা তাঁকে সারেঙ্গী শিক্ষা দিতে থাকেন কিন্তু কন্ঠসঙ্গীতে তাঁর উৎসাহ দেখে পরে কন্ঠসঙ্গীতেই তাঁর তালিম শুরু হয় । ইন্দোরে এই সময় হোলকারদের পৃষ্ঠপোষকতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় বড় আসর বসতো এবং তাতে আসতেন গোটা ভারতবর্ষ থেকে বিখ্যাত গায়ক ও বাদকেরা । তাঁরা সবাই তাঁর পিতার আমন্ত্রণে আমীর খানদের বাড়িতে আসতেন। এর ফলে ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ঘরাণার সঙ্গীত শোনার অভিজ্ঞতা হয় আমীর খানের । ক্রমে তিনি আবদুল ওয়াহিদ খান, ভেন্ডিবাজার ঘরাণার আমান আলি খান, রজব আলি খান ও কিরাণা ঘরাণার আবদুল করিম খানের স্টাইলের সুন্দর দিকগুলি এবং নিজের অসাধারণ সঙ্গীতবোধ মিলিয়ে ইন্দোর ঘরাণার স্টাইল তৈরী করেন ।
যদিও আমীর খান ইন্দোরে বড় হন, কিন্তু তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরাণাগুলির মধ্যে বিভেদ ও রেষারেষি, কূপমন্ডুকতা এবং গোঁড়ামি পছন্দ করতেন না । আকাশবাণীতে দেওয়া এক ইন্টারভিউতে তিনি বলেছিলেন যে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে একটি মাত্র ঘরাণা চান যার নাম হবে হিন্দুস্থানী ঘরাণা । তিনি ইন্দোর ঘরাণাকে তেমনি একটি ঘরাণা হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন যাতে অন্য অনেকগুলি ঘরাণার বৈশিষ্ট ও বৈচিত্র মিশে আছে । কিন্তু এই ঘরাণার মূল বৈশিষ্ট এর শান্ত সমাহিত ভাব । সঙ্গীতের মাধ্যমে যেন এক ধ্যান এবং ঈশ্বরের সন্ধান। ধ্রুপদের মতোই, এই ঘরাণায় রাগের বিস্তার করা হয় ধীর লয়ে । ক্রমে প্রবেশ করা হয় রাগের গভীরে । রাগবিস্তারের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় মূলতঃ মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে । গম্ভীর, বড় ও ভারী রাগগুলি গাওয়াই এই ঘরাণার বিশেষত্ব, যেমন রাগ দরবারী, রাগ মালকৌশ, দক্ষিণ ভারতীয় রাগ হংসধ্বনি ইত্যাদি । এই ঘরাণায় সুরের মিষ্টত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়। গানের বোল অর্থাৎ কথা দিয়ে বিস্তার, মীরখন্ডের ব্যবহার ইত্যাদি করা হয় । নানা ঘরাণা থেকে নেওয়া বিভিন্ন বৈচিত্রপূর্ণ তান করা হয় । তারাণার ব্যবহারও এই ঘরাণার বৈশিষ্ট । তবে গায়নে চঞ্চলতা, হড়ক, মুড়কি ইত্যাদির ব্যবহার খুব কম । তিহাই প্রায় ব্যবহার হয় না । তাই এই ঘরাণার পরমপুরুষ আমীর খানের গান শুনে প্রায় থেরাপিউটিক এফেক্ট ও শান্তি অনুভব করেছিলাম সেই ছোটবেলায় । মনে মনে আজও তাই তিনি আমার প্রণম্য গুরু ।
আমীর খান ১৯৩৪ সালে মুম্বইতে চলে আসেন এবং রেডিওতে ও অন্যত্র গাওয়া শুরু করেন । এই সময় তিনি প্রায় ৬টি ৭৮ আর পি এম রেকর্ড করেন । প্রথমে অনেকে তাঁর গায়কীর বৈশিষ্ট ও সৌন্দর্য অনুভব করতে পারেন নি । কিন্তু ক্রমে তিনি ভারতবর্ষের বিখ্যাততম খেয়াল গায়কদের মধ্যে একজন হন । অপূর্ব গম্ভীর গলা, তিন সপ্তকে অবাধ গতি তাঁর গানকে অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রদান করে । মধ্যপ্রদেশের রাজসভায় কিছুকাল গান করার পর, বেশ কিছু দিন তিনি দিল্লী ও কলকাতায় থাকেন এবং পরে আবার মুম্বই ফিরে যান । আমীর খান সেতার সম্রাট বিলায়েত খানের বোন জিনতকে বিবাহ করেন, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় নি । পরে তিনি মুন্নি বাঈ ও শেষে কলকাতায় থাকাকালীন ঠুংরী গায়িকা মুস্তারীবাঈয়ের কন্যা রইসা বেগমকে বিবাহ করেন । তাঁর এক কন্যা ও দুই পুত্র ছিলো । এর মধ্যে রইসা বেগমের পুত্র শাহবাজ খান অভিনেতা হিসাবে বিখ্যাত হন । মাত্র একষট্টি বছর বয়সে ১৩ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ সালে এক মর্মান্তিক মোটর দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল মৃত্যু হয় ।