সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৪

মর্তকায়ার অন্তরালে

||২৪||

বউঠাকুরনের মৃত্যু রবীন্দ্রজীবনে যে এক বিরাট শূন্যতা তা রবীন্দ্র সাহিত্য বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিস্ফুটিত | তবুও এই মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল | “আমরা যে নিশ্চল সত্যের পাথরে গাঁথা দেওয়ালের মধ্যে চিরদিনের কয়েদি নহি, এই চিন্তায় আমি ভিতরে ভিতরে উল্লাস বোধ করিতে লাগিলাম | যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটাকে ক্ষতির দিক দিয়া যেমন বেদনা পাইলাম সেইক্ষণেই ইহাকে যুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ করিলাম |” ( জীবন স্মৃতি )

এরপর রবীন্দ্রজীবনে আবার একটি বড়ো আঘাত এলো ১৯০২ এ স্ত্রী মৃণালিনীর মৃত্যুতে | এর পূর্বে অবশ্য রবীন্দ্রনাথকে অনেকগুলি মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হয়েছিল | ১৮৯৪ এ বিহারীলাল চক্রবর্তী, ১৮৯৫ এ ভ্রাতুষ্পুত্রী অভিজ্ঞা চট্টোপাধ্যায়, ১৮৯৭ এ ভগ্নিপতি সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ১৮৯৯ এ ভ্রাতুষ্পুত্রী উষাবতী চট্টোপাধ্যায় | ঐ একই বছরে যক্ষায় মারা গেলেন ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯০১এ ভ্রাতুষ্পুত্র নীতীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

রবীন্দ্রনাথের কর্মযজ্ঞের পূর্ণ সমর্থনকারী ছিলেন মৃণালিনী দেবী | সংসার আর আশ্রম সামলে ১৯০২ এ অসুস্থ হয়ে পড়লেন মৃণালিনী | ১২ সেপ্টেম্বর কবিপত্নীকে আনা হলো কলকাতায় | প্রায় দুইমাস মৃণালিনী দেবীর আশেপাশে রইলেন স্বয়ং কবি | নিন্দুকেরা বলে থাকেন অন্য কথা | মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর জন্য স্বয়ং কবি অনেকাংশে দায়ী | রবীন্দ্রনাথের সেবা তাদের চোখে পড়ল না | লালবাড়িটিতে বসে মৃণালিনী দেবীকে রাতদিন পাখার বাতাস করে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ | হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা চলছে তখন | রথীন্দ্রনাথ মায়ের সঙ্গেই এসেছিলেন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় | শমীন্দ্রনাথ রয়ে গেলেন শান্তিনিকেতনেই | কারণ শমীন্দ্রনাথ তখন খুব ছোটো | একদিন রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীকে ঘুমোতে বললে, উত্তরে মৃণালিনী জানালেন, “শমীকে রেখে এলেন, আমি কি ঘুমোতে পারি তাকে ছেড়ে ! বোঝেন না সেটা |” কিন্তু সত্যিই মৃণালিনী ঘুমিয়ে পড়লেন ২৩ নভেম্বর রাত্রে | আর সারাটা রাত রবীন্দ্রনাথ ছাদে পায়চারি করে কাটালেন |

এবার এক চিঠির কথা উল্লেখ করব, যা রবীন্দ্রজীবনে এক বিরাট ট্রাজেডি | রথীন্দ্রনাথকে লেখা এই পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “বিয়ের রাতে মীরা যখন নাবার ঘরে ঢুকছিল তখন একটা গোখরো সাপ ফস করে ফনা ধরে উঠেছিল- আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি তখনই ওকে কাটত তাহলে ও পরিত্রাণ পেত |” একজন পিতার এ আক্ষেপ সাধারণের বোধগম্য নয় | রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন মীরার সঙ্গে নগেনের সম্পর্কটা ঠিক ভালোবাসার ছিল না | অথচ এ বিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছেন | পাত্র নগেন্দ্র তাঁরই পছন্দ | এজন্য রবীন্দ্রনাথ কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি | জীবিতকালে এ শোক তাঁর কাছে মৃত্যুশোকেরই সামিল ছিল |

“বিপদে মোরে রক্ষা করো/ এ নহে মোর প্রার্থনা,/ বিপদে আমি না যেন করি ভয় |” ( গীতাঞ্জলি ৪সংখ্যক গান ) রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের সাধনা | রেণুকা তখন গুরুতর অসুস্থ | অনেকের মতো কবিবন্ধু রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেণীও অসুখের খোঁজখবর নিতেন | রামেন্দ্রসুন্দর তখনও খবরটা পাননি | প্রতিদিনকার মতো সেদিনও বন্ধুর কাছে রেণুকার শারীরিক কুশলতার খবর নিতে এলে রবীন্দ্রনাথ সহজ কথায় স্বাভাবিক ভঙ্গীতে বললেন, “আজ সকালে সে মারা গিয়েছে |”

বারো বছরের অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে কবি যখন হাজারিবাগের পথে, তখন কবি মেয়ের শিয়রে বসে দুঃখের ভার লাঘব করার জন্য মেয়েকে শোনাচ্ছেন : “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা, / খুকি তোমার ভারি ছেলেমানুষ/ ও ভেবেছে তারা উঠেছে বুঝি/ আমরা যখন উড়িয়েছিলাম ফানুস|” ( শিশু কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞ কবিতা ) সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রেণুকা চলে গেলো | হয়তো রবীন্দ্রনাথ সেদিন গুণগুণ করে উঠেছিল : “তবে আমি যাই গো তবে যাই / ভোরের বেলা শূন্য কোলে ডাকবি যখন খোকা বলে / বলবো আমি, ‘নাই সে খোকা নাই’ / মা গো যাই |” ( ঐ, বিদায় কবিতা )

এরপর বাবা গেলেন ১৯০৫ | এর ঠিক দু’বছরের মাথায় ১৯০৭এ চলে গেল রবীন্দ্রনাথের খুব আদরের শমী | শমীর কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি | শমীর মৃত্যুর কথা অন্য আর একটি চিঠিতে পাই | দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথ মারা যাবার পর কবি মীরাকে যে চিঠিটি লিখেছিলেন সেখানে শমীর মৃত্যুতে তাঁর মানসিক স্থিতির কথা ধরা পড়েছে | “যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্ত্বার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও পিছনে না টানে |”

এরপর গেলেন ১৯০৮ এ রেণুকার স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য | ঐ একই বছরে ভ্রাতুষ্পুত্র হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর | নীপময়ী ঠাকুর সম্পর্কে বৌদি | মৃণালিনীর শিক্ষিকাও বটে | চলে গেলেন ১৯১০ এ | ১৯১৩ সালে ‘ভারতী’র সম্পাদক জানকীনাথ ঘোষাল গেলেন | সম্পর্কে কবির ভগ্নিপতি | ১৯১৫তে গেলেন দাদা বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯১৬ ও ১৯১৮ তে যথাক্রমে শান্তা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইরাবতী মুখোপাধ্যায় | প্রথম জন ভাগ্নের মেয়ে, দ্বিতীয়জন ভাগ্নি |

এরপর ১৯১৮তে কবি হারালেন তাঁর আদরের বেলিকে | বেলি হলো জ্যৈষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা | কবি যেদিন শুনলেন তাঁর আদরের মেয়েটির যক্ষ্মা হয়েছে , তখন পুত্র রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লিখলেন | লিখলেন : “জানি বেলার যাবার সময় হয়েছে | আমি গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতে পারি এমন শক্তি আমার নেই |”

রবীন্দ্রজীবনে এরপরে পরেই আরো মৃত্যু এসেছে | আগ্রহী পাঠকগণ সমীর সেনগুপ্তের ‘রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন’ এ চোখ রাখতে পারেন |

ক্রমশ ……

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!