গল্পবাজে তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য

আসা যাওয়ার মাঝে
আসিল সুজন মাতিল ভুবন রাঙিল আনন রে
আলোক পরশে জীবন হরষে সরস কানন রে।
কথা মত মিসড কল দিয়েছে সৌমাভ। তার মানে ওর প্লেনটা ল্যান্ড করেছে কলকাতায়। দারুণ খবর! কাল রাত থেকে উত্তেজনায় ঘুম হয়নি ঠিক করে।
সৌমাভ পৃথার আগের অফিসে কাজ করত। এখন ব্যাঙ্গালোরে থাকে। এ দুনিয়ায় ওর কেউ নেই একজন পিসীমা ছাড়া। বাড়ি গৌহাটি।
-‘ খবর দিয়েছে?’- দুপুরে একসাথে খাওয়ার সময়ে মৌসুমী জিজ্ঞাসা করল। হেসে মাথা নাড়ল পৃথা। মৌসুমী দন্তবিস্তার করে অর্থপূর্ণ হাসি হাসল। সেটা লক্ষ্য করে দাশগুপ্তদা বলল ‘ কি কোনো খবর নাকি?’ মৌসুমী আবার হেসে বলল ‘ হ্যাঁ, সে এসে পড়েছে।’
-‘ কে?’ জিজ্ঞাসা করল দাশগুপ্তদা। তারপরেই চোখ বড় করে বড় হাঁ করে বলল ‘ ও, তাই নাকি? সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ত। তা হলে ত কিছু একটা করতেই হচ্ছে।’
লজ্জায় আর মুখ সোজা রাখতে পারল না পৃথা। নিচে তাকিয়ে হেসে চলল।
সন্ধ্যাবেলা একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল পৃথা অফিস থেকে। ততক্ষণে অফিসের বাকি সবাই জেনে গেছে। শমিতাদি বলল ‘ যাও যাও নিশ্চই।’ তারপরেই পৃথাকে লজ্জা পেতে দেখে বলে দিল ‘ Ohh, just look at her cheeks.’
আর সেখানে দাঁড়ানো যায়? তাড়াতাড়ি লিফ্টের দিকে পা বাড়ালো পৃথা।
নিচে রাস্তায় সৌমাভ দাঁড়িয়ে ছিল। প্রায় এক বছর পরে দেখা। ‘ চিনতে অসুবিধা হয়নি ত?’ জিজ্ঞেস করল পৃথা। সৌমাভ কলকাতার এদিকটা আসেনি আগে।
শমিতাদির বেরোতে বেরোতে সাড়ে আটটা বাজল। বেরিয়ে দেখে পৃথা তখনও সৌমাভর সাথে অফিসের সামনে লম্বা রাস্তাটায় চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। দুজনের হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা। হাতছানি দিয়ে ডাকে ওদের, ‘ আলাপ করাবি না?’
হয়ে গেল আলাপ। শমিতাদি ঝালমুড়ি কিনল- ওদের দিল, নিজেও খেল। ‘ চলি রে, ছেলেকে হোমওয়ার্ক করাতে হবে।’ সেদিনের মত হাত নেড়ে চলে গেল শমিতাদি।
পরদিন অফিসে খাবার টেবিলে জমায়েত। ‘ কিছু বলল চলল?’ দাশগুপ্তদার জিজ্ঞাসা। ‘না’ হেসে জোরে মাথা নেড়ে বলল পৃথা।
‘সে কি! চার বছর হতে চলল না? এখনও বলেনি আর বলবে কবে?’ হেসে গড়িয়ে পড়ল পৃথা। মৌসুমী বলল ‘ তুই নিজে বল। বল তোমার মতই একজন চাই।’
-‘বলেছি’।
দাশগুপ্তদা বলল ‘ বলো তোমার মত একজনকেই চাই।’ পৃথা জোর দিয়ে বলল ‘ হ্যাঁ, তাই বলেছি।’
-‘ বলো গে হাঁদা বুঝতে পারছিস না? দিতে হবে নাকি কানের গোড়ায়?’
পৃথা হাসতে হাসতে ঢলে পড়ল মৌসুমীর গায়ে। আরেকটু হলে হয়ত পড়েই যেত। দাশগুপ্তদা বলল ‘ আমরা বলব? ফোন নাম্বার দেবে?’ পৃথা লাজুক লাজুক মুখে বলল ‘না’।
তখুনি পৃথার মোবাইলে ফোন এল। সকলে উৎসুক হয়ে তাকাল। পৃথার হাসি ধরে না, মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল আর ফোন তুলে কথা বলতে লাগল।দাশগুপ্তদা টেবিল বাজাতে শুরু করে দিল। বাকিরা উপভোগ করছে সেটা বেশ। পৃথা একটু তফাতে সরে গেল কথা বলতে।
-‘বুঝলি কাল রাতে গিয়েছিল আমাদের বাড়ি।’ বলল পরদিন পৃথা মৌসুমীকে।
-‘ কি হল?’
-‘ আর কি, এত কাণ্ডের পরে বাবার সামনে বেহাল হয়ে বলল যে সে এখনই বিয়ের কথা ভাবতে পারছে না। এর আগে বলত পারেনি একথা।’
মুখ ঘুরিয়ে নিল মৌসুমী। দুজনেই কাজে মন দিল। সন্ধ্যাবেলায় দাশগুপ্তদার জিজ্ঞাসা ‘ কি হল তোমার? কদ্দূর এগোল?’
-‘ আমি যে তিমিরে সেই তিমিরেই।’
-‘ফোন নাম্বারটা দাও কথা বলি।’
-‘ এখন ফ্লাইটে, ফোনে পাওয়া যাবে না।’
-‘ফিরে যাচ্ছে?’
-‘হ্যাঁ।’ পৃথার দৃষ্টি নিচে।
-‘ আবার কবে আসবে?’
-‘জানি না ত, বলেনি কিছুই।’
-‘দেবে আমাকে নম্বরটা? কাল কথা বলে দেখি।’
-‘থাক দাশগুপ্তদা, ছাড়ুন।’
-‘ তোমার ছাগল তুমি বোঝো- আগে কাটবে না পাছে কাটবে।’
হেসে ফেলল পৃথা। নীরস হাসি।