ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ২৭)

আলাপ
কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই বলেছিলাম যে এতে আমার জ্ঞান সীমিত, কারণ আমার মূল শিক্ষা হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। তবু এতো বিশাল এক সঙ্গীত ভান্ডার ছুঁয়ে না গেলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। কর্ণাটকী সঙ্গীতের সেই দু একজন ব্যক্তিত্ব যাঁদের নাম দক্ষিণ ভারতের গন্ডী ছাড়িয়ে সমগ্র ভারতে এবং গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং দেশ ও ভাষার গন্ডী পেরিয়ে যে সঙ্গীত সব মানুষের হৃদয় হরণ করেছে সেই পর্যায়ের দুই একজন সঙ্গীতজ্ঞের কথাই বলবো ।
সম্ভবতঃ সেটি আশির দশকের কোন একটি সময়। কলকাতায় তখন বামফ্রন্ট সরকারের আমল। সম্ভবতঃ তাদের শাসণকালের দশম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বেশ কয়েকদিনব্যাপী খুব বড়ো একটি সঙ্গীতসভা আয়োজিত হয়েছিলো নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। সারা রাত্রিব্যাপী সেই সভায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের এমন কোন ব্যক্তিত নেই যিনি আসেননি, এমনকি এসেছিলেন স্বয়ং রবিশংকরজীও। সেই সব নামের এমন টান যে দূরদূরান্তর এমনকি গ্রাম থেকেও সঙ্গীতপিপাসু মানুষ বহু পূর্বেই টিকিট কেটে হাউসফুল সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলো। নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়াম গমগম করছে। কতো যে স্টল বসে গেছে খাবারদাবারের তার শেষ নেই। অনেকেই আবার বাড়ি থেকে নানারকম জিনিস বানিয়ে একেবারে পিকনিকের মেজাজে গান শুনতে এসেছেন সারা রাত ধরে। কেউ খুলে ফেলছেন ফিশ ফ্রাইয়ের কৌটো, কেউ কেউ বেশ কয়েকটি সিট জুড়ে চাদর পেতে পোলাউয়ের হাঁড়ি থেকে কাগজের প্লেটে বেড়ে বেড়ে পোলাউ খাচ্ছেন! তখনও বিরিয়ানী বস্তুটি বাঙ্গালী সমাজে এতোটা প্রচলিত হয়নি। এমনকি চাইনীজের স্বাদও সাধারণ বাঙ্গালী ততোটা পায়নি। বাঙ্গালী মানেই খাওয়াদাওয়া। সে দৃশ্য না দেখলে বোঝানো যাবে না, তাই ধান ভানতে একটু শিবের গীত না গেয়ে পারলাম না। তো সেই সভার সিজন টিকিট কেটে ফেলেছিলেন আমার সঙ্গীতরসিক পিতৃদেব এবং আমাকে তিনি উমদা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনাবেনই। তাই হয় মা নয় বাবা এক এক রাতে যেতেন আর সঙ্গে আমি কন্সট্যান্ট। ভাই এ সব ঝামেলায় না গিয়ে দিব্যি ঘুম লাগাতো বাড়িতে। তা এর মধ্যে একদিন দেখলাম ভীড়টা একেবারে ফেটে পড়ছে! কিন্তু সেদিন তো রবিশংকরজী বা আলি আকবর আসার কথা নয়, কোন নাচের অনুষ্ঠানও নেই! তাহলে এতো ভীড় কেন? বলতে বলতে স্টেডিয়ামের সিঁড়ির দু দিকে দেখি দুজন শিল্পীর বড়ো বড়ো কাটআউট। দুজনের কাউকেই তেমন চিনি না! এঁরা কি খুব বড়ো কেউ? এমন ভাবতে ভাবতে হলে ঢুকে সিটে বসে কার্ড খুলে দেখি সেদিন হিন্দুস্থানী ও কর্নাটকী সঙ্গীতের মুখোমুখি লড়াইতে নামছেন ডঃ এম বালমুরলীকৃষ্ণ কর্ণাটকী এবং শ্রী অজয় চক্রবর্তী হিন্দুস্থানী খেয়ালে। অজয় চক্রবর্তীর দু একটি বাংলা রাগপ্রধাণ গান এবং সঙ্গীতশিক্ষার আসর টিভির কল্যানে দেখা ছিলো । অসাধারণ কন্ঠ! সেটুকু শুনে বুঝেছিলাম। কিন্তু বিশুদ্ধ খেয়াল গায়ন শোনা ছিলো না তখনও। সর্বভারতে তাঁর নাম তখনও সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। আর বালমুরলীকৃষ্ণ সম্বন্ধে তো কিছুই জানতাম না। মধ্যরাতে দুজনে স্টেজে এসে বসলেন। অজয় চক্রবর্তীর পরণে চওড়াপাড় ধুতি ও পাঞ্জাবী এবং বালমুরলীকৃষ্ণের পরণে বেষ্টি, সাদা শার্ট এবং কপালে শ্বেত ও রক্ত চন্দনের রেখা শোভা পাচ্ছে। একদিকে তবলা, হারমোনিয়াম, সারেঙ্গী এবং অন্য দিকে বেহালা, মৃদঙ্গম এবং ঘটম। পিছনে অন্ততঃ চারটি তানপুরা সুর ছেড়ে চলেছে। এছাড়াও অজয় চক্রবর্তীর কোলে সুরমন্ডল। স্টেজ যেন সঙ্গীতের রসে অবগানহনের জন্য সেজে উঠলো। যন্ত্র বাঁধা চললো বেশ কিছুক্ষণ। যখন প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়েছি এবং ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে, তখন হঠাত চোখ খুলে উঠে বসতে হলো মালকোষ রাগে, পরে জেনেছিলাম কর্ণাটকী সঙ্গীতে তাকে বলে রাগ “হিন্দোলম” এ সুতীক্ষ্ণ তিনসপ্তকব্যাপী এক অতি দ্রুত মূর্ছনা শুনে। সেই অসাধারণ আওয়াজ বেরোলো সেই চন্দনলেপিত ললাট ব্যাক্তিটির কন্ঠ হতে। সারা হল হৈ হৈ করে উঠলো। সমবেত হাততালিতে চারিদিক গুঞ্জরিত! আরোহণে তিনি উঠে থাকেন, এবার অবরোহণে তেমনি চমকে দিয়ে উচ্চতম তারার সা থেকে উদারার গভীর খাদের সা তে নেমে এলো অজয় চক্রবর্তীর সিল্কের মতো মোলায়েম কন্ঠ! সেদিন রাতের অসাধারণ অনুষ্ঠানের সুরটি যেন সেখানেই বাঁধা হয়ে গেলো।পরে শুনেছিলাম সেই ছিলো তাঁদের প্রথম যুগলবন্দী। এরপর হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা এমন ভাবে কর্ণাটকী ধারার সঙ্গে মিশে গিয়েও নিজ বৈশিষ্ট বজায় রাখলো যে মনে হলো গঙ্গা গোদাবরী সঙ্গম। দুজনেরই গলায় অসম্ভব কারুকাজ, দরদ, মীড়, ছোট ছোট মুড়কী এবং তিনসপ্তক বিহারী রেঞ্জ! সে গান না শুনলে বোঝানো অসম্ভব। সবচেয়ে উপভোগ করেছিলাম তারানা বনাম তিল্লানার লড়াই! সঙ্গে অসাধারণ তবলা ভার্সাস মৃদঙ্গম, ঘটমের সওয়াল জবাব! সেদিন সকালে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম তা মনে আছে।
তাঁর গান শোনার জন্য এরপর দু তিনটি ক্যাসেট কিনে ফেলেছিলাম তা মনে আছে। কিন্তু এরপরেই তাঁর গান সর্বভারতীয় শ্রোতার কর্ণকুহর দিয়ে মরমে পশিলো “মিলে সুর মেরা তুমহারা” র সুবাদে। সেও এক সরকারী পরিকল্পনা। ভারতের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য এতো সুন্দরভাবে বোধহয় আর কোথাও পরিবেশিত হয়নি। সেখানে মনে আছে সেই দৃশ্য যেখানে দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির, সজ্জিত হস্তী, থেকাড্ডির জঙ্গলের কয়েকটি শটের পর শ্বেতবস্ত্র পরিহিত বালমুরলীজির ভৈরবীতে সেই তিনসপ্তকব্যাপী সাপাট তান এবং সত্যি যেন সুর মিলে গেলো উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমের!
আলাপের পাতায় এবার কর্ণাটকী সঙ্গীতের এই যাদুকর ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণজীর জীবন ও গান নিয়ে কটি কথা। ১৯৩০ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের সমুদ্রতীরবর্তী গোদাবরী জেলার শংকরগুপ্তম গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের। তাঁর নাম ছিলো শ্রীপট্টভিরামাইয়া। তিনি অত্যন্ত গুণী সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। বেহালা, বাঁশী ও বীণা সমানভাবে বাজাতে পারতেন এবং মা ছিলেন অসাধারণ বীণাবাদিকা ও বিখ্যাত সঙ্গীতরচয়িতা প্রয়াগ রঙ্গদাসুর কন্যা সূর্যাকান্তাম্মা। সঙ্গীত রক্তে নিয়েই জন্মেছিলেন এই বিস্ময়বালক। খুব ছোট বয়সে মাকে হারান তিনি এবং পিতাই তাঁকে মানুষ করেন। তাঁদের ব্রাহ্মণ সমাজে যদিও সঙ্গীতকে খানিকটা হীণ জ্ঞান করা হতো, কিন্তু তার কোন প্রভাব পিতা তাঁর মধ্যে পড়তে দেননি। তবে সেই সময় অন্ধ্রপ্রদেশের ঐ অঞ্চলে কর্ণাটকী কন্ঠসঙ্গীত, বাদন ও নৃত্যের চর্চা এবং বড়ো বড়ো অনুষ্ঠান ভালোই প্রচলিত ছিলো। বালমুরলীকৃষ্ণ বাকিংহামপেটে মিউনিসিপাল স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশুনায় তাঁর মন ছিলো না। কয়েক বছর পর তিনি স্কুল ছেড়ে ফিরে আসেন। খুব ছোট বয়সেই তাঁর গায়কী শুনে পিতা তাঁর উপযুক্ত সঙ্গীত গুরুর সন্ধান করছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে পারুপল্লী রামকৃষ্ণ পান্তুলু, যিনি বিখ্যাত ত্যাগরাজার শিষ্য ছিলেন, তাঁর কাছে গুরু শিষ্য পরম্পরায় তাঁর শিক্ষা শুরু হয়।
গুরুর নির্দেশে মাত্র দশ বছর বয়সে বিজয়ওয়াড়ায় একটি সঙ্গীতসমারোহে তিনি প্রথম সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁর অসাধারণ গান শুনে বিখ্যাত হরিকথা শিল্পী মুসুনুরি সূর্যানারায়ণা ভাগবত্তর তাঁকে “বালা” উপাধি দেন। তাঁকে ছোট করে বিএমকে নামে ডাকা হতো। ১৯৪১ সালে তিনি মাত্র এগারো বছর বয়সে রেডিওতে সঙ্গীত পরিবেশন শুরু করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই সঙ্গীতের এক বিস্ময়প্রতিভা এবং আইকন হিসাবে চিহ্ণিত হন। এরপর তিনি গুরুর সঙ্গে কর্ণাটকের থিরুভায়ারুতে ত্যাগরাজের সম্মানে আয়োজিত এক সঙ্গীত সমারোহে এমন সঙ্গীত পরিবেশন করেন যে বিখ্যাত শিল্পী ব্যাঙ্গালোর নাগারত্নাম্মল মুগ্ধ হয়ে যান এবং ভবিষ্যতবাণী করেন যে এই বালক শীঘ্রই এক বিস্ময়প্রতিভায় পরিণত হবেন।
সেই সময়ে দক্ষিণ গোদাবরী জেলায় বিভিন্ন বড় বড় সঙ্গীতসভার আয়োজন হতো নানা মন্দিরে, মন্ডপে এবং সভাগৃহে। সেখানে মাত্র তেরো বছর বয়সেই বালমুরলীকৃষ্ণ বছরে প্রায় দুশোটি সভায় সঙ্গীত পরিবেশন করতেন, তিনি এতোটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কন্ঠসঙ্গীত ছাড়াও তিনি বেহালা, ভায়োলা, কঞ্জিরা ও মৃদঙ্গম ইত্যাদি অসাধারণ বাজাতেন এবং বহু শিল্পীর সঙ্গে সঙ্গত করেছেন।
তিনিই একমাত্র কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ যিনি বাহাত্তরটি দক্ষিণ ভারতীয় মূল মেলকর্তা রাগের প্রত্যেকটিতে সঙ্গীত রচনা করেছেন। প্রতিটি রাগে তাঁর রচিত কৃতি আছে। এগুলিকে একসঙ্গে তিনি জনক রাগমঞ্জরী বলে একটি গ্রন্থে ১৯৫২ সালে প্রকাশ করেন। এর প্রতিটি রাগানা রাভালি বলে নটি ভলিউমে সঙ্গীতা রেকর্ডিং কোম্পানী থেকে প্রকাশিত হয়।
মূল রাগগুলিতে অসাধারণ সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি তিনি কর্ণাটকী সঙ্গীত নিয়ে বহু পরীক্ষানিরীক্ষা করেন এবং অনেকগুলি অন্যধরণের রাগ সৃষ্টি করেন। যেমন রাগ লবঙ্গীতে আরোহণ অবরোহণে মাত্র তিনটি স্বর। রাগ মহতী, সিদ্ধি, সুমুখম ইত্যাদিতে মাত্র চারটি করে স্বর। রাগ সর্বশ্রী, ওমকারী ও গণপতিতে মাত্র তিনটি করে স্বর অথচ তাই ব্যবহার করে অসাধারণ সুরের চলন এই রাগগুলিতে। তিনি উত্তরভারতীয় এবং কর্ণাটকী বলে সঙ্গীতের কোন বিভেদ মানতেন না। তাঁর মতে সবই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। কিন্তু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আরোহণ অবরোহণে সাতটি স্বর থাকলে সম্পূর্ণ, ছয়টি থাকলে ষাড়ব এবং পাঁচটি স্বর থাকলে ঔরব রাগ বলা হয়। এর কমে কোন রাগ সংগঠন সম্ভব নয় বলে বলা হয়। তাই তাঁর সৃষ্ট এই রাগগুলি নিয়ে নানা ধরণের সমালোচনার স্বীকার হতে হয় তাঁকে। অনেকে তাঁকে পাগল আখ্যাও দেন। কিন্তু তাঁর প্রতিভার গভীরতা এবং গায়কীর নতুনত্ব এতোই প্রখর ছিলো যে তা সূর্যের মতো এই সব সমালোচনাকে দূরে সরিয়ে দেয়। তিনি নানা কর্ণাটকী সঙ্গীত রচয়িতার রচিত বহু পুরাতন কৃতি পুনরুদ্ধার করে সেগুলিও গেয়েছেন এবং জনপ্রিয় করেছেন। তাঁর গায়কীর প্রধাণ বৈশিষ্ট ছিলো অত্যন্ত সুরেলা ত্রিসপ্তক ব্যাপী কন্ঠ, বিশুদ্ধ পরিষ্কার উচ্চারণ এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশুদ্ধতাকে নষ্ট না করেও নানা জিনিস গানে নিয়ে আসা, যাতে তা সহজেই জনপ্রিয় হয়।
সঙ্গীতের পাশাপাশি ১৯৬৭ সালে সিনেমায় নামেন বালমুরলীকৃষ্ণ। ভক্ত প্রহ্লাদ সিনেমায় নারদের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় ও সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তারপর থেকে সিনেমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হয় এবং প্রায় তিরিশটি সিনেমায় তিনি হয় অভিনয় অথবা সঙ্গীত পরিবেশন বা সুরকার হিসাবে কাজ করেন। সিনেমাগুলি কানাড়া, তেলেগু, তামিল, মালয়ালী,হিন্দী, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় ছিলো। তিনি গায়ক হিসাবে ১৯৭৫ সালে হামসঙ্গীতে সিনেমায় গাওয়ার জন্য জাতীয় পুরস্কার পান এবং ১৯৮৭ তে মাধবাচার্য সিনেমার সুরকার হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পান। তাঁর সৃষ্ট কৃতি ও তিল্লানাগুলি এখনো বিভিন্ন সঙ্গীত সমারোহে গান হিসেবে বা নৃত্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
তিনিই প্রথম সংগীতজ্ঞ যিনি ভীমসেন যোশী, কিশোরী আমনকর, পন্ডিত যশরাজ, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার মতো বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের সঙ্গেও যেমন যুগলবন্দী পরিবেশন করেছেন, তেমনই তাঁর তুলনায় অনেক কমবয়সী অথচ প্রতিভাবান অজয় চক্রবর্তী, রণু মজুমদারের সঙ্গেও যুগলবন্দী করেছেন নিজে এগিয়ে এসে। অজয় চক্রবর্তীকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন এবং তাঁকে শিষ্য হিসাবে কর্ণাটকী সঙ্গীতে শিক্ষাদানও করেন। তিনি একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন একটি বিখ্যাত ব্রিটিশ কয়ারে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতার ওপরে একটি অংশ ছিলো যার নাম ছিলো “গীতাঞ্জলি স্যুট”। এতে কথাগুলি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির বিভিন্ন কবিতা থেকে নেওয়া এবং সুর ছিলো ডঃ জোয়েল, বিখ্যাত গোয়ান সুরকার যিনি ইউ কে তে থাকতেন। এই ভাবেই বিশ্ব সঙ্গীতেও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন বালমুরলীকৃষ্ণ ।
নিজের জীবৎকালে দেশে ও বিদেশে প্রায় ২৫০০০ সঙ্গীত সভায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন বালমুরলী এবং কর্ণাটকী ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের সভায় বিশেষ মর্যাদার স্থান দেন। এমন কোন সঙ্গীত সম্মান নেই যা তিনি পাননি। মাত্র তেইশ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। এরপর সঙ্গীত নাটক আকাদেমী, সঙ্গীত কলানিধি, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ইত্যাদি প্রতিটি পুরস্কারেই অলঙ্কৃত হন। ফরাসী সরকারের কাছ থেকে শেভালিয়র অফ দ্য অর্ডার দ্য আর্ট অঁ দ্য লেটারস পান।
অত্যন্ত হাসিখুশি উষ্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলো তাঁর। প্রচুর ছাত্রছাত্রীকে গুরু শিষ্য পরম্পরায় নিজের বাড়িতে রেখে শিখিয়েছেন তিনি, যার মধ্যে অজয় চক্রবর্তীও আছেন। এই সব গুণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন বি এম কে। ২০১৬ সালে ছিয়াশি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।