সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ২) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।
ইতিপুর্বের আলোচনা থেকে দেখা গেছে কলকাতায় কোম্পানির গির্জা নির্মাণের প্রচেষ্টা কিভাবে বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। তাই ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজ-উদ-দুল্লার সেনাবাহিনীর আক্রমণে যখন সেন্ট আনে’স চার্চ ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং চার্চের শেষ চ্যাপলিন রেভারেন্ট “Gerves Bellamy” বিতর্কিত ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডির শিকার হন তখন সঙ্গত কারণেই বহুদিন পর্যন্ত কোম্পানি স্থায়ী চার্চ নির্মাণের সাহস করেনি।
রেভারেন্ড উইলিয়াম জনসন ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট জন চ্যাপেলে চ্যাপলিন হিসাবে যোগ দেন। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোম্পানিকে একটি স্থায়ী চার্চ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। ততদিনে কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী তথা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোম্পানির নিজস্ব স্থায়ী চার্চ থাকা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই কারণেই তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এই প্রস্তাব বিশেষ আগ্রহের সাথে অনুমোদন করেন। বর্তমান কিরণশঙ্কর রায় রোড, কাউন্সিল হাউস স্ট্রীট এবং চার্চ লেনের সংযোগস্থলটি ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে কোম্পানির পুরাতন সমাধিক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় যেখানে জোব চার্নক, তাঁর স্ত্রী, কন্যাসহ বহু ব্যক্তিত্বের সমাধি অবস্থিত। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে South Park Street Cemetery তৈরি হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলটি নিছক ম্যাগাজিন ইয়ার্ড অর্থাৎ নিশানা অভ্যাসের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। হেস্টিংসের পরামর্শক্রমে আয়োজিত এক নিলামে শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে ১১ ই জানুয়ারি এই জমিটি ক্রয় করেন। ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দের ৩ রা এপ্রিল জমিটি কোম্পানিকে হস্তান্তর করা হয়। কলকাতার আদি ইতিহাসকারদের অন্যতম হেনরী কটন যদিও লেখেন ১০,০০০ সিক্কার বিনিময়ে নবকৃষ্ণ দেব এই জমি কোম্পানিকে হস্তান্তর করেন কিন্তু ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সে ফেব্রুয়ারি ধন্যবাদজ্ঞাপন করে হেস্টিংস যে চিঠি লেখেন তাতে আর্থিক বিনিময়ের কোন উল্লেখ মেলেনি। এমনকি চার্চে যে Marble Plaque এ নবকৃষ্ণ দেবের জমি দানের যে বিবরণ আছে তাতেও তাঁর অর্থপ্রাপ্তির কথা নেই। বরং তিনি যে কোম্পানিকে এ জমি উপহারস্বরূপ দেন এ কথা লেখা আছে। তাই কটনের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
কোম্পানী চার্চ নির্মাণের সম্পূর্ণ অর্থভার বহন করতে প্রস্তুত ছিল না। তাই জনগণের দান ও লটারীর মাধ্যমে অর্থের ব্যবস্থা করতে চার্চ কমিটি ফান্ড গঠিত হয়। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫,৯৫০ টাকা এবং ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের কলকাতায় সংগঠিত প্রথম লটারির মাধ্যমে আরো ৩০,০০০ টাকা ফান্ডে জমা হয়। কোম্পানির সেনাবাহিনীর স্থপতি লেফটেন্যান্ট James Aagg প্রথম চার্চটির নকশা প্রস্তুত করেন। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ই এপ্রিল হেস্টিংসের অনুপস্থিতিতে কোম্পানির এক প্রবীণ কাউন্সিল সদস্য Edward Wheeler চার্চের শিল্যান্যাস করেন। এরপর হেস্টিংস দেশে ফিরে যান এবং পরবর্তী গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিস আমলে তিন বছর ধরে চার্চের গঠনকার্য চলে। এই সময় বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রচুর পরিমাণে মার্বেল পাথর চার্চ নির্মাণের জন্য নিয়ে আসা হয়। লর্ড কর্নওয়ালিস লন্ডন থেকে ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রালের আর্চবিশপের স্বীকৃতি ও নিয়ে আসেন। অবশেষে ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ শে জুন ব্যাপ্টিস্ট St. John এর জন্মদিনে একক শিখর বিশিষ্ট St. John’s Church টি প্রতিষ্ঠিত হয় একটি সমারোহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাতে গভর্নর জেনারেল তাঁর কাউন্সিল মেম্বারগণ, প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক রা এবং শহরের গন্যমান্য ইংরেজ নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন।
St. John’s Church ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির একমাত্র অফিসিয়াল চার্চের সম্মানপ্রাপ্ত হয়। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বিশপ পদের সৃষ্টি হয় এবং ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে এই চার্চকে ক্যাথিড্রাল হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে St. Paul’s Cathedral স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত St. John’s Church ই ছিল মহানগরীর একমাত্র ক্যাথিড্রাল। অর্থাৎ যেখানে বিশপ অধিষ্ঠান করেন। ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে এর নাম হয় Old Cathedral। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হেনরী লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র ব্যাপটিজম সম্পন্ন হয় সেন্ট জন’স চার্চ-এ।
St. John’s Church কয়েকটি মূল্যবান এন্টিক শিল্পবস্তু র সংরক্ষণ স্থান হিসাবেও বিখ্যাত যার একটি হল জার্মান চিত্রশিল্পী Johan Zoffany -র অঙ্কিত The Last Supper. জোফানি ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ইংলণ্ড থেকে তাঁর বিতর্কিত চরিত্রের জন্য প্রাণভয়ে ভারতে চলে আসেন। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ই এপ্রিল তিনি এই চিত্রটি চার্চে দান করেন। যদিও এটি নিয়েও বিতর্ক কম হয় নি। কারণ তিনি ছবির চরিত্র গুলে এঁকেছিলেন কলকাতার সেসময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আদলে। এই চিত্রটি ছাড়াও একটি বৃহৎ অর্গ্যান চার্চের অন্যতম আকর্ষণ। শতাব্দী প্রাচীন এই বৃহৎ অর্গ্যানা আজো বিশেষ দিনগুলিতে প্রার্থনা সংগীত ধ্বনিত হয়। এছাড়া চার্চের পশ্চিম দেওয়ালে বেলজিয়াম কাঁচের জানালায় খ্রীষ্টের জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চিত্রিত হয়েছে। এছাড়া চার্চটির সর্বত্র স্মৃতিফলকগুলি হারিয়ে যাওয়া এক যুগের কাহিনী বলে।

চলবে…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!