গল্পে তপন মন্ডল

পূর্ণ উপহার
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বাপ-মা হারা অতসী মিত্রের। পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম আসছে না মোটেই। এপাশ-ওপাশ করে সময় কেটে যাচ্ছে। গভীর রাতের নির্জনতায় সে যেন একমাত্র অতন্দ্র পাহারায়। নানা রকমের দুর্ভাবনা গ্রাস করেছে । বিছানা থেকে উঠে বসলো অতসী । রাত্রি ক’টা বাজে তাও জানা নেই। ঘুমানোর আগে মোবাইল সুইচড অফ করে চার্জে দিয়েছিল সে। দু’ পা উঠে গিয়ে ঘরের লাইট অন করল। চার্জে দেওয়া মোবাইলটি হাতে করে দরজা দিয়ে অন্ধকার উঠানে বকুল গাছের নিচে গিয়ে বসে পড়ল অতসী।
বকুল গাছের নিচে বসে মোবাইল অন করলো । পিকচার ফাইলে দাদার ছবিটি বের করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। গত বছর অফিস থেকে ফেরার পথে এক ভয়ংকর অ্যাক্সিডেন্টে অতসীর দাদা অভয়ের মৃত্যু হয়। দাদাকে বড্ড ভালবাসত অতসী। বাপ- মায়ের মৃত্যুর পর সাত বছরের ছোট বোন অতসীকে নিজের হাতেই মানুষ করেছিল অভয়। বোনকে বিয়ে না দিয়ে অভয় নিজে বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছিল।
অতসী গত বছরেই বি.এ ফাইনাল ইয়ার শেষ করেছে। বোনকে বিয়ে দেবে বলে ভালো পাত্রের সন্ধান করছিল অভয়। কিন্তু অদৃষ্ট যে অভয়ের জীবনকে এভাবে কেড়ে নেবে তা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
দাদার মৃত্যুর পর অতসী একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে। নিকট আত্মীয় তেমন কেউ নেই। একাকীত্ব জীবন তাকে আরও অসহায় করে তুললো। সম্পত্তি বলতে পিতার রেখে যাওয়া এই ভিটেটুকুই। অতসীর বিয়ের জন্য দাদা যে টাকা জমিয়েছিল তা দাদারই শেষকৃত্য ও শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে খরচ করে ফেলেছে অতসী।
এই কম্পিটিশনের যুগে সিম্পিল বিএ পাস করে অতসীকে কে বা চাকরি দেবে। এই বেকারত্বের যুগে চাকরি পাওয়া মুখের কথা নয়। অতসী সিদ্ধান্ত নিল যে করেই হোক একটি কাজ তাকে খুঁজতেই হবে।
অনেক চেষ্টার পর দাদার বন্ধুর সহযোগিতায় অতসী শহরের এক নামী রেস্টুরেন্টে হোম ডেলিভারির কাজ পেল। বেতন মোটামুটি ১৫ হাজার। অতসী কাজে যোগ দিয়েছে এই চার মাস হলো। জীবনধারণের জন্য এই সামান্য বেতনেই তার যথেষ্ট।
বকুল গাছের নিচে বসে দাদার ছবি দেখে অতসী গোঙনী স্বরে কেঁদে উঠলো । চোখের জল অনবরত প্রবাহিত হচ্ছে।
আগামীকাল রাখি পূর্ণিমা। দাদার মৃত্যু হয়েছে। অতসী কাকেবা রাখি পরাবে। ছলছল চোখে সে মোবাইলের আলো অফ করে অন্ধকারেই বসে রইল। অতসীর মনে পড়ল, গত বছরগুলির কথা। দাদার হাতে সে রাখি পরাতো। এক বছর দাদা তাকে ঘড়ি উপহার দিয়েছিল। এক্সিডেন্টের একমাস আগে রাখি পূর্ণিমাতে দাদা তাকে এই অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি উপহার দিয়েছিল।
এই বকুল গাছের নিচে বসে দুই ভাই বোন কতই না খুনসুটি করেছে। এই গাছের নিচে বসেই দাদাকে সে রাখি পরাতো। এই বকুল গাছ সারাক্ষণই সাক্ষী হয়ে থেকেছে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত শেষ হয়ে গেছে তা অতসী জানতে পারিনি। চেতনা ফিরেছে পাখির কিচিরমিচির শব্দে । একটু পরেই অন্ধকার ফিকে হয়ে আলোর প্রকাশ ঘটবে।
অতসী এক দু’পা করে ধীরে ধীরে অবষন্ন শরীরে ঘরে প্রবেশ করল। আলো অফ করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো। ঘুমানোর চেষ্টা করল। ঘুম এলো না।
সকাল ন’ টায় অতসীকে রেস্টুরেন্টে যেতে হবে।
আজ রাখি পূর্ণিমা। অনেক জায়গায় খাবার ডেলিভারি করতে হবে। রাত্রিতে ঘুম না হওয়ায় শরীর বেজায় খারাপ। কি আর করা যায়। ছুটি নিলে চলবে না।
সকাল ১১ টায় অতসী বেরিয়ে পড়ল খাবার ডেলিভারির জন্য। বালিগঞ্জের কয়েকটি বাড়িতে সে খাবার ডেলিভারি করেছে। পরবর্তী ডেলিভারি ঢাকুরিয়ার রায় বাড়িতে।
কলিং বেল বাজানোর কিছুক্ষন পর এক ভদ্রমহিলা দরজা খুললো। অতসী ভদ্র মহিলাকে নমস্কার জানালো। তারপর বলল, ম্যাম আপনার অর্ডার ।
ভদ্রমহিলা খাবার হাতে নিল। তারপর অতসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল, আর কিছু বলবেন কি?
অতসী বলল, ম্যাম বাইরে প্রচন্ড গরম, জল তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল খাওয়াবেন?
ভদ্রমহিলা বিনয়ের সঙ্গে বলল, তুমি একটু দাঁড়াও আমি জল এনে দিচ্ছি।
অতসী দাঁড়িয়ে রইলো। ঘরের পরিবেশ শান্ত। জিনিসপত্র পরিপাটি করে সাজানো। অতসের চোখ গেল সোফার দিকে। সে দেখল, তারই বয়সী এক মেয়ে তার দাদাকে রাখি পরাচ্ছে। অতসীর চোখ ছল ছল করে উঠলো। ভাবতে থাকলো তার দাদা বেঁচে থাকলে হয়তো এভাবেই তার হাতে রাখি পরতো। অতসী একদৃষ্টে তাকিয়ে সোফায় বসে থাকা ভাই বোনের দিকে।
কখন না জানি ভদ্রমহিলা অতসীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে অতসীর সামনে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল কিন্তু, অতসী তখনও ভাই বোনের রাখি পরানোর আনন্দময় মুহূর্ত উপভোগ করছে। অতসীর চোখের কোনে জলবিন্দু।
ভদ্রমহিলা দ্বিতীয়বার কথা বলতেই অতসীর যেন হুশ ফিরল। অতসী চোখ মুছল, এবং ভদ্রমহিলার হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে জল পান করল।
ভদ্রমহলে কিছুটা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, এভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে কি দেখছিলে? তোমাকে কি কেউ রাখি পরায় নি ?
অতসী না জানালো। তারপর নিজের দুঃখের কাহিনী ভদ্রমহিলাকে সংক্ষেপে বলল। ততক্ষণে দূরে বসে থাকা ভাই- বোনও মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভদ্রমহিলা অতসীর মুখ থেকে করুন দুঃখের কাহিনী শুনে মায়ার উদয় হল। মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটলো । কথা না বাড়িয়ে অতসীর হাত ধরে একরকম টেনে নিয়ে সোফায় বসালো।
ভদ্রমহিলা অতসীকে বলল, তোমার ভাই এই পৃথিবীতে নেই তো কি হয়েছে, আরও একটি ভাই তো আছে।
ভদ্রমহিলার মেয়ে সঞ্জনা অতসীর পাশে এসে বসলো। একটি রাখি অতসীর হাতে দিয়ে বলল, আমার দাদার হাতেই তুমি রাখি পরাবে। এখন থেকে আমার দাদা তোমারও দাদা।
সঞ্জনার দাদা জয়দ্রথ অতসীর পাশে এসে বসলো। অতসী জয়দ্রথের হাতে রাখি পরালো অত্যন্ত সযত্নে। প্রণাম করলো, জয়দ্রথকে। ভদ্রমহিলাকে মা সম্বোধন করে প্রণাম করল অতসী। সঞ্জনাকে আলিঙ্গন করলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রায় ফ্যামিলির তিনজনকে নিজের আপন করে নিল।
সঞ্জনা অত্যন্ত খুশি হয় জয়দ্রথের দেওয়া উপহারের সুন্দর শাড়িটি অতসীর হাতে দিয়ে বলল, দাদা এবং আমার তরফ থেকে এই উপহারটির তোমার জন্য।
জয়দ্রথ বলল, বোন তোমার যখন যা কিছু প্রয়োজন আমাদেরকে জানিও। আমরা যথাসাধ্য তোমার জন্য চেষ্টা করব। জয়দ্রথের মা অতসীকে নিজের আপন মেয়ে মত বুকে টেনে নিল। নতুন পরিবারের সদস্য হল।
অতসীর চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে নতুন মা ,দাদা এবং বোনকে পেল। ঈশ্বর যেন তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। ঈশ্বর অতসীকে রাখী পূর্ণিমাতে এমন উপহারে জীবনকে যেন পূর্ণ করেছে।