সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে সম্বুদ্ধ সান্যাল (পর্ব – ১০)

রাইটার্স ব্লক এবং সপ্তেন্দ্রিয়

“অ্যাই শোনো, তোমার কাজ কাম নেই কিছু?”
সক্কাল সক্কাল এমন প্রশ্ন শুনলে কদিন ধরে কন্ঠ থেকে একটিই শব্দ উচ্চারণ হয়, ‘উঁ।’
“সকাল থেকে দেখছি চেয়ারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে। এর মধ্যে পাঁচ কাপ চা হয়ে গেল। এবার গতরটাকে একটু নাড়াও।”
এর পরেই উচ্চারণ হয়, ‘হুঁ।’
“কি হুঁ হুঁ করছ সেই থেকে, কথা কানে যাচ্ছে না?”
আনমনে কি শুনতে কি শুনলাম, বেরিয়ে এলো, “উঁহুঁ”।
অমনি ‘থপাস’ করে একটা জোরালো আওয়াজের পর সেটা পরিবর্তিত হয়ে চেয়ারের নিচে আওয়াজ করতে লাগলো, ‘ঠং… ঠং… ঠনঠন…’। তারপর ঠুন ঠুন ঠুন ঠুন করে মৃদু থেকে মৃদুতর হতে হতে মিলিয়ে গেল। রান্নাঘরের থেকে পেতলের একটা গ্লাস উড়ে এসে পড়েছে পিঠের উপর। আগে চমকে উঠলেও এখন সয়ে গেছে। গ্লাসটি তুলে রেখে ভাবতে লাগলাম অবস্থার কারণ নিয়ে।
আসলে কদিন ধরেই সকালে উঠলে গা’টা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করে। কোনওমতে গালভর্তি দাড়ি চুলকোতে চুলকোতে বাথরুম থেকে ফিরে জানলার ধারের এই চেয়ারে এসে বসি টেবিলে কাগজ আর হাতে কলম নিয়ে। আঙুলে কলম পাক খেয়ে যায়, আর কাগজ সাদা রয়ে যায়। সেদিন পাশের বাড়ির যোগাচার্য জ্যোতি আচার্য এসেছিলেন আমাদের বাড়ি। আমি সেই সময় জানলা দিয়ে একটা ঘাসফড়িং দেখছিলাম। ভাবছিলাম দুটি লাইন লিখি। কিন্তু মনের মধ্যে ঘাসফড়িং বাদে অন্য কোনও শব্দ আসছিল না। এরপর চোখ পড়ল বাগানের গাঁদাফুল গাছে। তাকে নিয়েও দুটি লাইন লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু দুটি শব্দতে এসে আটকে গেলাম, গাঁদা আর ফুল। তারপর চোখ পড়ল বসাক বাড়ির নারকেল গাছের মাথায়। সকালের রৌদ্র পড়ে মাথাটা হলুদ ঝক ঝক করছে, মনোরম দৃশ্য। এমনই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম যে ‘সকালের রোদ্দুর’এর বাইরে বেড়োতেই পারলাম না। পরে নন্দিতা যখন জানালো জ্যোতিবাবু নাকি প্রায় এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়েছিলেন আমার পেছনে, শুনে তো আমি থ। বুঝতেই পারিনি।
তিন চার দিন বাদে গেলাম আচার্য মশাইয়ের বাড়ি। কি না কি মনে করেন, বড়ই ভালোবাসেন আমাদের। বৌদির কাছে শুনলাম উনি গত তিন দিন ধরে কি এক চর্চায় নিবিষ্ট আছেন, আস্তে করে দরজা ঠেলে যেন ঘরে ঢুকি। দেখলাম উনি তাঁর টেবিলের উপর একটা সাদা পাতা নিয়ে হাতে কলম ধরে ঘুরিয়েই যাচ্ছেন, চোখদুটি বন্ধ। গলা খাঁকারি দিয়ে উপস্থিতি জানালাম। কোনও নড়াচড়া লক্ষ্য করলাম না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সবে ফিরতে চলেছি, সেই মুহূর্তে বোধ হয় উনি দেখলেন আমাকে। তড়িঘড়ি চেয়ার থেকে উঠে আমাকে ধরে নিয়ে আবার বসিয়ে বললেন, “আরে, সতুবাবু যে। তিন দিন ধরে আপনাকে খুঁজছি মশাই। তা কার দীক্ষা নিয়েছেন বলুন তো?”
দীক্ষা! অমন জিনিস এখনও ধারণ করা হয়নি। অবসর জীবনের পরিকল্পনা হিসেবে শিকেয় তোলা আছে। থতমত খেয়ে বললাম, “দীক্ষা! মানে? কই, না তো?”
“আরে মশাই, আমাকে লুকাবেন শেষে? জানি দীক্ষার কথা গোপন রাখাই ভালো। তবু যদি জানান, তবে আমিও ভাবছি আপনার গুরুর থেকে নিয়ে নেব। আহা, সেদিন তো দেখলাম কী নিবিষ্ট মনে চর্চা করছেন আপনি। দেখে প্রাণ ভরে গেল। এত গভীর ধ্যান মশাই আমিও করিনি কোনওদিন। সেই থেকে চেষ্টা করে চলেছি। জপযন্ত্রের মতো কলম ঘুরিয়ে চলেছেন আর সামনে জগদীশ্বরের মত সাদা পাতাখানি রাখা। তখনই ধরে নিয়েছি মর্মটা। ঠিকই তো, ঈশ্বর একেবারে ওই সাদা পাতার মতো। তিন দিন ধরে তাঁকে ভেবে চলেছি এই সাদা পাতায়। আপনি একবার আপনার গুরুর ঠিকানাটা দিন। হিমালয় টিমালয়ে থাকেন নাকি? এইবার মনে হচ্ছে ঈশ্বর খুঁজে পাবই। রাস্তা আপনিই দেখালেন।”
আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম তাঁর দীর্ঘ বাণী শুনে। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। গত মাসদুয়েক ধরে এমন রোজ হয়। মনে কথা নেই, কলমে লেখা নেই। এই সকাল থেকে বসে থেকে দেখছিলাম নন্দিতা সকালে গাছে জল দিয়েছে। পাতার থেকে ঝরে পড়ছে জলের ফোঁটা। সামান্য তিনটি শব্দ লিখেই ফেললাম। এরপর চোখে পড়ে গেল পাঁচিলের উপর বসে থাকা বেড়ালটাকে। জলের ফোঁটাকে দুত্তোর বলে কেটে দিয়ে পড়লাম বেড়াল নিয়ে। রোদও আর বেড়াল ছাড়া এগোলো না। ততক্ষণে নন্দিতার কাঁসার গ্লাসের প্রতি বিপ্লবী চেতনায় দিলাম তাও কেটে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে দেখতে পেলাম চারটি লাইন লিখে ফেলেছি। কিন্তু তার কিছুই বোঝা যায় না। পেন ঘষে ঘষে কাটা প্রতিটা লাইনই। এমন লাইন বেড়েই চলেছে।
বিপিন বাবু বলেছিলেন রাইটার্স ব্লকের কথা। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কোনও ব্লক নয়, এ হলো লেখকদের রোগ। যেমন মাতালদের মদ খাওয়ার ইচ্ছা না হওয়া, নন্দিতার আমাকে পিটানোর ইচ্ছা না হওয়া, ঘুষখোরের ঘুষ খেতে ইচ্ছে না হওয়া, এমনকি পেটুকের অরুচিও যেমন এক একটি রোগ, তেমনি। গতকাল গিয়ে ধরলাম বিপিনবাবুকে এই প্রসঙ্গে। জবাব দিলেন, “ও হয় মাঝে মাঝে।” মাঝে মাঝে কি, এ তো আকছারই হয় জনসাধারণের মধ্যে। পাড়ার ঢ্যাপকে যদি বলা হয় এক পাতা লিখতে, তবে কি সে পারবে? ঢ্যাপ থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত প্রধান অবধি পাড়ার কজনেরই বা ক্ষমতা হয় সাদা পাতায় কলম ফোটানোর? তা বলে সবার রাইটার্স ব্লক? আর আমার বেলায় ‘মাঝে মাঝে’?
ভাবতে ভাবতে দেখি হাতে ধরা কলমটা খাতা ভর্তি কী সব গোল গোল চিত্র এঁকে বসেছে বেখেয়ালে। ওটুকু বাদ দিয়ে বাকি পাতায় ভাবলাম কিছু লিখি। কিন্তু কলম এখনও সরে না। হঠাৎ মনে পড়ল এই রোগের মহৎ গুণও আছে কিছু। যেমন পাড়ার গোস্বামী বাড়ির গোকুল গোস্বামীর ছিল লেখার শখ। তা দিয়ে পেট চলে না। তবুও লিখতে লিখতে তিনি আপাতত তিন পুরুষের পুরনো দশ কাঠা জমির উপর দোতলা বাড়ি, ফিয়াট গাড়ি, গ্রামোফোন, শালকাঠের আলমারী থেকে শুরু করে কাঁসার থালা, স্টিলের প্লেট, অ্যালুমিনিয়ামের চামচ পর্যন্ত সব বেচে এখন ভাড়া বাড়ি নিয়ে থাকেন।
বাজারেও তার দেনার পরিমাণ নেহাৎ কম নয়। মুদির দোকানের রতন নিত্যিদিন গোকুলবাবুর কাছে ঘুরে ঘুরে থাকতে না পেরে একদিন পণ করে বসল আজ হয় হেস্ত নয় নেস্ত। প্রতিদিনই ব্যাঙ্কের থেকে টাকা না তুলতে পারার দোহাই না শুনে সটান ব্যাঙ্কেই নিয়ে যাবেন তাকে। ভাবামাত্র গিয়ে হাজির হয়ে একই উত্তর শুনল। কিন্তু যেমন সেদিন সে পণ করেই বেরিয়েছিল, তেমনই জোর জবরদস্তি পকেটে চেকবই সমেত গোকুলবাবুকে ধরে নিয়ে চলল ব্যাঙ্কে।
কিন্তু মুশকিলটা বাধল চেকবই লেখার সময়। গোকুলবাবুর কলম কিছুতেই সরে না সেখানে। তা যাই হোক করে ব্যাঙ্কের লোকেরাই লিখেটিখে দিল সবকিছু। কিন্তু সই তো গোকুলবাবুরই চাই। সইটুকুও করতে পারেন না তিনি। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার থেকে শুরু করে রতন অবধি তার হাতে পায়ে ধরে কেঁদে কঁকিয়ে গালাগাল করেও এর কোনও নিদান পেল না। সেই থেকে গত তিন বছর চেষ্টা করে দোকানদারেরা এখন গোকুলবাবুর মাসকাবারি বাজার বিনামূল্যে ঘরে পৌঁছে দেয়। লোকে বলে তার চেহারারও উন্নতি হয়েছে রাইটার্স ব্লক ধরার পর।
এই ঘটনা মনে করতে করতে পাতার বাকি অংশে আরও কিছু আঁচড় পড়েছে। সমস্তই হিজিবিজি চলছে, কিন্তু একটি শব্দও মনমতো চিন্তাশীল নয়। ভাবতে থাকি কি এমন রোগ ধরল আমার। গত দুই মাস কোনও পত্রিকায় নতুন লেখা পাঠাই না। শুনেছি গীতগোবিন্দ লেখার সময় এই রোগ নাকি কবি জয়দেবেরও ধরেছিল। তখন ঈশ্বর তাঁর হয়ে প্রক্সি দিতেন। কিন্তু এই মাস পপুলেশনের যুগে উপর থেকে আমার উপর তাঁর সেই নেকনজর পড়বে, এমন ভরসাও করি না। একবার এক স্বনামধন্য কবির দুরবস্থার কথা মনে পড়ল।
কবির তখন রাইটার্স ব্লক চলছে। লিখতে পারেন না কিছুতেই। ডাক্তার-বদ্যি-পথ্যি করেও কোনও সুরাহা হয় না। পাবলিশারেরা দিনের পর দিন তাঁর বাড়িতে এসে উৎসাহিত করে যান, মনোবিদে নিদান দেন ঘন ঘন প্র্যাক্টিসের। কবি তখন প্র্যাক্টিস করেই চলেছেন আর খানিক বাদে বাদে কাগজের দলা পাকিয়ে ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলছেন। প্রকাশকদের এই দেখে মাথায় হাত। এই সময় একদিন জমাদার পল্টু একটি চার চাকা নিয়ে কবির বাড়িতে এসে প্রণাম করল। পল্টুর চেকনাই দেখে কবি অবাক। ফিনফিনে পাঞ্জাবী, তাতে সোনার বোতাম, হাতে ক্লাসিক ঘড়ি, কোঁচা মেরে ধুতি। প্রণাম-টনাম সেরে পল্টু কবির হাতে একখানি বিশ হাজারি চেক ধরিয়ে দিলো। কারণ জিজ্ঞেস করায় জানতে পারল তাঁর কল্যাণেই পল্টুর অবস্থা ফিরেছে। যত কাগজ তিনি দলা পাকিয়ে ফেলে দিতেন, সব পল্টু সংগ্রহ করে তাঁর হস্তাক্ষর বলে প্রথমে ট্রেনে বিক্রী শুরু করে। সেখান থেকে এখন নিলাম ঘর অবধি তার ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। এই প্রসঙ্গে কবির সঙ্গে সে আজীবন চুক্তি করতে চায়। অ্যাডভান্সও এনেছে।
এদিকে আমার কাগজের পাতা হিজিবিজিতে ভরে চলে এসব ভাবতে ভাবতে। আমি কোনও ঈশ্বরের বরপুত্র নই, স্বনামধন্য কবি নই, যোগাচার্য, কেউকেটা কেউ নই। সাকুল্যে কিছু বাজারি পত্রিকায় লিখে উপরি সামান্য আয়ের ভরসা এই লেখালেখি। তাও গত দুমাস ধরে বন্ধ। নন্দিতাকে জানানো যাবে না এখনই, বাপের বাড়ি চলে যাবে সাংসারিক খরচ বাঁচাতে। এখন আবার সাপ্তাহিক হ্যারিকেন পত্রিকার সম্পাদক বিরজুবাবুর আসার কথা লেখা নেবার জন্য। তাকে কি বলে বিদায় করব ভাবছি, এমন সময় সশরীরে তার আগমন। লেখার প্রসঙ্গ ওঠার আগেই তিনি আমার হিজিবিজি কাটা পাতাটি তুলে নিলেন হাতে। বিস্ময়ে চেয়ে এর পর বলে উঠলেন, “আরে মশাই, করেছেন কি? আপনি এত ভালো ছবি আঁকেন তা তো জানতাম না। এমন রেখাচিত্রকর এই কলকাতায় কেন, গোটা ভারতে পাওয়া মুশকিল। দিন দিন মশাই আঁকাটি আমাকে।”
আমি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলাম কবির গল্পটি জানা ছিল বলে। দেখি জল কদ্দুর গড়ায়। বিরজু বাবুকে লেখার কথা জানালাম না, রাইটার্স ব্লকের কথাও নয়। দেখলাম লেখা নেওয়ার চেয়ে তার ছবির প্রতিই আগ্রহ বেশি। একমনে উপলব্ধি করে চলেছেন তার মর্ম। খানিক বাদে কিছু একথা সেকথা হওয়ার পর পাতাটি নিয়ে তিনি বিদায় নিলেন।
সেদিনের পর মাস খানেক কেটে গেছে আজ। আজও হিজিবিজি কাটছি পাতায়। নন্দিতা এসে এইমাত্র হার্শের চকোলেট সিরাপ দেওয়া এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেল। ভাবছি হাঁটা চলায় খুব অসুবিধা, একখানা চারচাকা কিনি। পাশেই আনন্দবাজারের যে পাতাটি খোলা আছে, তাতে জ্বল জ্বল করছে গতকাল একাডেমী অফ ফাইন আর্টস থেকে পাওয়া অ্যাওয়ার্ডের ছবি, মুখ্যমন্ত্রীর থেকে পুরস্কার নিচ্ছি। মনে পড়ছে এই সন্ধ্যার কথা, মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ, “সপ্তেন্দ্রিয় বাবুর এই শিল্পকীর্তি বাংলার বুকে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে, তার গর্ব বাঙালির গর্ব…”
কিন্তু একটাই সমস্যা। শুনেছি রাইটার্স ব্লক হঠাৎই কেটে যায়। ভাষণের সময় চেয়ারে বসে বসে ভাবছিলাম, লেখা ফিরে এলে খাবো কি?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।