উস্তাদ ফৈয়াজ আহমেদ খান, বা ফৈয়াজ খানের কথা বলার আগে আগ্রা ঘরানার গায়কীর বৈশিষ্টগুলি দু কথায় না বললেই নয়, কারণ ফৈয়াজ খানের গায়কী ছিলো সেই বৈশিষ্টগুলিরই প্রতিরূপ। যেমন আগে বলেছি, আগ্রা ঘরানার সূচনায় এই ঘরানায় মূলতঃ ধ্রুপদ, ধামার গাওয়া হতো। পরে খেয়াল গায়ন শুরু হয়। তাই এই ঘরানার গায়কী ছিলো ধ্রুপদ ও খেয়াল শৈলীর এক মিশ্রণ। দুটি শৈলী হাত ধরাধরি করে চলে। একটির থেকে অন্যটিকে আলাদা করা যায় না। এর ফলে এই ঘরানার গায়কীতে খুব জোরালো ও শক্তিশালী আওয়াজ প্রয়োজন। সাধারণতঃ খেয়ালে এতো জোরালো কন্ঠস্বরের প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি স্বর খোলা এবং সোজা লাগানো হয়, অন্য কোন স্বরের রেশ নিয়ে বা বক্রভাবে নয়।
এই ঘরানায় ঠিক ধ্রুপদের মতোই খেয়ালের আলাপ শুরু হয় নোম তোম দিয়ে। বন্দিশ দিয়েই রাগরূপটি প্রকাশ করা হয় এবং তারপর বিস্তার করে রাগটি বাড়ানো হয়। ঘরানার গায়কীতে সোজা “আ” দিয়ে বিস্তার হয় এবং তাতেই নানা বৈচিত্র আনা হয়। ঘরানার গায়কী গম্ভীর পুরুষ কন্ঠের জন্য বেশী উপযুক্ত এবং মন্দ্র সপ্তকে বেশী গাওয়া হয়। ধ্রুপদ শৈলী অনুযায়ী গায়কেরা বেশী গমক এবং মীড় ব্যাবহার করেন।
এই ঘরানার উস্তাদরা লয়কারীতেও অত্যন্ত পারদর্শী। বন্দিশটি বিভিন্ন লয়কারী করে গাওয়া হয়। শ্রোতাদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা ও কৌতুহল তৈরী করে নানাভাবে সমে এসে পড়েন শিল্পিরা।
এটি এমন একটি ঘরানা যেখানে ধ্রুপদ, খেয়ালের সাথে সাথে ঠুমরি, টপ্পা, তারানা ও হোরিও গাওয়া হয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অঙ্গ হিসাবে।
এই সবকটি বৈশিষ্টই ফৈয়াজ খানের গানে পূর্নরূপে বর্তমান। তাই ওনাকে এই ঘরানার প্রতিভূ বলা যায়। আগ্রার সিকন্দরাতে ১৮৮৬ সালে ফৈয়াজ খানের জন্ম হয়। কথিত আছে সম্রাট আকবরের দরবারের গুণি গায়ক হাজি সুজান খানের বংশধর ছিলেন ফৈয়াজ খান। তাঁর বাবা খুব ছোটবেলায় মারা যান। তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা হয় মূলত তাঁর দাদু গুলাম আব্বাস খান এবং তাঁর দাদুর ভাই কাল্লান খানের কাছে। দুজনেই আগ্রা ঘরানার বিখ্যাত শিল্পি ছিলেন। জোহরা বাঈয়ের গায়নরীতিও ফৈয়াজ খানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। পরে তিনি “দরশপিয়া” নামে বিখ্যাত উস্তাদ মেহেবুব খানের জামাই হন। এই বিভিন্ন গুরুর গায়কী একাত্মীকরণ করে তিনি আগ্রা ঘরানার স্টাইলকে এক নতুন রূপ ও দিশা দেন। খেয়াল ছাড়াও তিনি ঠুমরি, দাদরা, গজল ও কাওয়ালী গাইতেন।
উস্তাদ ফৈয়াজ খানকে বলা হতো “মেহফিল কা বাদশা”। কেন বলা হতো, তা যারা তাঁকে সামনাসামনি শোনার সৌভাগ্য পেয়েছেন, তারাই বুঝতে পারবেন। উস্তাদ মঞ্চে উঠতেন সিল্কের শেরওয়ানী পরে। বুকে ঝলমল করতো তাঁর পাওয়া সোনার মেডেল ও চেনগুলি। মাথায় থাকতো এক অপূর্ব পাগড়ী। দুপাশে শিষ্যদের নিয়ে এবং সারেঙ্গী ও তবলিয়াকে নিয়ে উস্তাদ যখন মঞ্চ আলো করে বসতেন, সে এক দেখার মতো বিষয় ছিলো। যাকে আমরা বলি “স্টেজ প্রেসেন্স” তা অসাধারণ ছিলো ফৈয়াজ খানের। উস্তাদজী যখন তাঁর জোয়ারিদার গভীর পুরুষালী গলায় গান ধরতেন তখন শ্রোতারা মোহাবিষ্ট হয়ে পড়তেন। তাই তো তাঁর উপাধী হয় “আফতাব-এ-মৌসিকি” অর্থাৎ অর্থাৎ গানের সূর্য।
উস্তাদজী সর্বদা প্রথমে ধ্রুপদের মতো নোম-তোম আলাপ করে তারপর খেয়ালের বন্দিশ ধরতেন। তাঁর বোল-তান, বাঁট, লয়কারী এবং সমে এসে পড়ার অনন্য কায়দা ছিলো তাঁর, আজও যার জুড়ি পাওয়া যায় না।
উস্তাদজী সঙ্গীত রচয়িতাও ছিলেন। “প্রেমপিয়া” ছদ্মনামে তিনি অনেক অপূর্ব বন্দিশ রচনা করেছেন। জয়জয়ন্তী ও যোগ রাগে তাঁর লেখা বন্দিশগুলি এখনো আগ্রা ঘরানার সম্পদ হয়ে আছে।
১৯১২ সালে বরোদার রাজার দরবারে সভাগায়ক নিযুক্ত হন ফৈয়াজ খান। কিন্তু তিনি বিভিন্ন দরবার, উৎসব ও সঙ্গীত সমারোহে জীবনের শেষ দিন অবধি গান গেয়েছেন।
শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ফৈয়াজ খানের গানের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর কুদরত রঙ্গীবিরঙ্গী গ্রন্থে তাঁর পিতার কাছ থেকে শোনা একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। একবার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সঙ্গীতসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ফৈয়াজ খান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সে সভার অন্যতম শ্রোতা। উস্তাদজী দীর্ঘক্ষণ রাগ রামকেলী করেন। প্রথমে ধ্রুপদী আলাপ এবং পরে খেয়াল। রবীন্দ্রনাথ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। গান শেষ হলে দেখা গেলো কবির মুখ লাল! তিনি উস্তাদকে একুশটি সোনার মোহর দেন এবং বলেন যে “ইনি আমার জীবনের পঞ্চাশটি বছর আজ নিয়ে নিলেন” অর্থাৎ, কবি নাকি তাঁর জীবনের পঞ্চাশ বছরে সঙ্গীত সম্বন্ধে যা ধ্যান ধারণা করেছিলেন সবই বদলে গিয়েছিলো সেদিন উস্তাদজীর গান শুনে।
উস্তাদ ফৈয়াজ খানের বিখ্যাত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন আতা হুসেন খান, লাতাফত হুসেন খান, শরাফত হুসেন খান, কে এল সায়গল, দিপালী নাগ, এস এন রতনঝঙ্কার ইত্যাদি।
শেষ জীবনে তিনি টি বি রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৫০ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি যুগের অবসান হয়।