বিদ্যা সেদিন রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, না জানি ভাগ্য তাকে দিয়ে আরও কত কী করাবে। কত কিছু যে আরও দেখতে হবে, করতে হবে তাকে! সে তো সামান্য এক গ্রাম্য মেয়ে। পড়াশুনোও জানে না তেমন। মুরুগানের সামাজিক স্তরের কাছাকাছি পৌঁছনোর কথা ছিল না তার। কুলি লাইনেই কাজ করে কেটে যেত এ জীবন। এমনকি কুপিল্লার মতো একজন উচ্চবংশীয় শিক্ষিত ছেলেকেও স্বামী হিসেবে পাওয়ার কথা ছিল না ওর। অথচ কুপিল্লা, মুরুগান দুজনেই তার জীবনে এসেছে। একজন তো চলেই গেল। আরেকজনও না জানি আর কদিন…ভাবতেই বুক কেঁপে উঠল বিদ্যার। আসলে মুরুগানকে ওর এখন বুঝতে অসুবিধে হয় কিছুটা। যে লোকটাকে ও চিনত, জানত নিজের থেকেও বেশি, তাকে আজ এতবছর পরে কেমন যেন অচেনা ঠেকছে। মুরুগান কী চায়, সে কী ও নিজেই জানে? কিছুদিন আগে ওর পরিবারের ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করেছিল বিদ্যা। মুরুগানকে নিয়মিত চেক আপ করে যান তিনি। এমনিতে এই বয়সের তুলনায় মুরুগানের শরীর, স্বাস্থ্য ঠিকই আছে। কিন্তু মানসিক কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তার মনে। ডাক্তার একজন কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুরুগানের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনিও সপ্তাহান্তে আসতেন মুরুগানের কাছে। একটানা তিনচারমাস এসেছিলেন তিনি। ঘর বন্ধ করে তাদের কথাবার্তা চলত। তিনি চলে যাওয়ার পরে অবশ্য মুরুগানকে দুএকদিন খুব চনমনে দেখাত। কিন্তু তারপরেই যে কে সেই। আবার ঝিমিয়ে পড়ত মুরুগান। একসময়ে সবাই হাল ছেড়ে দিল। ডাক্তার বলছেন, এ নাকি মুরুগানের ইচ্ছাকৃত কৌশল। অথবা বয়সকালীন বিকার। কারুরই কিছু করার নেই এতে। অতএব যেমন চলছে চলতে দিন। একদিন হয়ত দেখবেন, মুরুগান আচমকাই আবার আগের মতো চনমনে হয়ে উঠবে।
সেই দিনের আশায় রয়েছে বিদ্যা। সেদিনই নাহয় মুরুগানের মুখোমুখি হবে ও। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে ওর। শারীরিক খাটাখাটুনি তো ওর অভ্যেস ছিলই, ইদানীং মানসিক টানাপড়েনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যা। এতবড় একটা পতনোন্মুখ ব্যবসাকে আবার দাঁড় করানো কী সোজা কাজ! অত্যাধিক ক্লান্তিতে ঘুমও আসছে না ওর। একটু কি কুলু খাবে আজ বিদ্যা? বাড়িতে পড়ে রয়েছে সেই কবে থেকে। নষ্ট হয়নি যদিও। কদিন আগেই নেড়েচেড়ে দেখেছিল বিদ্যা বোতলটাকে। খারাপ হয়ে গেলে ভেতরে বুজকুড়ি কাটত। বিছানা ছেড়ে নেমে এল বিদ্যা। একা একা এই অন্ধকার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ়া পচাই খাচ্ছে—এই দৃশ্যের সাক্ষী হতে কেউই থাকল না সেই রাতে। এমনকি চাঁদও অনুপস্থিত। মুরুগান নিজস্ব মেজাজে থাকলে হয়ত আজ ওদের আসর জমে যেত। অন্ধকারে ঘনকৃষ্ণকায়া বিদ্যার দুগাল বেয়ে জলের ধারা নামতে লাগল সবার অলক্ষ্যে। বিধাতা কি হাসলেন একটু? তাঁর কি দয়ামায়া থাকতে নেই? হয়ত তিনিই নিজের খেয়ালখুশি মতো বিদ্যার মতো কাউকে গড়ে তোলেন ছাঁচভাঙার আদলে। মুরুগানের মতোও গড়েন কাউকে কাউকে। তারপর নিজের সৃষ্টিছাড়া গঠনগুলো দেখে এমন করেই হাসেন!
বিদ্যা এটুকু বুঝেছিল, কাগজপত্রের হিসেবনিকেশ থেকে সে সাময়িক অবস্থানের একটা ধারণা পেতে পারে মাত্র। রাও তাকে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সাহায্য করছে। কিন্তু এই বাগানকে দাঁড় করাতে গেলে তাকে বাগান ঘুরে ঘুরে দেখভাল করতে হবে সারাক্ষণ। এ কাজটাই বরং তার নিজস্ব গঠনের সঙ্গে মানিয়ে যায়, স্বচ্ছন্দ বোধ করে সে। অফিসের ঘরের দমবন্ধ পরিবেশে সে মাথা খাটাতে পারে না। প্রথমেই বিদ্যা ঠিক করে নিল, বীনসের মান ঠিক রাখার জন্য তাকে দিনরাত বাগানে পড়ে থাকতে হবে। আর যে ভাবা, সেই কাজ! আরও একটা ঝুঁকি ও নিল এই বিষয়ে। রাও নিজেও বিদ্যাকে সমর্থন করল। কুগান তো বিদ্যার হ্যাঁ’তে হ্যাঁ মেলাতে পারলেই বেঁচে যায়। যদিও এই মন্দার বাজারে তাদের অনেক টাকা ধার নিতে হল খাতায় কলমে এর জন্য। নিজেদের বীনস বীজ হিসেবে ব্যবহার না করে, বিদ্যা উত্তম মানের বীনস আনিয়ে নিল বাজার থেকে। ও বুঝেছিল, ওদের বীনস থেকে উচ্চ ফলনের আশা করা বৃথা। মুরুগানকে এই সমস্ত খবর জানানোর দায়িত্ব নিয়েছিল কুগান। মুরুগান সবটা শুনত কিনা বোঝা যেত না। তবে কুগানের আজকাল মুরুগান আর বিদ্যার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব একদম সহ্য হত না। বিদ্যাকে এর জন্য দায়ী করতে পারেনি ও। কুগান এটুকু বুঝেছে, মুরুগানের মধ্যে কিছু একটা বদল ঘটেছে। যেন অন্য একটা মানুষ এসে মুরুগানের মধ্যে প্রবেশ করেছে। সেই মুরুগান কেমন যেন বদলে গেছে। তবে মুরুগানকে কিছু বোঝানোর ক্ষমতা ওর নেই। ফলে সে একতরফা ভাবে মুরুগানকে রোজকার কাজের রিপোর্ট করে চলে আসত।
দেখতে দেখতে বীনস বসানোর সময় এসে গেল। নতুন উদ্যমে প্রতিটি জমি নতুনভাবে দেখভাল করে বীনস পোঁতা হল ছোট ছোট আধারে। অফিসে এসে বিদ্যা টহল দিতে বেরিয়ে পড়ে সারাদিনের জন্য। মাঝখানে দুপুরে একঘন্টা ঠান্ডা ঘরে বসে একটু ঝিমিয়ে নেয় মাত্র। বাড়ি ফেরে যখন সন্ধে নেমে যায়। মুরুগান তখনও ঘরে বসে থাকে নয়ত সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। এক একদিন বিদ্যার খুব ইচ্ছে হয়, লোকটাকে আবার আগের মতো ধমকধামক দিয়ে আসে। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে বাড়ির তদারকিতে মন দেয় নিঃশব্দে। তারপর বেশ রাত করে ফিরে যায় নিজের ঘরে। মুরুগান এই সময়টায় যেন আরও নিশ্চুপ হয়ে থাকে। বিদ্যার আনাগোনা টের পায়, কথাবার্তা শোনে কান খাড়া করে। এমনকি প্রায় দিনই মুরুগান ভাবে, আজ বিদ্যাকে ডেকে কথা বলবে। ও খুব ভাল করেই জানে, বিদ্যাকে একবার ডাকলেই তাদের মধ্যেকার এই অভিমান দূর হয়ে যাবে। কিন্তু আরও কিছু অপ্রতিরোধ্য অভিমান ওর গলায় এসে বসে। বিদ্যা চলে যাওয়ার পর রোজ মুরুগান আফশোস করে। ভাবে, যাহ্! আরও একটা দিন কেটে গেল এইভাবে! আজও তো বলা হল না কিছু। দিনের পর দিন কাটতে থাকে এভাবে, বছর গড়িয়ে যায়। দুজনের মধ্যে ব্যবধান যেন আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।
ইদানীং কুগান একেবারেই হাল ছেড়ে দিয়েছে। ও বুঝেছে, মুরুগান ও বিদ্যার বনিবনা আর হবার নয়। বিদ্যা পরিশ্রমের ভারে অনেকটা শীর্ণ হয়ে পড়েছে। কাজের কথা ছাড়া তার মুখে অন্য কথা শোনাই যায় না আর। কুগানও যেন অনেকখানি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে এই এক বছরে। সেও প্রায় বোবার মতো দিন কাটায়। ঘর, বারান্দা আর সপ্তাহান্তে সেই এলাচপ্রিয়ার কাছে কিছুক্ষণ। দুটো জলজ্যান্ত তাজা প্রাণকে চোখের সামনে এমন মরা মানুষের মতো হয়ে যেতে দেখে কুগানও হতোদ্যম হয়ে পড়ে আরও বেশি করে। এমনিতেই সে ল্যাদখোর, বিদ্যার শাসনে, মুরুগানের ভয়ে সে অনেকটাই কর্মতৎপর হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে যাচ্ছে। প্রাণের অভাব বড় বেশি করে দেখা দিয়েছে এ অঞ্চলে। বীজ ফুটে কচি চারা বেড়িয়েছে, তাদেরও জমিতে পোঁতা হয়েছে নিয়ম মেনে। সবকিছু আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে, সুস্থ ও স্বাভাবিক। শুধু কান পেতে শুনলে প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া যাবে না, এই যা!