ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২৪)

সুমনা ও জাদু পালক

সুমনা দেখে আর অবাক হয়। রাস্তার দুধারে সাজানো বাগানে কত রকমের ফুল আর পাতা বাহারের গাছ। কি বিচিত্র তাদের বর্ণ !
আর ফুল ই বা কত রকমের ।বেশিরভাগ ফুলের তো নামই জানে না সুমনা। সে ছোটবেলা থেকে সে দেখে এসেছে- গোলাপ, টগর, করবী, জবা, গন্ধরাজ, গাঁদা, হরগৌরী, সূর্যমুখী রজনীগন্ধা ইত্যাদি ফুল। মানে সাধারণ গাঁয়ে ঘরে যে ফুলগুলো থাকে আর কি। সেগুলোর মধ্যে এখানে কেবল গোলাপ, রজনীগন্ধা আর গন্ধরাজ কে দেখতে পেল সুমনা ।বাকি যে অসংখ্য ফুলের গাছে ফুটে আছে বিচিত্র বর্ণের ফুল ,সেগুলো চেনেই না সুমনা।
হবেই তো। রাজবাড়ির বাগান বলে কথা !ফুলগলো এত সুন্দর আর এতই জীবন্ত যে সুমনার খুব ইচ্ছে করছিল ,এক ছুটে বাগানের মধ্যে ঢুকে ফুলগুলোকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে। কিন্তু তার তো কোন উপায় নেই। অদৃশ্য কণ্ঠস্বর তো বলেই দিয়েছে, ওই ফুলগুলো ছুঁলেই সে ওগুলোর মত পাথর হয়ে যাবে ।

প্রশস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে সুমনা ।রাস্তাটা এদিক-ওদিক করতে করতে এক সময় থেমে যায় বিশাল বিশাল থামওয়ালা মস্ত উঁচু আর চওড়া এক বারান্দার সামনে ।বারান্দায় ওঠার জন্য পেল্লাই বড় বড় চওড়া চওড়া সিঁড়ি। আর সিঁড়ির দুপাশে সশস্ত্র সৈনিক অস্ত্র তাক করে আছে। দেখে মনে হচ্ছে কাছে গেলে বা একটু বেচাল দেখলেই অস্ত্রের আঘাতে ধরাশায়ী করবে সন্দেহভাজনকে। কিন্তু এখন তো ওরা সব পাথরের মূর্তি। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় ওঠে সুমনা। বারান্দার ছাত থেকে ঝুলছে বিশাল বিশাল ঝাড়লন্ঠন ।বারান্দার চওড়া চওড়া পিলারের গায়ে কি বিচিত্র কারুকার্য!
হাঁটতে হাঁটতে বারান্দার প্রায় শেষ মাথায় এসে পৌঁছায় সুমনা ।ডানদিকে একটা বিশাল ঘর ।সুমনা ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতরে। ও বাবা, কত লোকজন এখানে! ঘরের দু’ধারে সারি দিয়ে বসে আছে সবাই, সুদৃশ্য কাঠের আসনে।

ঘরের শেষ মাথায় অনেকটা উঁচুতে কারুকার্য করা চকচকে দুটো রুপোর সিংহাসনে পাশাপাশি বসে আছে মাথায় অপূর্ব মুকুট পরে এক বলিষ্ঠ পুরুষ ও এক সুন্দরী নারী। দুজনেই পৌঁছে গেছেন যৌবনের শেষ প্রান্তে। তবু তাদের চেহারায় আভিজাত্য ও নজরকাড়া সৌন্দর্যের মিশ্রণে বোঝা যায় যে ওনারাই রাজা ও রানী। রাজা ও রানীর আসনের দু’ধারে তীক্ষ্ণ বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রহরী।
সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে যেন রাজসভা চলছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ যেন কোন মন্ত্রবলে সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়েছে অদৃশ্য কোন শক্তি।
বাবার মুখে গল্প শুনেছে সুমনা রাজদরবারের ।এটা কি তাহলে রাজদরবার ?
এবার? এবারে কোথায় যাবে সুমনা?
অদৃশ্য কন্ঠে বলল, এই রাজদরবার পার হয়ে এবারে তোমাকে রাজপুরীর অভ্যন্তরে যেতে হবে।
সুমনা বলল, কিভাবে যাব আমি?
অদৃশ্য কন্ঠে বলল ,রাজ সিংহাসনের বাঁদিকে একটা বিশাল ময়ূর দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাচ্ছ?
——হ্যাঁ ,দেখছি তো।
—– ওটার সামনে গিয়ে তিনবার জোরে হাততালি দাও।
—– কি হবে তাহলে?
— ওই ময়ূর সরে গিয়ে তোমাকে রাজ অন্তঃপুরে যাওয়ার পথ করে দেবে। সেই পথ দিয়ে এগিয়ে যাবে সামনে। ঘরের পরে ঘর আছে ওখানে ।ঘরগুলো যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই আছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি।তুমি উঠে যাবে দোতালায়। তবে আবারো সাবধান করে দিচ্ছি সুমনা ,আমি না বলা পর্যন্ত কোন কিছুতে হাত দেবেনা ভুল করেও।
হাত দিলেই তুমি ওদের মত পাথর হয়ে যাবে! সুমনা বলল, আচ্ছা ,দেবনা হাত। আমার মনে আছে ।
সুমনা এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো রাজ সিংহাসনের বাঁদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত বড় ময়ূরটার সামনে ।কি সুন্দর আর কত বড় ময়ূর !এখনই যেন পেখম তুলে নেচে উঠবে । সত্যিই ওকে দেখলেই তো গলা জড়িয়ে আদর করতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু না, সুমনা আর দেরি করে না।
সে পরপর তিনবার হাততালি দেয়।
আর কী আশ্চর্য, সঙ্গে সঙ্গে ময়ূর সরে গেল ডানদিকে। সামনে একটা মাঝারি দরজা ।সেই দরজা পেরিয়ে সুমন এসে দাঁড়ালো একটা ঘরে। এখানে অনেক লোকজন। সবাই মহিলা। সবাই ব্যস্ত কাজে। সবাই কিছু না কিছু করতে করতে হঠাৎ যেন দাঁড়িয়ে গেছে কোন আদেশের প্রতীক্ষায়। ঘরের পর ঘর পার হয়ে চলে সুমনা। সব ঘরের একই অবস্থা। কোথাও জ্যান্ত মানুষ নেই ,কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। সবাই পাথরের মূর্তি ।
হাঁটতে হাঁটতে সুমনা এসে দাঁড়াল দোতালায় ওঠার সিঁড়ির সামনে । একের পর এক সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠে সুমনা ।
আবারো মস্ত বারান্দা ।বারান্দার দুপাশে অনেক ঘর ।সব ঘরের দরজা বন্ধ ।শুধু শেষ মাথায় সুমনা দেখতে পাচ্ছে, দরজা খোলা একটা ঘর। সুমনা ঘরে ঢুকে দেখে ,খুব সুন্দর করে সাজানো ঘরটা। ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় সোনালী রঙের একটা বিশাল পালঙ্ক ।আর সেই পালঙ্কে শুয়ে আছে খুব সুন্দর একটি ছেলে। ওর পরনের পোশাক দেখে মনে হয় ও রাজপুত্র। সুমনা ভালো করে তাকিয়ে কিছু খোঁজে। কই ওর মাথার কাছে রুপার কাঠি আর পায়ের কাছে সোনার কাঠি তো নেই ।
হঠাৎ সুমনার চোখ যায় রাজপুত্রের মাথার কাছে দেওয়ালে টাঙানো দুটো ছবির দিকে। একটা ছবি তো এই রাজপুত্রের ,চেনা যাচ্ছে।আরেকটা কে?
সুমনা ফটোটার কাছে এগিয়ে যায় । আরে পাশের ফটোর মেয়েটা তো অবিকল তার মত দেখতে ।কিন্তু তা কি করে হয়? তার ছবি এখানে কি করে আসবে? কি পরিচয় ওই মেয়েটির?

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।