উত্তরপ্রদেশের ফয়জাবাদে আমার মামার বাড়ি ছিল।আমাদের গরমের ছুটির প্রথম গন্তব্য।কখনো কখনো বা পুজোর ছুটির।বাড়িটা তিনতলা ছিল।একতলার পুরোটা জুড়ে মামা Arindam Banerjee র শোরুম ছিল।ব্যামবিনো ইলেকট্রনিকস।দোতলাতে দিদুনের ঘর আর বিশাল বড় রান্না খাওয়ার ঘর।আর ছিল রাস্তার ওপর ছোট্ট একফালি একটা ঘর।আমি গ্রিলে বসে রাস্তার লোকজন দেখতাম।কখনো কখনো ওই গ্রিলে দোলন Anindita Banerjeeকে বেঁধে রাখা হত শাস্তি স্বরূপ।ও কিন্তু ছোটবেলাতে বেশ ঠান্ডাই ছিল।শাস্তি কেন পেত কে জানে।বেঁধে রাখার পরও যে খুব একটা দু:খ পেত তা না।একটা পরোটা আর চিনির বাটি হাতে খুব খুশীমনেই বসে থাকত।তবে আমাদেরকে একটুও ভাগ দিত না এটা আমার খুব মনে আছে।
দিদুনের ঘরে একটা বাক্স টিভি ছিল।মনে আছে ১৯৯৬ এ লর্ডসের টেস্ট টা ওই টিভিতেই দেখেছিলাম।প্রথম পরিচয় আমার লাইফটাইম ক্রাশের সাথে।বালিশে ঠেসান দিয়ে হাঁ করে দেখেছিলাম মানুষটাকে।দিদুন দুর্ধর্ষ রান্না করত।ওই স্বাদ ভুলতে পারি না আজো।আর আমরা গেলেই মামা পারলে পুরো বাজার তুলে আনত আমাদের তিনজনের জন্য।সাথে গল্প আড্ডা আর সবথেকে মজার ব্যাপার মা Enakshi Ghoshalও ওখানে গিয়ে আমাকে বকতে ভুলে যেত।এক তো আমাকে বকলে দিদুন মা কে ছেড়ে কথা বলত না আর দুই মাও কেমন অন্য রকম হয়ে যেত কথায় কথায় হাসি,আবদার,ছোটাছুটি পুরো যেন নিজের কিশোরীবেলাতে ফিরে যেত।
তিনতলায় মামা মামির ঘরটার নির্জনতা আমাকে টানত সবথেকে বেশি,একা একা শুয়ে বই পড়ার জন্য,হাবিজাবি ভাবার জন্য,বাবার জন্য মন খারাপ করলে চুপি চুপি কাঁদার জন্য,ওই ঘরেই একবার খুঁজে পেয়েছিলাম মা কে লেখা বাবার Rathin Ghoshalএকগোছা চিঠি।কি ভাল লিখত বাবা।সত্যি বলছি আমাকে কেউ ওরকম চিঠি লিখলে আমি এক মুহূর্তও ভাবতাম না তাকে বিয়ে করার আগে।একা একা বসে আমি হোমওয়ারক করতাম আর রাজ্যের হাবিজাবি কথা জড়ো হত মনের কোনে।কানে আসত মা মামী দের হুল্লোড়ের আওয়াজ।রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত দিদুনের বানানো কোন স্পেশাল ডিশের সুঘ্রাণ। মামার বাড়ি মজাটা উপভোগ করতাম সবকটা ইন্দ্রিয় দিয়ে।
বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে।ফয়জাবাদ যাই না বছর কুড়ি।তবু যখনি শুনি ওখানকার নাম মাকে দেখি একঝলক।জানি মনে মনে মা এখনো ওখানকারই।বড় রাস্তার ওপর বাড়িটা।মহাবীরের চাট ফুচকার প্রাণকাড়া গন্ধ আর হোটেল অলকা রাজ থেকে ভেসে আসা হাল্কা হই হই।পড়ে আসা বিকেলের হাল্কা বিষণ্ণতা,আকাশভাঙ্গা বরষার পর সবাই চলে গেছে।বাস্তু ভিটেটা রয়ে গেছে।একা…..অপেক্ষায়।