।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় তরুণকুমার সরখেল

এক যে আছে ভূত

জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি শ্বেত চন্দনের গাছ। সেই গাছ থেকে ভুর ভুর করে সুগন্ধ ছড়ায়। আর সেই সুগন্ধ গায়ে মেখে সবুজ ভূত দিব্যি মনের আনন্দে কাটিয়ে দেয় সকাল থেকে সন্ধ্যে। তারপর চাঁদ উঠলে সবুজ ভূত গান গাইতে বসে। জনবসতি থেকে বেশ কিছুটা দূরে গাছ-গাছালি ঘেরা জায়গাটা অতি মনোরম। এখানেই থাকে সবুজ ভূত। সবুজ ভূতের মনটা ভীষণ নরম। কাউকে অযথা ভয় দেখায় না। যে সব ছেলে মেয়েরা শীতের দিনে জঙ্গলে চড়িভাতি করতে আসে তাদের পর্যন্ত বুঝতে দেয় না যে এখানে একটা আস্ত সবুজে-ভূত রয়েছে। বরঞ্চ সবুজ ভূত বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের দেখে মনে মনে খুশি হয় আর বলে, “ যত খুশি গায়ে সবুজ মেখে চড়িভাতি করো। আমি বাপু চুপটি করে সুগন্ধী গাছের মগডালে বসে রইলুম।”
সেদিন নির্মেঘ আকাশে ঝকমকে চাঁদটা মাঠে ঘাটে আলো ছড়াচ্ছিল। সবুজ ভূত সুর করে গান গাইছে এমন সময় শুনতে পেল জঙ্গলের পথে দু-তিন জন লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে আসছে।
প্রথমজন বলল, “বুঝলি নিতাই জঙ্গলের চারদিকে এত ঘোড়ানিম আর আকাশমণির ভীড়ে এত দামী একখানা গাছ আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বুঝতেই পারিনি। ইস্কুলের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে পিকিনিকে এসে সেদিন গাড়ি রেখে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এমন সময় নাকে একটা সুগন্ধ এসে ঠেকল। সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে চন্দন গাছটার সন্ধান পেয়ে গেলাম।”
গয়ারাম বলল, “কিন্তু এই জঙ্গলটার বদনাম আছে বলে শুনেছি। গ্রামের লোকজন খুব একটা এখানে আসে না। তেঁনারা নাকি ঘোরাফেরা করেন।”
“আরে তাতে তো আমাদেরই সুবিধে। রাত-ভর করাত চালাও আর লরিতে মাল তুলে ভোর হতে না হতেই হাওয়া হয়ে যাও ”, নিতাই দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল।
সবুজ ভূতের গান আর মন বসল না। সে বুঝল লোকগুলো এসেছে শ্বেত-চন্দনের খোঁজে। টাকার লোভে এরা প্রকৃতির মহার্ঘ জিনিসগুলো লোপাট করে দিতে চায়। এই বদমাশ লোকগুলোর হাত থেকে বন্ধুকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে ? সবুজ ভূতের মনটা যে বেজায় নরম ! সে তো কাউকে ভয় দেখাতে পারবে না।
লোকগুলো গাড়ি থেকে করাত মেশিন নিয়ে এসে গাছ কাটার তোড়জোড় করছে এমন সময় উপর থেকে একটা কাঁচা বেল ধপাস করে তাদের পাশেই এসে পড়ল।
নিতাই বলল, “কাঁচা বেল গাছ থেকে মাটিতে পড়ে কেন ? গাছে কি হনুমান আছে ? ”
ভিকু নামের লোকটা পকেট থেকে টর্চ বের করে গাছের উপরটা দেখতে লাগল। ঠিক তখনই টর্চের উপর আচমকা এসে পড়ল এক ঝাড়ি কাঁচা আমড়া।
গয়ারাম তা দেখে বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম এই জঙ্গলে ভূ….. মানে তেঁনারা আছেন।”
এরপর সত্যি সত্যিই জঙ্গল জুড়ে ভূতুড়ে কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। সবুজ ভূতের বন্ধুরা কি বসে আছে ? সবুজকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে সকলেই। কাঁচা বেল, কাঁচা আমড়া এমনকি কাঁচা তেঁতুলও বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে লাগল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তল্পি-তল্পা গুটিয়ে গয়ারাম, নিতাই আর ভিকু লরিতে উঠে পড়ল। এ যাত্রায় তারা জোর বেঁচে গেছে।
সবুজ ভূত চন্দন গাছটার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, “বন্ধু ভয় নেই ! তোমার শত্রুরা সব পালিয়েছে। ”
সবুজ ভূতের বন্ধুরা বলল, “ভয় পেয়ে এবার ওরা চলে গেল। কিন্তু ওদের ঐ করাতের আঘাত থেকে গাছবন্ধুকে রক্ষা করা বোধহয় সম্ভব হবে না। একদিন ফের ওরা আসবে।”
সবুজ ভূত অনুভব করল তার চারপাশটা অতি চমৎকার ও পবিত্র চন্দনের গন্ধ বাতাস থেকে মুছে গেছে। এর অর্থ হল শ্বেত-চন্দন বন্ধুর বড্ড মন খারাপ হয়েছে। বন্ধু যখন কাঁদে তখন তার ডালপালা দিয়ে এভাবেই সুগন্ধ ছড়ানো বন্ধ হয়ে যায়। তা বুঝতে পেরে সবুজ ভূতের মনও ভারাক্রান্ত হল।
সবুজ ভূত চুপটি করে বসে ভাবতে লাগল, “একদিন এই জঙ্গল মুছে ইঁট-পাথরের খাঁচা তৈরি হলে কোথায় যাবে সবুজ ভূত আর তার বন্ধুরা ?”
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!