পাহাড়টা ডিঙোতেই প্যাঁকপ্যাঁক তার হলুদ দুটো ঠোঁটে কত কথাই না বলল। হাঁপাতে হাঁপাতে জানিয়ে গেল কাল সকালে নেবুতলায় পিকনিকের মিটিং আছে। ভুলুদাদা সবাইকে যেতে বলেছে,তোমরা সবাই এসো কিন্তু। আমার অনেক কাজ, আমি চললাম।
প্যাঁকপ্যাঁক খোঁড়াতে খোঁড়াতে চোখের নিমেষে লাউমাচার নিচ দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
একবার কয়েকটা দুষ্টু ছেলে গুলতি দিয়ে এমন জখম করেছিল যে বেচারা প্রায় ছয় মাস বিছানায় শুয়ে ছিল। তারপর থেকেই বেচারার একটা পা খোঁড়া হয়ে গেছে।
পুবপাড়ার পাশেই পিছলা পুকুর। তার ধার ঘেঁষে যাবার সময় মাছরাঙা একটা ধমক দিয়ে বলল- আজ কিন্তু পুকুরের জলে মুখ ডোবালেই সোজা কেস করে দেব। কাল চারটে কুঁচো চিংড়ি খেয়েছিলে মনে আছে?
তোমাদের অত্যাচারে আমি বাড়ি যেতে পারিনা, নগদে লিজ নিয়েছি তো! এই বলে আবার ঝিমুতে লাগলো মাছরাঙা্ ভাই।
প্রচন্ড শীত। চারদিক কুয়াশায় কিছুই দেখা যায় না তার ওপর আবার পুকুরের নজরদারী। প্যাঁকপ্যাঁক বলল- এ জন্যই তোমার চেহারাটা খুব খারাপ হয়েছে গো দাদা।
মাছরাঙা্ কথাটার কোন জবাব না দিয়েই আবার ঝিমুতে লাগলো। প্যাঁকপ্যাঁক বলল- কাল সকালে যেও কিন্তু।
প্যাঁকপ্যাঁক ঘুরে ঘুরে প্রায় সবাইকে খবরটা জানিয়ে দিল।
তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। প্যাঁকপ্যাঁক যেই না নিজের গা থেকে কম্বলটা সরিয়ে বেড় হতে যাবে অমনি মা কান মূলে দিয়ে ঠোঁটে এক জব্বর চাটি বসিয়ে দিল।
পড়াশোনা নেই, খালি টইটই করে ঘুরে বেড়ানো আর গোটা গ্রামের সবাইকে অতিষ্ট করে তোলা। শো….ও চুপ করে! আজ বাড়ির বাইরে পা রেখে দেখ! আর একটা পা খোঁড়া করে ছাড়বো।
এখন আকাশ পরিস্কার। চারদিকে আলো ফুটে উঠেছে।প্যাঁকপ্যাঁকের বাবা প্যাঁকিকে ডেকে বলল- হ্যাঁগো শুনছো! একছিলিম তামাক দাও না গো।
অমনি প্যাঁকি খেকিয়ে উঠলো জোড়। কিছু করার নেই, তামাক সাজিয়ে বকবক করতে করতে প্যাঁকার হাতে দিয়েই আবার চেঁচিয়ে উঠে বলল- ভাল চাও তো ছেলেকে শহরের কোন বোডিং এ রেখে আসো বলে দিলাম। তেনার গুরু আবার ঐ যে মুরগী চোর শেয়ালটা। মহা বজ্জাত।
প্যাঁকা হাতের হুঁকোটায় জোড় টান দিয়ে সূতো দিয়ে বাঁধা চশমাটাকে নাকের ডগায় রেখে ভাবসাব বুঝে নিয়ে বলল- হ্যাঁগো! পিকনিকের মিটিংয়ে যাবে তো গো। সারা পাড়া যে জেগে উঠেছে পিকনিকের জন্য।
আর যায় কোথায়। প্যাঁকি হাতের ঝাঁটাখানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল- ও তাই বলি, ছেলের মাথাটা তুমিই চিবিয়েছো দেখছি।হবে না হবে না, পিকনিক টিকনিক হবে না। টাকার শ্রাদ্ধ, তায় হুজ্জুতি, আবার বদনাম কুড়ানো। মিন্সের লজ্জাও হয়না।গতবারের কথাটা মনে নেই!!
ম্যাঁওয়ের মা বলেছিল না বেছে বেছে প্যাঁকপ্যাঁককে ডাসা কয়েকটা কেঁচো নাকি তুমি দিয়েছিলে, সেই নিয়ে কত কান্ড।
আ….বা….র পিকনিক!!
আমি নেই। বাড়িতে বসে দু পা ছড়িয়ে মাছের নাড়িভুড়ির ঝোল রেঁধে খাব। অনেক শান্তি।
– মা আমি কি যাব।
বলতেই তেড়ে এলো প্যাঁকি। না কোথাও যাওয়া হবে না।
প্যাঁকপ্যাঁক বাবার পিছনে গিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
এদিকে নেবুতলায় সবাই এসেছে, শুধু প্যাঁকা আর প্যাঁকপ্যাঁক এলেই আলোচনা শুরু হবে।
হেলতে দুলতে কচ্ছপকাকু প্যাঁকপ্যাঁকদের বাসায় এসে প্যাঁকাকে জানালো যে সভা শুরু হচ্ছে না তাদের জন্য।
প্যাঁকা আমতা আমতা করে বললো- হ্যাঁগো এবার তো যেতে হবে।
কচ্ছপ শুধু সায় দেয়াতে পিঠে খেল এক ডানার ঝাপটা।
তারপর প্যাঁকপ্যাঁককে বলল- আমি এসে কিন্তু অংক আর ইংরেজীটা ধরবো মনে থাকে যেন।রোজ রোজ পড়া না পারায় আর কাকগিন্নীর কথা শুনতে ভাল লাগেনা। বৈঠকখানার বারান্দা থেকে প্যাঁকপ্যাঁক আমতা আমতা করে বলল- না, মানে, আমি, মা।
চু….প! পড়তে বসো।
নেবুতলার মাঠে সে কি সভা। গ্রামের প্রায় সবাই এসেছে। কক কক, ওয়া বক, বন শালিক, সজারু,ময়না, পানিকাক, বন মুরগীর পাল, ময়ূর, কোকিল, কাক, তিতির,পায়রা, কোলাব্যাঙ, সোনাব্যাঙ সবাই।
সভাপতি হলেন কোকিল জ্যেঠু ভুলুদাদা সবার আগে শিয়ালকে লক্ষ্য করে বলল-শোন পন্ডিত এবার কিন্তু কোনরকম অন্যায় বরদাস্ত করা হবে না। গতবার ময়না পিসির জন্য বেঁচে গিয়েছিলে। রান্নার ধারে কাছেও যাবেনা তুমি। শিয়াল মাথা নেড়ে জানালো ঠিক ঠিক।
ঠিক হলো মেনু। পালক পনীর, মাছের পোলাও, মাছের কালিয়া, মাছের ঘন্ট, টমেটোর চচ্চরি, বনতেঁতুলের চাটনি, গাজরের হালুয়া, কেঁচো ভড়তা ইত্যাদি।
এবার খরগোস বলে বসলো গাজরের আইটেমটা বাদ দিলে হয় না!
ভুলুদাদা বলল- আরে বাবা সব গাজর কি লাগবে নাকি। মাঠে গাজর থাকবে কাকি।
খরগোস বলল- তাহলে ঠিক আছে।
ঠিক হলো পূবপাড়ার টিয়া পরিবারকে নেমতন্ন করা হবে।
সবাই সম্মতি জানালো।
পিকনিকের দিন যত এগোয়, উৎসাহ তত বাড়ে। প্যাঁকপ্যাঁক ঠিক করে রেখেছে যে সে সবাইকে লবন দেবে। গত পিকনিকে কাঠবেড়ালির ছানা ওর হাত থেকে লবনের বাটিটা কেড়ে নিয়েছিলো। সেই নিয়ে কাঠবেড়ালি আর হাঁস পরিবারে মধ্যে বহুদিন কথা বলাবলি ছিল না।
শামুকবাগানে যথারীতি পিকনিকের স্থান ঠিক হলো। সংক্রান্তির পরের দিন মাঠে মেরাপ বাঁধা হলো। গাট বাঁধা কলাপাতা এলো, চেয়ার টেবিল আরো কত কি।
কানাপুকুর থেকে রাতের অন্ধকারে মাছ তোলা হয়েছিল। সে কি বিশাল মাছ। ম্যাঁও ব্যবস্থা করেছিল মাছের।
বাঁশের দুদিকে ম্যাঁও আর ভুলুর ছেলে ইয়া বড়া দুই রুইমাছ ঝুলিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উনুনের পাশে ধপ করে ফেলল।পিছন পিছন আরো চারটে। সজারু মাসি বললেন- হ্যারে এতবড় মাছ, এগুলো কাটা হবে কি ভাবে। কেই বা কাটবে।
করই গাছের নিচে শুয়ে ষাঁড়দাদু জাবর কাটতে কাটতে ঝিমুচ্ছিলেন। এক ঝটকায় হুড়মুড় করে উঠে বলল- কেন! আমাকে পছন্দ হয় না বুঝি!!
ঠিক হলো আর ষাঁড়দাদু মাছ কাটতে চলে গেল ঝোপের ধারে।পিছন পিছন একগাদা ছেলেপুলে হৈ হৈ করে চলল।
শামুক বাগানের পাশেই খড়তলায় আর একটা পিকনিক করছিলো হায়না, ঈগল আর দুষ্টু শিয়ালের দল। ওদিক দিয়েই ফিরছিল পায়রা বৌ, কোকিল গিন্নী, ভুলু ছানা। হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনে ওরা ঘন জঙ্গলের ওপাশে উঁকি দিতেই কি সব্বনাশ। একটা হরিনশিশু একটা গাছের সাথে বাঁধা আছে। আর তার পাশের পরে আছে একপাল বনমুড়গী। হরিন শিশুটা খুব কাঁদছিল। উঁচু টিলাটায় বিশাল একটা চাকু ধার দিচ্ছিল হায়না যুবক।
দেখা মাত্র ওরা ছুটে এসে খবর দিতেই আর যায় কোথায়।সবাই রে রে করে তাড়া করলো হায়নাদের। ওরাও রুখে দাঁড়াল।
দু’দলের অনেক তক্কাতক্কি হলো। কিন্তু কিছুতেই কেউ কারো কথা শুনলো না। এমন সময় বৃদ্ধ কাকাতুয়া সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো নিজেদের মধ্যে কেন মারামারি করছে। এ গ্রামের সবাই কাকাতুয়াকে ভীষন মান্যিগন্যি করে। সবাই কাকাতুয়াকে পন্ডিত বলে মান্যি করে। কেউ আর কোন কথা না বলে পন্ডিতের কথা শুনতে লাগলো। পন্ডিত বললো এই জঙ্গলে আমরা সবাই একসাথে শান্তিতে থাকি। আমরা অন্যকে মেরে কখনোই মাংস খাই না। এটা অনেক আগে ছিল এখন আমরা একসাথে থাকি, সেখানে কোন হিংসা নয়। শান্তি চাই। তাইতো আমাদের পিকনিক মাংস ছাড়াই করছি। চল আমাদের কাছে প্রচুর মাছ আছে। একসাথে সবাই মিলে পিকনিক করি। যাও ওদের বাঁধন খুলে দাও।
এবার দুষ্টু হায়না পন্ডিতকে বলল- পন্ডিত মশাই এই কাজটা আপনি করুন ঠাকুর।
পন্ডিত প্যাঁকপ্যাঁককে বলল-যাও এ কাজটা তুমি করো।প্যাঁকপ্যাঁক ওর দলবল নিয়ে সবার দড়ি খুলে দিল। এখন সবাই মুক্ত। সবাই স্বাধীন। হৈ হৈ করে পিকনিক যখন শেষ হলো তখন সূর্য তার লাল আভায় পশ্চিমে ঢলে যেতে যেতে বলে গেল সবাই ভাল থেকো। মিলেমিশে থেকো।