গল্পে তপন মন্ডল

গড়াই নদীর পাড়ে
বৈকুণ্ঠপুরের সেন বাড়ির একমাত্র ছেলে বাবান ভারাক্রান্ত মনে মৃদু বাতাসে গড়াই নদীর পাড়ে ঢেউগুলোর উচ্ছলতার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ব্যস্ত। কিন্তু মাঝে মাঝে বলহরির আওয়াজ এই আলাপচারিতায় বাধা দিচ্ছে। একটু পরে সূর্য অস্ত যাবে। পশ্চিমের মেঘ সূর্যকে প্রায় অর্ধেক গ্রাস করেছে। পড়ন্ত সূর্যের কমলা আলো আশেপাশের পরিবেশকে কমলা বর্ণের করে তুলেছে। গড়াই নদী আপন বেগে বয়ে চলছে। গড়াই নদী খুব একটা চওড়া নয়। ওপারের নির্জন গাছগুলিতে পাখিদের মেলা বসেছে ।
তিয়াসার চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশের বিশাল গহবরে প্রবেশ করছে। বাবানের হৃদয়ও জ্বলছে। ভিতরটা প্রায় আধপোড়া হয়ে উঠেছে। বাবান জ্বলন্ত চিতা থেকে অনেকটা দূরে এসে বসেছে। চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। অবশ্য তা সবার অলক্ষে।
তিয়াসার বাড়ি থেকে বাবানের বাড়ি ঢিল ছোড়া দূরত্বে। মজুমদার বাড়ির ছোট মেয়ে তিয়াসা। দেখতে মিষ্টি। সকলের স্নেহের। একান্নবর্তী পরিবার। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হয়েছে তারা।
বাবানের পরিবারের প্রায় সকলেই চাকরি করে। তার কাকা, মুম্বাইতে কর্মরত। বাবানদের সঙ্গে তিয়াসার পরিবারের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। যেকোনো অনুষ্ঠানে দুই পরিবার একাত্ম হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিয়াসা বাবানের থেকে এক বছরের ছোট। দুজনেই একই স্কুলে পড়েছে । দুজনের বন্ধুত্ব সেই ছোট থেকেই । ছোটবেলা থেকে একে অপরের সুখ দুঃখের সাথী হয়েছে। দুজনের কেউই অসুস্থ হলে অপরজন কষ্ট পায়।
বাবান স্কুল ফাইনাল দিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। তিয়াসা তখন উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। সকল সময় বাবানের অভাবে নিজেকে একা মনে করতে থাকে। এভাবে এক বছর কেটে গেল। তিয়াসা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করল। কিন্তু রেজাল্ট তেমন ভালো হলো না।
তিয়াসা বাবানের কলেজেই ভর্তি হল। কলেজ থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক ঘন্টা। দুজনেই একসাথে কলেজে যায় । তারা দুজন বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে যৌবনে পড়েছে। তিয়াসার মনে বাবানকে নিয়ে ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বাবান প্রথম দিকে এ সমস্ত খেয়াল করেনি। কিছুদিন পরে সে তিয়াসার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করলো । বাবানও তিয়াসাকে খুব পছন্দ করে। ধীরে ধীরে তাদের গাঢ় বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হলো।
দুই পরিবারের কেউই তাদের প্রেমের ব্যাপারে জানতে পারিনি কোন সময়ই। তিয়াসার পরিবার বাবানের সঙ্গে মেয়েকে কলেজে পাঠাতে পেরে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। যা দেশ কাল পড়েছে। খবরের কাগজ খুললেই চারিদিকে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে।
দুজনের প্রেম আরও গাঢ় হল। কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারেনা। এইতো সেদিন তিয়াসা জ্বরের কারণে কলেজে যেতে পারেনি। বাবানের আর কলেজ যেতে মন চাইলো না। এই কদিন সে তিয়াসার বাড়িতেই যাতায়াত করেছে। তাদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা নানা রকম কুমন্তব্য করলেও দুই পরিবারের কেউই বাবান তিয়াসার সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেনি ।
কলেজে যাওয়ার পথে গড়াই নদী। মেনরোড থেকে নদীর দূরত্ব প্রায় ১০ মিনিট। তিয়াসা ও বাবান মাঝে মাঝে কলেজ ফাঁকি দিয়ে নদীর নির্জন পাড়ে সময় কাটায় । তিয়াসা আগের তুলনায় বেশি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মধুর স্বরে বাবানকে মাঝে মাঝে গান শোনায়। মুখ ভরে ভালোবাসার গল্প শোনায়। বাবানও তিয়াসার কথাগুলো একনিষ্ঠভাবে শিষ্যের মতো শোনে। মাঝে মাঝে তিয়াসার কোলে মাথা রেখে এক দৃষ্টে তিয়াসার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই সেদিন বাবান তিয়াসার চুলের খোপাতে ফাগুনের কৃষ্ণচূড়া ফুল গুজে দিল।
একদিন বাবান নদীর পাড়ে তিয়াসার কোলে মাথা রেখে প্রতিজ্ঞা করে, গড়াই নদীর মত একটি শান্ত নদী তাকে কেনে দেবে। যেখানে তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে। দুজনে অন্তরঙ্গ সময় কাটাবে। নদীর বুকে দুজনে নৌকাতে বসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকবে। দুজনে একাত্ম হয়ে পাখিদের গান শুনবে।
এভাবে দু’ বছর কেটে গেল। বাবান বিএ পাস করেছে। তিয়াসা তখন ফাইনাল ইয়ারে। তিয়াসার আর কলেজে যেতে ভালো লাগেনা। এখন সে প্রতিদিন কলেজে যায় না। পড়াশোনায় মন লাগে না । মাঝে মাঝে কলেজে যাওয়ার নাম করে গড়াই নদীর পাড়ে সেই চির পরিচিত স্থানে এসে বসে বাবানের সঙ্গে । গড়াই নদীর জল, গাছ, পাখি, সূর্য এখন কতই আপন তাদের কাছে।
বি এ ফাইনাল ইয়ার শেষ। তিয়াসার বিয়ে ঠিক হলো। ভালো পাত্র। কালেক্টর অফিসার। তিয়াসা আর ঘর থেকে তেমন একটা বেরোয় না।
বাবান কয়েকদিনের জন্য মুম্বাইয়ে কাকার কাছে গেছে। তিয়াশার বিয়ে ঠিক হয়েছে এ কথা সে জানেনা।
তিয়াসার বিয়ের একদিন আগে বাবান মোম্বাই থেকে ফিরে এসে শুনলো, সে সুইসাইড করেছে গত রাত্রিতে।
তিয়াসার বাড়িতে কান্না রোল পড়েছে। বাবান পাগলের মত ছুটে গেল তিয়াসার ঘরে। সে হতবাক। একদৃষ্টে তাকিয়ে তিয়াসার মুখের দিকে।
বিকেলের দিকে হাজার কষ্ট বুকে চেপে তিয়াসার দেহখানি কাঁধে নিয়ে গড়াই নদীর সেই পরিচিত স্থানে উপস্থিত বাবান। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীরা তিয়াসার নিথর দেহটি কাঠের চিতায় তুলে দিল।
সন্ধ্যা হল। তিয়াসা ভস্মিভূত। তখনও গড়ায় নদীর জল আপন বেগে বয়ে চলেছে। প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন সবাই চোখে জল নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বাবান স্মৃতির মহাসমুদ্রে পাড়ি দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে সন্ধ্যা প্যাঁচার ডাক শুনে চেতনা ফিরল।
আস্তে আস্তে তিয়াসার ভস্মিভূত চিতার পাশে গিয়ে হতসর্বস্ব হয়ে বসলো। নিঃশব্দে বুকে চাপড় মেরে অঝরে কাঁদতে থাকলো। তখনও কাঠে আগুন জ্বলছে। বাবান নদী থেকে জল এনে কাঠের আগুন নিভালো। ছাই ভস্ম নিয়ে এখন সে নিরবে বসে। মনে পড়লো সেই প্রতিজ্ঞার কথা। অশ্রু কন্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল, আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে দিলে না!