খেয়াল ঘরানাগুলির মধ্যে আরেকটি বিখ্যাত ঘরানা হলো জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানা। একে আল্লাদিয়া ঘরানাও বলা হয়, কারণ এই ঘরানার আদি পুরুষ ছিলেন আল্লাদিয়া খান। গত পাঁচ ছয় দশক ধরে কলকাতায় ডোভার লেন থেকে শুরু করে সমস্ত বড়ো বড়ো সঙ্গীত সম্মেলনগুলিতে যে সব নামী শিল্পিরা মার্গসঙ্গীত পরিবেশন করে চলেছেন, তারা অনেকেই এই ঘরানার প্রতিভু এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব! এই নামগুলি কে শোনেননি বলুন তো? কেশরবাঈ কেরকর, গজানন জোশী, নিবৃত্তিবুয়া সরনায়েক, মঘুবাঈ কুরদিকর, মল্লিকার্জুন মনসুর, কিশোরী আমনকর, মাণিক ভিদে ও অশ্বিনী ভিদে দেশপান্ডে, পদ্মা তলওয়ালকর, শ্রুতি সাদোলিকর, সুরেশ তলওয়ালকর, মঞ্জিরি আসনারে কেলকর – নামগুলি শুনলেই মনে হয় যেন ডোভার লেনের সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানসূচী পড়ছি! তাহলেই ভাবুন বর্তমানে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কতখানি প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে এই ঘরানা এবং কত বিখ্যাত শিল্পি বয়ে নিয়ে চলেছেন এই ঘরানার ঐতিহ্য!
প্রথমেই বলি এই ঘরানার ইতিহাস ও গায়নরীতির গোড়ার কথা। অবশ্যই নাম শুনলেই বোঝা যায় কোন অঞ্চলে এই ঘরানার উৎপত্তি। হ্যাঁ, রাজস্থানের সেই গোলাপী শহর জয়পুরে! আর জয়পুর বললেই প্রথমে কী মনে পড়ে? অবশ্যই সুন্দর সুন্দর হাভেলী, প্রাসাদ, দুর্গ, ঝরোখা আর সেই অপূর্ব সব জাফরি কাটা জানালা!
এই হাভেলিগুলিই ছিলো হাভেলি সঙ্গীতের আদি স্থান। হাভেলি কথার অর্থ প্রাচীর ঘেরা নিজস্ব প্রাসাদ বা বড় বাড়ি। রাজস্থানের শহরগুলিতে হাভেলির ছড়াছড়ি!
কিন্তু কী এই হাভেলি সঙ্গীত? প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু মন্দিরগুলিতে দেবতার উদ্দেশ্যে সঙ্গীত ও নৃত্য নিবেদিত হতো। তার প্রধাণ দর্শক ছিলেন দেবতা, যিনি মূলত শ্রীকৃষ্ণ। বৈষ্ণবীয় রীতিতে কীর্তন, ভজন, ভক্তি সঙ্গীত পরিবেশিত হত। এই সঙ্গীতের মূল ছিলো ধ্রুপদ। আদি সঙ্গীত ধ্রুপদের ওম, নোম তোম ধ্বনি দিয়েই শুরু হতো দেবতার আরাধনা। তারপর শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হতো ধ্রুপদ, ধামার, ভজন, কীর্তন ইত্যাদি। সঙ্গীত পরিবেশিত হতো বৃন্দাবনে রাধাবল্লভের সামনে, নন্দগাওতে কৃষ্ণের সামনে এবং নাথদ্বারায় শ্রীনাথজীর সামনে।
মুঘল আমলে যখন ঔরঙ্গজেবের সময় থেকে প্রকাশ্যে গান গাওয়া, বিশেষ করে হিন্দু ভক্তি সঙ্গীত গাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো, তখন দেশের বিভিন্ন অংশের হিন্দু রাজারা তাঁদের মন্দিরগুলি তৈরী করতে লাগলেন নিজেদের দুর্গ বা হাভেলীর অন্দরে। সেখানেই হতে লাগলো গানবাজনা। বিশেষ করে রাজস্থানের রাজপুত হিন্দু রাজারা তাঁদের হাভেলীগুলির মধ্যে মন্দির স্থাপন করে ভক্তিগীতি ও ভজন গান চালু করলেন। এই সঙ্গীতই হাভেলী সঙ্গীত নামে পরিচিত হলো। নিশ্চয় আপনাদের মনে পড়ে যাবে চিতোরগড়ের ভিতরে মীরাবাঈয়ের মন্দির যেখানে প্রতিদিন প্রভাতে শোনা যেত শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে মীরার আকুল গান “মীরা কে প্রভু গিরিধারী নাগর …………”। কালক্রমে হাভেলী সঙ্গীত তার জনপ্রিয়তা হারায় এবং প্রায় কালের গর্ভে বিলীন হয়। যদিও ভজন কীর্তন ইত্যাদি উপশাখাগুলি এখনো জনপ্রিয়, কিন্তু তা অনেকটাই সরে এসেছে ধ্রুপদ এবং মার্গসঙ্গীতের ধারা থেকে।
শোনা যায় জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার খেয়ালগায়নরীতির অনেকটাই সৃষ্টি হয় ধ্রুপদ এবং এই হাভেলী সঙ্গীত থেকে।
কৌতুহল জাগতে পারে জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানা কেন। শোনা যায় ঘরানার আদি পুরুষ আল্লাদিয়া খান আলিগড়ের আত্রাউলি অঞ্চল থেকে জয়পুরের মহারাজের সভায় গান গাইতে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন দুটি অঞ্চলের নামই যেন তাঁর সৃষ্ট ঘরানার থাকে। তাই এমন নাম। কেউ আবার বলেন ঘরানার সৃষ্টিই হয় জয়পুরে, পরে তা আত্রাউলি ও রাজস্থানের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম যুক্তিটিই বেশি গ্রাহ্য বলে মনে হয়।
এবার বলি ঘরানার আদি পুরুষ আল্লাদিয়া খান সম্পর্কে। ১৮৫৫ থেকে ১৯৪৬ – একটি দীর্ঘ সময় আল্লাদিয়া খান বেঁচেছিলেন এবং আমৃত্যু সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। তাঁর জন্ম হয় রাজস্থানের টঙ্ক জেলায় উনিয়ারা বলে একটি ছোট গ্রামে। তাঁর পরিবার জন্মগত ভাবে হিন্দু ছিলেন। স্বামী হরিদাসের বংশধর ছিলেন বলে শোনা যায়। আদ্যা গৌড় এবং শান্ডিল্য ব্রাহ্মণ বংশটি মুঘল আমলে ইসলামে দীক্ষা নিতে বাধ্য হন। কাকার কাছে পাঁচ বছর ধ্রুপদ ও আট বছর খেয়াল শেখেন আল্লাদিয়া খান। তিনি নাকি পঞ্চাশ বছর বয়সেও টানা ছয় ঘন্টা পালটা অভ্যাস করে যেতেন! রাজস্থানের বিভিন্ন দরবারে, যেমন রাজস্থানের আমলেতের রাজার দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতে করতে তিনি অবশেষে জয়পুরের রাজার দরবারে পৌঁছন ও সেখানে সভাগায়ক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। আমলেতের দরবারে থাকাকালীনই তিনি হাভেলী সঙ্গীত ও ধ্রুপদে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর সঙ্গীতরীতিতে তার প্রয়োগ নিয়ে আসেন আল্লাদিয়া খান এবং ঘরানার বৈশিষ্টগুলি তৈরী করেন।
জয়পুর থেকে তিনি বিহার, নেপাল, বরোদা ইত্যাদি স্থানে ঘুরে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
আমলেতের রাজার অনুরোধে অতিরিক্ত উচ্চতায় গলা তুলতে গিয়ে তাঁর স্বরভঙ্গ হয় এবং প্রায় দুবছর গলায় কোন আওয়াজ ছিলো না। স্বর ফিরে এলে তাঁর গলায় সেই মিষ্টত্ব ও সুর আর ফিরে আসেনি। জয়পুরের রাজার মৃত্যুর পর তিনি মুম্বাই চলে আসেন এবং নানা সঙ্গীতসভায় কিছুদিন সঙ্গীত পরিবেশনও করেন। কিন্তু মূলত সঙ্গীত শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করেন। সেই সময় তিনি নাট্যসঙ্গীত ও বালগন্ধর্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর ঘরানার সঙ্গীতে নাট্যসঙ্গীতের কিছু কিছু বৈশিষ্টও যোগ করেন। মুম্বইতেই ১৯৪৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। ততদিনে তিনি অনেক বিখ্যাত ছাত্রছাত্রী তৈরী করে ফেলেছেন।
ঘরানার আদি পুরুষের কথা তো হলো। এবার এই ঘরানার মূল বৈশিষ্টগুলি কী দেখা যাক। ঘরানার প্রথম বৈশিষ্ট “জোড় রাগ”। সাধারণতঃ জোড় রাগ বললেই আমাদের মনে পড়ে বসন্ত-বাহার। কিন্তু অন্যান্য ঘরানায় এই ধরণের রাগ গাওয়ার সময় সাধারণতঃ আরোহণে একটি রাগ ও অবরোহণে একটি রাগ প্রধাণ হিসাবে গাওয়া হয়, যেমন বসন্ত-বাহারে আরোহণে প্রধাণতঃ বাহার এবং অবরোহণে বসন্ত ব্যাবহার হয়। হিন্দি সিনেমায় লতাজী ও রফিজীর গাওয়া একটি বিখ্যাত গান “মন কে বীণ মাতওয়ারী বাজে” শুনলে বোঝা যাবে কী বলতে চাইছি।
“মন কি বীণ মাতওয়ারী বাজে” – এই লাইনটি পুরো বাহার (পা (কোমল)গা মা (কোমল)নি ধা নি সা নিসারেসা (কোমল)নি পা)
আবার ফেরার সময় এই লাইনটি “বসন্ত রুত হ্যায় মন রঙ্গ ডারো” পুরো বসন্ত ((কড়ি)মা (কোমল)ধা নি সা নি (কোমল)ধা পা (কড়ি)মা গা (কড়ি)মা গা (কোমল)রে সা) । কোথাও আবার জোড় রাগের ক্ষেত্রে ওস্তাদরা প্রথমে একটি রাগের বিস্তার তারপর অন্যটির বিস্তার পর্যায়ক্রমে করেন অথবা নীচের দিকে উদারাতে একটি রাগ করেন আর ওপর দিকে মুদারা তারায় অন্য রাগটি করেন।
কিন্তু জয়পুর অত্রাউলি ঘরানার জোড়-রাগ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দুটি রাগ একেবারে মিলিয়ে মিশিয়ে একটিই রূপ দেওয়া হয়। কোথাও দুটি রাগকে আলাদা আলাদা করা যায় না। দুই রাগের সম্মেলনে তৈরী হয় একটি সম্পূর্ণ নতুন রাগ। এ যেন ঠিক রসায়ণের মিশ্রণ ও যৌগের তফাৎ। শ্রোতাদের মনে হবে তারা একটিই রাগ শুনছেন, কিন্তু দুটি রাগের নিজস্ব কিছু কিছু বৈশিষ্ট এখানে ওখানে উঁকি দিয়ে কৌতুহল বাড়িয়ে তুলবে। আল্লাদিয়া খান এইভাবে তৈরী করেন বাসন্তী কেদার, কৌশি কানাড়া, জৈত কল্যাণ, কাফি কানাড়া, বাসন্তী কানাড়া, সাওনি নট, ভুপ নট, নট কামোদ, বিহারি, খট, পট বিহাগ, সম্পূর্ণ মালকৌশ ইত্যাদি। সবগুলিই এক একটি নতুন রাগ হিসাবে গীত হয়।
একটি ছোট উদাহরণ সম্পূর্ণ মালকৌশ। মালকৌশ রাগ একটি ষাড়ব রাগ। এতে আরোহণ অবরোহণে সা (কোমল)গা মা (কোমল)ধা (কোমল)নি সা এবং সা (কোমল)নি (কোমল)ধা মা (কোমল)গা সা ছয়টি স্বর ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ মালকৌশে আরোহণ অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহার হয় অর্থাৎ পঞ্চম ব্যবহার হয়। এতে রাগের মধ্যে এক অদ্ভুত নতুনত্ব ও সৌন্দর্য এবং চমক আসে। সবগুলি জোড় রাগের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।
ঘরানার অন্য বৈশিষ্টগুলির অন্যতম হলো লয়কারী। অর্থাৎ লয় নিয়ে খেলা, নানা ছন্দে বন্দিশের কথাগুলিকে ভেঙ্গে গাওয়া অথচ মূল অর্থ বিঘ্নিত হবে না। নানা ছন্দে ও মাত্রায় লয় ভেঙ্গেও কিন্তু ঠিক সমে এসে পড়বে মুখড়া। সেখানেই গায়কির সৌন্দর্য।
আরেকটি বৈশিষ্ট হলো নানা বক্র স্বর প্রয়োগ। বিস্তারে পরপর এক একটি স্বর সোজা প্রয়োগ না হয়ে স্বরগুলি ঠিক তার আগের ও পরের স্বরের রেশ নিয়ে এবং নানা সূক্ষ্ম কাজ সহ উচ্চারিত হয় এই ঘরানায়, অথচ তাতে রাগদারী নষ্ট হয় না। কখনো আবার বিস্তারে মীড়ের প্রয়োগ হয় অর্থাৎ এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার সময় মধ্যবর্তী স্বরগুলির রেশ টেনে নিয়ে যাওয়া। শেষ বৈশিষ্ট হলো এই ঘরানার গমক তান। দ্রুত তান করার সময় প্রতিটি স্বরে ধাক্কা বা গমক দিয়ে প্রয়োগ করা হয় অথবা একটি স্বরের ওপর দাঁড়িয়ে গমক প্রয়োগ, যেমন গগগগ, মমমম ইত্যাদি। জয়পুর ঘরানার এই গমক তান ঘরানার বাইরে একমাত্র ভীমসেন জোশী তাঁর গানে প্রয়োগ করেছেন।
সর্বশেষ বৈশিষ্ট হল যেহেতু এই ঘরানার সঙ্গীত হাভেলি সঙ্গীত প্রভাবিত, তাই বন্দিশগুলিতে বিভিন্ন দেবদেবী, বিশেষত শ্রীকৃষ্ণের নামগান ও মহিমার প্রকাশ দেখা যায়।
ঘরানায় সঙ্গতকারীতে সাধারণতঃ বড় মুখের তবলা ব্যবহার হয় ও উচুর ষড়জে তবলা না বেঁধে, পঞ্চমে বাঁধা হয়। এতে সঙ্গতে এক বিশিষ্ট আওয়াজ সৃষ্টি হয়।
এর পরের সংখ্যায় এই ঘরানার বিখ্যাত কিছু শিল্পির কথা বলবো, যাঁদের রেকর্ড বা গান শোনার জন্য আমরা আজও উন্মুখ হয়ে থাকি।