‘কফি পাহাড়ের রাজা’ সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে তুষ্টি ভট্টাচার্য (পর্ব – ৩ ।। খন্ড – ১৫)

কফি পাহাড়ের রাজা

তৃতীয় পর্ব:

১৫)
মুরুগানের আবারও ভাল না-লাগা রোগ ফিরে আসছে একেক সময়ে। এই ফ্ল্যাট, দোকান, ছেলেদের স্কুলে হুল্লোড়, গৌতম-গৌতমী—সবাইকে খুব একঘেয়ে লাগছে ইদানীং। পাহাড় নেই, খোলা আকাশ নেই, জঙ্গল নেই…… আর মন টিকছে না এখানে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কাগজ পড়ে মুরুগান। আসলে পড়ে না। তন্নতন্ন করে খোঁজে…যদি কোরাগুর কোন খবর থাকে! দুএকটা টুকটাক খবর পায় বটে দেশের, কিন্তু তাতে মন ভরে না। বেশির ভাগই রাজনীতি বিষয়ক। প্রায়দিনই একটা বিস্বাদ জল গলা দিয়ে উঠে আসে ওর। আর ভাবে, নাহ! বয়স হয়েছে, এবার পানের মাত্রা একটু কমাতে হবে। আর হজম হচ্ছে না ঠিক মতো। খাওয়াদাওয়াও পান থেকে চুন খসলে আর সহ্য হয় না আজকাল। বাইরের খাবার খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। দিন কেটে যায় অলস ভাবে। বিকেলে তবু বাচ্চাগুলো একটু মাতিয়ে রাখে। আর সন্ধেয় গৌতমের সঙ্গ ওকে একটু আরাম দেয়। গৌতমীর ওপর যেটুকু আলগা টান দেখা দিয়েছিল ওর, সেও যেন ফিকে হয়ে আসছে। প্রাথমিক আকর্ষণ কেটে যাচ্ছে। বরং মুরুগান বোঝে, গৌতমী ওর জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। ওর চোখেমুখে উজ্জ্বল এক আলো দেখতে পায় মুরুগান। কিন্তু ও জানে না, কার ওপর সে আশ্রয় নিতে চাইছে! যে মুরুগান নিজেই ছন্নছাড়া, নিজেই নিজেকে বোঝে না ঠিকমতো, খেয়ালখুশিতে চলে, সে কিনা গৌতমীর আশ্রয় হয়ে উঠবে! মুরুগান ঢিলে দিয়েছে নিজেকে। গৌতমীর সব উৎসাহে জল ঢেলে দেয় নিমেষে। ও বোঝে, তাতে মেয়েটা আহত হয়। কিন্তু এছাড়া ওর আর কিছু করার নেই। কারুর মন ভেঙে দিতে সে চায় না। তার চেয়ে প্রথম থেকেই গৌতমী বুঝে যাক যে মুরুগান দূরত্ব চাইছে। এ বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল সে অনেকবার। কিন্তু বারবার এই ছেলেটার জন্য তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। গৌতমের অসহায় মুখের দিকে তাকালে মুরুগান আর স্থির থাকতে পারে না। এতদিনে, এই বয়সে সে যদি সম্পূর্ণরূপে কারুর কাছে আত্মসমর্পন করে থাকে, সে আর কেউ না—গৌতম!
  বিদ্যার আশঙ্কাই ফলে গেল। একে একে প্রতিটি পুরনো পার্টির কাছে রাও নিজে গিয়ে অনেক অনুনয় করেও তাদের রাজি করানো গেল না। এই বাগানের মাল আর ওরা নিতে চায় না। আবার রামলাল কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা চলল কিছুদিন। প্যাকেট খুলে মালের কোয়ালিটি চেক্‌ করা হল। তাতে কিছু ত্রুটি পাওয়া গেল আশ্চর্যজনক ভাবে। আর এই ব্যাপারে বিদ্যা আর রাও দুজনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। এ কী করে সম্ভব? এই মানের বীনস থেকে তাদের কফি তৈরি হয় না। এত নীচু মানের বীনস তাদের বাগানে কোনদিন ফলানো হয়নি। তাহলে? তাহলে কী করে এমন কান্ড ঘটল? সমস্ত ইউনিটে ঘুরে ঘুরে চেক্‌ করতে লাগল বাগানের এক্সপার্টরা। কিন্তু কোথাও এমন ছিদ্র পাওয়া গেল না যে, খারাপ মানের মিশেল সেই ছিদ্র দিয়ে মিশে যাবে। তাহলে? কী করে সম্ভব হল এটা? বিদ্যা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নিজের চেয়ারে। রাও উশখুশ করে বলল, ‘একমাত্র এটাই হতে পার!’ ‘কী?’ ‘যদি অন্য কেউ বাইরে থেকে আমাদের মালে মিশেল দেয়…’ ‘তার মানে প্যাকেট খুলবে কী করে তারা?’ বিদ্যার অজ্ঞতায় করুণ হাসল রাও। ‘সবই সম্ভব আম্মা। দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না!’ হয়ত এমনও হতে পারে, ওই রামলাল কোম্পানিই এমন কান্ডটা ঘটিয়েছে’। ‘কিন্তু এরকম করে লাভ কী তাদের? ওরা তো আগের পেমেন্ট ক্লিয়ার করে দিয়েছিল। অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে তো টাকাই দিত না পুরো’। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল রাও। ‘কেন করেছে ওরা এরকম, আমার জানা নেই আম্মা। নিশ্চই অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে এর পেছনে’।
  রাওয়ের কথা যে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে, আর তাও এত তাড়াতাড়ি বিদ্যা ভাবেনি। সত্যি বলতে কী, ওর আর ভাবনা চিন্তা করার ক্ষমতা নেই। দিন দুই বাদে রামলাল কোম্পানি থেকে লোকজন এলো বিদ্যার সঙ্গে দেখা করতে। লোকজন বলা ভুল, খোদ মালিকের ছেলেই চলে এসেছিল সেদিন। মিটিঙে বসল ওরা। প্রথমে অনেক ভণিতা করল। তারপর এ কথা, সেকথার পর ওদের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেল বিদ্যার কাছে। মালিকের ছেলে সোজাসুজি প্রস্তাব দিল। ‘আপনাদের বাগান এখন যেরকম ড্যামেজড্‌ কন্ডিশনে আছে, তাতে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো আপনাদের ক্ষমতা নেই। এমনকি সত্যি বলতে, এইরকম অবস্থায় কেউই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। যদি বাঁচতে চান, তাহলে আমি একটা প্রস্তাব দিই আপনাদের। জোর করব না। দিন সাতেক ভেবে দেখুন। এ বাগান আমাদের দিয়ে দিন। দাম নিয়ে ভাববেন না। মার্কেট রেটের থেকে বেশিই দেব আপনাদের’। এরপর আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওরা মিটিং শেষ করে দিতে চাইল। রাগে বিদ্যার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছিল। এত্ত বড় স্পর্ধা ওদের হয় কী করে? এই মতলব নিয়েই তাহলে এই বাগানে ঢুকেছিল ওরা! ছুঁচ হয়ে এসে ফাল হয়ে বেরনোর তালে ছিল ওরা। রাওয়ের দুচোখ ভরা মিনতিতে বিদ্যা ওদের তখনই মুখের ওপর কড়া জবাব দিল না বটে। কিন্তু রাগে, অপমানে দিশেহারা হয়ে সে বাহ্যজ্ঞান হারিয়েছিল সেদিন। কুগান বিদ্যাকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে গেছিল কোনরকমে।
  সবে মার্চ মাস পড়েছে। এখনই গরম গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে। চামড়া রোদের হল্কায় পুড়ে যাচ্ছে নিমেষে। এই সময়ের প্রকৃতি খুব রুক্ষ হয়ে পড়ে এখানে। শীত চলে যাওয়ার পরে প্রত্যকবারই এমনটা হয়। শুকনো পাতার স্তূপে জঙ্গল ভরে যায়। পত্রহীন শীর্ণ গাছগুলো যেন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। খাঁখাঁ করা জঙ্গলে পশুপাখিরা এদিক থেকে ওদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ায়। চারিদিকের জলাধারগুলো শুকিয়ে খটখটে হয়ে থাকে। আর খুব সহজেই এসময়ে বনে আগুন লেগে যায়। প্রত্যেকবার একই ঘটনা ঘটে কমবেশি। বনের আগুন নেভাতে জল স্প্রে করেও খুব একটা কাজ হয় না। একেকবার তো টানা সাত-দশদিন আগুন জ্বলতে থাকে। কুগান ভাবছিল, এবারে এখনও আগুন লাগেনি অবশ্য। তবে যা আবহাওয়া, আগুন লাগতে পারে যে কোনদিন। এ সময়টা ওরা, বাগানের কর্মী থেকে, গ্রামবাসী, পাহাড়ের আদিবাসী, সকলেই সতর্ক থাকে। কোথা দিয়ে যে আগুনের শিখা এসে ফালাফালা করে দিয়ে যাবে, কোন অঞ্চলকে বিরান করে রেখে দেবে, কেউ জানে না। এদিকে বাগানের এই অবস্থা, তারমধ্যে আজ আগুনের কথা মাথায় এলো কেন যে কুগানের! নিজের ওপরই রাগ হল ওর।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।