সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে তনিমা হাজরা (পর্ব – ৬)

ছড়িয়ে জড়িয়ে

গ্রাম্যজীবনের প্রেমিক প্রেমিকার গানে রাধা কৃষ্ণের ছড়া। এই কৃষ্ণ কিন্তু একেবারেই লৌকিক। মহাভারতের কৃষ্ণের সাথে এঁকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এই কৃষ্ণ পাশের বাড়ির ছেলে আর রাধা পাশের বাড়ির মেয়ে। এর ভাব পরকীয়া। এইসব ছড়াগানে কখনো পরকীয়ার বিপদ কীর্তন, কখনো বা পরকীয়ার গুণকীর্তন। যে ছড়াকার বা গীতিকার যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভক্তিভাব পেরিয়ে এখানে কিছুটা মানবসত্ত্বার শরীরমাখা প্রেম পীরিতির টানাপোড়েনের গল্প, সাবধানতার সালিশি দেওয়া ঘরের মেয়েকে, গালি দেওয়া উঠতি বয়সের দুরন্ত ছেলেকে।।
ও কি ও কলঙ্কিনী রাধা,
কদম ডালে বসিয়া আছে কানু হারামজাদা,
মাঈ, তুই জলে না যাইও,
কানাইয়া পাতিছে ফান্দ,
রাধিকার লাগিয়া…..
আবার বিয়ের অনুষ্ঠানের গায়ে হলুদ, বধূর রূপসজ্জা এবং শুভদৃষ্টির এই গ্রামীণ গানটি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে তালবাদ্য ও নৃত্যসহকারে লোকশিল্পীদের কন্ঠে দেশে বিদেশে। কানাই আর রাই এখানে আর পরকীয়ার লুকাছুপি প্রেমিক প্রেমিকা নন, একেবারে পাঁচজনের সামনে অগ্নিসাক্ষী মেনে বিয়ে করে নিয়ে যাওয়া বধূ আর বর…
সোহাগ চাঁদ বদনে ধনি,
নাচতো দেখি, বালা নাচতো দেখি,
নাচেন ভালো সুন্দরী হে,
বাঁধেন ভালো চুল, হেলিয়া দুলিয়া পড়ে নাগকেশরের ফুল,
রুনুঝুনু নূপুর বাজে ঠুমুক ঠুমুক তালে,
নয়নে নয়ন মিলিয়া গেল, শরমের রঙ লাগে গালে।
যেমনি নাচেন নাগর কানাই, তেমনি নাচেন রাই,
একবার নাচিয়া ভুলাও তো চাইন্দ নাগর কানাই।।
আবার গ্রামের সুন্দরী মেয়েটির দিকে চোরাচোখ সব উঠতি বয়সী ছেমড়াদের। তার রূপে তারা মুগ্ধ। সেই রূপকথার বিবৃতি নিয়ে লিখে ফেলা মধুর কাব্যকলা প্রতিটি ছত্রে। কিন্তু কে লিখেছেন এমন একটি মোহিনী, চঞ্চলা মেয়ের অপরূপ রূপবর্ণন। জানা নেই তার নাম, অপূর্ব এই গীতিময় কাব্যটি কিন্তু অমর হয়ে হেঁটে আসছে অনেক অনেক কন্ঠ বেয়ে…..
ভাল কইরা বাজান গো দোতরা,
সুন্দরী কমলা নাচে,
সুন্দরী কমলা চরণে নূপুর রিনিঝিনি কইরা দোলে রে,
সুন্দরী কমলা পরণে শাড়ি আহা রইতে ঝলমল করে,
সুন্দরী কমলার নাকে নোলক টলমল কইরা দোলে রে,
এবাড়ি হইতে ও বাড়ি যায় রে,
ভাটা পানি ঝিলমিল করে রে,
আমার ভিজিল জামাজোড়া, কইন্যার ভিজিল শাড়ি রে…..
আবার একটি মেয়ে যে ভালবেসে দাগা খেয়েছে, তার অভিযোগ তার দয়িতের প্রতি, হুমকি কলসীদড়ি নিয়ে ডুবে মরার যদি সে তাকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে ঘরে না তোলে। না হলে সমাজ তো দুষবে মেয়েটিকেই। তাই প্রেম বদলে গেছে আক্রমনে। ফুঁসে উঠেছে তার আগুন ছন্দময় সুরের ছত্রেছত্রে। গানটি ঝুমুর অঙ্গের। …
ঝিঙ্গাফুলি সাঁঝেতে পেইয়্যে পথের মাঝেতে,
তু ক্যানে কাদা দিলি সাদা কাপড়ে,
ইখন হামার হব্যে কী,
গাঁয়ের লুক্যে কব্যে কী,
বিনি দোষে ফেললি ফাঁপরে,
মুখ মুছে তু ঘর যাবি ওরে সিয়ানা,
আমি কুথায় কাদা ধুব দেইখান দে না,
কলসী দড়ি গলায় বেঁধে,
মরব ডুবে কোন পোখুরে,
তু ক্যানে কাদা দিলি সাদা কাপড়ে…….
মাথার উপর ধম্ম আছে , ওরে সিয়ানা,
লুকিন কথা গেরামটরে কইয়্যে দে না,
তুকে লিয়্যে যাবো আমি, ঘুচে যাবে আমার শরম রে।।
আসলে সেই স্বীকৃতি, সেই সীলমোহরই চাইছে শেষমেষ সমাজ। যে কোনো প্রেম যতদিন বিবাহ দ্বারা অনুমোদিত নয় ততদিন তা কলঙ্কিত আর যেই তাতে আইনের সীলমোহর লেগে গেল, অমনি সব কালি ধুয়ে একেবারে ঝকঝকে সাদা।
অথচ লৌকিক এই ন্যায়-অন্যায়, স্বকীয়া-পরকীয়া, কাদা-সাদা সব মানুষের জন্য, ভগবান হিসেবে যখন প্রেমকে দেখেছি তখন কৃষ্ণের পাশে রাধারাণী পূজিতা, তিনি সাদা, তিনি আরাধিকা।
ভালবাসা আসলে তাহলে কী, শরীরের ক্ষিদে তো কয়েক পলেই মিটে যাবে, আঁচড়ে কামড়ে।। কিন্তু মনের ক্ষিধে, সেই উচাটন আকুলতা যার হাত ধরে সুন্দরের যুগে যুগে জয়যাত্রা তার কী হবে বলো দেখি???
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।