|| মানচিত্র আর কাঁটাতার, হৃদয় মাঝে একাকার || বিশেষ সংখ্যায় তমাল চক্রবর্ত্তী

ভোলার লড়াই

দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতো ছোট্ট ভোলা। তার সাথে সব কিছুতেই সঙ্গ দিতো তার বন্ধু রাজু। দুজনেই হরিহর আত্মা। একসাথে গ্রামের পাঠশালাতে স্বাধীনতা দিবসে সব আয়োজন করতো ওরা। নেতাজি ক্ষুদিরামের জন্মদিন দারুণ উৎসাহ নিয়ে পালন করতো । দুজনেরই স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে দেশ রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মনে মনে ভাবতো দেশের স্বাধীনতা বাঁচানোর জন্য আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তাদের ডাকছে।
সময় অনেক পেরিয়ে গিয়েছে। স্বপ্ন কিছুটা পূরণ হয়েছে। রাজু আজ সেনাবাহিনীর অফিসার। ব্যাটেলিয়ানে ভালো পদমর্যাদায় আছে। তবে ভোলা সে সুযোগ পায়নি। সে তার সামান্য জমিতে ধান চাষ করে। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও রাজু তার বন্ধু ভোলা কে সময় পেলেই কথা বলে। মাঠের মাঝে চোখ বুজলেই ভোলা দেখতে পায় যেন তার সামনে নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনী ! তার মাঝে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজু ! গ্রামের সবাই রাজুকে নিয়ে গর্বিত হলেও ভোলার গর্ব সবসময়ই বেশি। মাস ছয়েক আগে যখন রাজু গ্রামে এসেছিল,ভোলার জন্য এনেছিল একটি স্মার্টফোন। ছুটিতে প্রায় প্রতিদিন রাজু ভোলার সাথে ধানজমিতে বসে হাতে ধরে ভোলাকে শিখিয়েছিল; কি করে এই ফোনে মেসেজ পাঠাতে হয়।
সেদিন ধানজমিতে একাই বসেছিল ভোলা। হাতে ধরা ফোনে জ্বলজ্বল করছে রাজুর মেসেজ
” ভোলা তোকেও যে দেশের জন্য লড়াই করতে হবে। দেশ রক্ষা করতে চাস তো সবাইকে চায়না দ্রব্য বর্জন করা। ” হঠাৎ গ্রামে শোরগোল শুনে ছুট্টে গেল ভোলা। তার বন্ধু ফিরেছে । তবে তেরঙ্গা মোড়া হয়ে। সবাই কাঁদলো। জয়ধ্বনি দিল। ভোলা চুপ করে বসে রইলো। সেইদিন থেকেই ভোলা কারো সাথে আর কথা বলে না । মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে কিসব কিনে আনে। সুতো , রঙিন কাগজ, জরীকরা কাপড় এইসব একটা ঝোলাতে ভরে সারাদিন তার ধানজমিতে বসে থাকে। বসে বসে এগুলি দিয়ে কি যে বানাতে থাকে ! খাওয়া দাওয়া নেই ! বিশ্রাম নেই ! যেন সামনেই যুদ্ধ ! তার প্রস্তুতি চলছে অনবরত।
আজ রাখি পূর্ণিমা। সকাল সকাল সাইকেল নিয়ে ভোলা বেরিয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। হাটে বাজারে, দোকানে ঘরে তার বানানো রাখী পৌঁছাতেই হবে। দেশ রক্ষার এই লড়াইয়ে তাকে বন্ধুর সাথ দিতেই হবে !
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।