প্রবন্ধে তপন মন্ডল

প্রকৃতি প্রেম

আমরা কেউই প্রকৃতি রাজ্যের বাইরে নই। প্রকৃতির নিয়মে আমরা আবদ্ধ। প্রকৃতির ক্ষতিসাধন মানেই মানবকুলের ক্ষতি সাধন। প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আসল রসদ। প্রকৃতি প্রেমেই হলো ঈশ্বরপ্রেম। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ মানে নাস্তিকতা। মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়া। প্রকৃতি থেকেই সমস্ত জীবজগতের উৎপত্তি। প্রকৃতি পাঁচটি উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত। এই পাঁচটি উপাদানেই হলো পঞ্চভূত। পঞ্চভূত হলো ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ , ব্যোম । জগতের প্রত্যেকটি জীবদেহ এই পাঁচটি উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত। জীবদেহ থেকে কোন একটি উপাদানের অনুপস্থিতি মানেই জীবদেহের মৃত্যু।

আদিম মানুষ প্রাগৈতিহাসিক যুগে প্রকৃতির বুকে মাথা রেখে জীবন যাপন করত। কাঠ, মধু, মোম, ফল- ফুল প্রভৃতি অরণ্য সম্পদের উপর ভিত্তি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। যদিও তাদেরকে একাধিক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে একের পর এক জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়েছে মানব। আধুনিক কালের মত চিকিৎসা ছিল না। তবে ভেষজ প্রাকৃতিক উপাদানগুলি জীবনদায়ী হয়ে ওঠে। মানবের অগ্রগতির প্রত্যেকটি পদক্ষেপে প্রকৃতি সঙ্গ দিয়েছে। কোনো ক্ষেত্রেই প্রকৃতি মা নিরাশ করেনি। বুকে আগলে রেখেছে নিজের সন্তানকে।
বিবর্তনের হাত ধরে মানুষ আধুনিক হয়েছে। চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যাধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে কিন্তু প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অগ্রগতি ঘটানো সম্ভব হয়নি। প্রকৃতি ধ্বংস করার প্রয়াস নিয়েছে স্বার্থলোভী কুচক্রী ব্যবসায়ী সংগঠন কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষরা নিজেদেরকে সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আটকে না রেখে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী ও পরমাণুর যুদ্ধবিরোধী মিছিলে নিজেদেরকে একাত্ম করেছে।
সভ্যতার অগ্রগতি সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার উন্নতি ঘটেছে। বড় বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশের উপাদানগুলি দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধ ও পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। আধুনিক নগর জীবনের বিকাশ মানুষের উন্নতির পরিবর্তে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ যে প্রকৃতি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছে আজ আমরা সেই প্রকৃতিকেই ধ্বংস করছি। আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করছি। মানব সমাজকে ঘোরতর সংকটের দিকে পরিচালিত করছি। বিষয়টি নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। যদিও আন্তর্জাতিক স্তরে কয়েক দশক ধরে এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়েছে।
প্রকৃতির সম্পদ নিয়ে বর্তমানে দলাদলিও বাড়ছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলি পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করে সম্পদের কাড়াকাড়ি নিয়ে। নিজেদের স্বার্থ চারিতার্থ করার জন্য প্রথম সারির রাষ্ট্রগুলি প্রকৃতিকে সম্মানের পরিবর্তে ধ্বংসের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পিছুপা হয় না।

প্রাচীন মনীষীরা দূষণমুক্ত পরিবেশে আনন্দের সঙ্গে সমস্ত সৃষ্টিকেই উপভোগ করতেন অথচ আজ দূষণের ভারে মানুষ তার শ্বাসের উপর বিশ্বাস রাখতে পারে না। অশিক্ষিতদের কথা নাইবা ধরলাম, কিছু জ্ঞানী মানুষ দায়িত্ব জ্ঞানহীনভাবে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দূষণবলয়ের সঙ্গে নিজেদের বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। পৃথিবীর অবলা জীবের কাছে যা অভিশাপ স্বরূপ।
সামগ্রিকভাবে প্রকৃতি আমাদের কাছে সম্মান আশা করে। প্রকৃতির প্রতিটি জীবই অনুপম এবং মনুষ্যজাতির উপযোগী, এবং প্রতিটি স্বতন্ত্র জীবের রক্ষণ অপরিহার্য। পরিবেশকে সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত করা প্রতিটি মানুষের অবশ্য করণীয় কর্তব্য। যেহেতু পৃথিবী সসীম এবং পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ সসীম, তাই প্রতিটি মনুষ্যজন্মের পরিবেশ- ধ্বংসাত্মক স্বাধীন ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার বাসযোগ্যতা হারাবে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।