কবিতায় সুপ্রিয়া সু চক্রবর্তী

আমি ও মুখোমুখি দুপুর

এই দুপুর, শহরের এই দুপুর বসেছে আমাকে নিয়ে। আমি বসে আছি বিগতরাতের যত ভালোবাসাবাসি ঘেষে। দুপুর ভাঙছে, নৌকার দাঁড় খসে যাচ্ছে আকাশের স্বরে।
এই দুপুর ঠোঁটে আঙুল রেখে বসে আছে আমার মাথার ভিতরে। সেখানে সে সুদূর নিয়ে গড়িয়ে পড়ছে তার মিঠে হলুদ স্বভাবে।
সবুজ এখানে শৈশব। যেসব হারিয়েছে বিকেলের সন্ধিক্ষণে। এই দুপুরের আমি পরম আনন্দে ভেসে যাচ্ছি দূরে কোথাও, নির্জলা।
বিকট নীরবতা তুচ্ছ করে আসেপাশে কোনও বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে অথবা এই ভূমিকায় আমরা ঢেলে যাচ্ছি আমাদের হৃদিকথা। জীবন বা যৌবন।
বেড়ালটা সাবধানে পার হচ্ছে রাস্তা তাই বাকি সকল জীব অস্থির। শব্দ করছে না কিন্তু নির্বাক নয়। বেড়ালের ছায়া পাঁচিলের চেয়ে গভীর ষড়যন্ত্রী।
অন্ধতা ও হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার মধ্যে যে দেশ কাল ও মানচিত্রের সীমারেখা ফুটে ওঠে কপালের, সেই ঘামের বিন্দু বিন্দু শোক নিয়ে শ্বাসবায়ুর কিনারা ঘেষে  সুতোলি দড়ির পাক খেতে খেতে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি সায়াহ্ন যাবত।
এসময় প্রতিবেশীর কার্নিশে দুটি ঈষৎ ছাইরঙা পায়রা ওড়াউড়ি করছে। মুখোমুখি যাবতীয় রোদ মেখে নিচ্ছে ঠোঁটে ঠোঁটে। ওদের দুজনের মধ্যে নীলবর্ণ পাহাড় এসে বসলে ওরা সঙ্গম করছে।
এইসব দেখে ভাবি আমাদের মানসিক সঙ্গম কই, কই মানবিক সঙ্গম?
আমি যে ভালোবাসি একটি গাছকে, যার ভিতরে থাকে প্রাচীন এক স্বপ্নরঙের কিশোর।
রোজ বলে সম্পর্ক কোথায় তোদের পৃথিবীতে। ওখানে থরে থরে সাজানো নদীর গভীরে আছে অনেক মরুভূমি। যারা সুলক্ষণা, নিবিড়, সালঙ্কারা এবং প্রেতযোনি সম্বলিত। পুরুষের জিভ সেঁটে আছে দেওয়ালে মিছিলে গদের আঠায়।
তবুও, আমার প্রেমিক জানে একটি মেয়ে আলাদা গন্ধের নদী জড়িয়ে আসে রোজ রাতে। তার পায়ের কাছে বসে। মাথা দোলায়। ভুল বানানে নীলখামে মুঠো মুঠো ফুল ভরতে চেয়েও প্রলাপ এঁকে চারিদিকে রঙ ছড়িয়ে তার ঘরদোর তছনছ করে যায়। বিলীন হয় সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়া ভেঙে ভেঙে সমুদ্রের নাভির ভেতর।
মেয়েটির ওড়ানায় লেডিস সাইকেলের গান মুড়ে রাখা খেয়ালী মেখলা বেয়ে।
মেয়েটি হারিয়ে গেলে সে রাতে আমার হৃদয়ঘরের ঘুম ভেঙে যায়। আরও কত শব্দ আরও কত সুর চুরমার হয়ে যায় আমার
ছবির চার-দেওয়াল।
বস্তুত, আমাদের ভেতরের নির্মাণকার্যে কোনো শব্দ নেই কোনোকালেই। আমরা ভাঙতে এত বিরহী অথচ গড়ার সময় অভিসারে যেতে প্রস্তুত নই।
আমি বসে থাকি চিরকাল বিমর্ষ দুপুর মুঠো করে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।