।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় শাম্মী শাহরিয়ার

অংশত মেঘলা

মাঝ রাস্তায় পড়ে হাওয়ায় চটির নীল ফিতে ছিঁড়ে যায় সোহাগীর। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির সাথে প্রচণ্ড হাওয়ায় গতিপথ ঠিক থাকে না কারোরই। আরও যেন ঘনকালো মেঘ ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলছে ঢাকার আকাশ, পথ-ঘাট বাড়িয়ে তুলছে গন্তব্যে ছুটে চলার অদম্য ইচ্ছে। তালে তাল মিলিয়ে যেই না ছোটা অমনি এ হাল। পলিব্যাগের মুখের গিটটা খুলে ঠুসে দেয় ফিতা ছেঁড়া ও ভালো থাকা হওয়ায় চটি জোড়া। এবার যেন ভারমুক্ত। ছুটতে আর নেই বাঁধা। তবুও হাওয়া যেন উড়িয়ে নিতে চায় তার নিজের ঠিকনায়। সোহাগীর ফুলতোলা বেগুনি শাড়ির পেছনে ঝুলে থাকা আঁচলের আড়ালে সামনের অংশকে ঢাকার বৃথা চেষ্টায় ব্যস্ত। হাওয়ার মর্জি হলে আঁচলের আড়ালেই লুকায় সর্বস্ব আর না হলে উড়িয়ে নেয় লজ্জা বসন।
‘মরার বৃষ্টি, আসার সময় টময় নাই!’ বলতে বলতে ঢুকে পড়ে নাসিরের চায়ের টঙে।
এক সময় নাসির গো-বেচারা প্রেমিক পুরুষ ছিল। সোহাগীকে ভালো লাগত তার বরাবরই। সেই ভালো লাগাটা নাসিরের শরীরে না মনে তা ঠিক জানে না নাসির। শুধু জানে, সোহাগী তার কলিজার টুকরা, ভালোবাসার ধন, একটু বাড়তি পাওয়া। সোহাগী কেমন একটা ছন্দ আনে তার শরীরে, একটা শরশিরে ভাব অনবরত তাকে দোলা দিতে থাকে, সোঁদা গন্ধে বিমোহিত করে রাখে নাসিরের মনপ্রাণ। হয়তো ঘোর নয়তো নেশা।
‘আদা লেবু মিশায়ে একটা চা দিব, খাবা সোহাগী?’ বাঁকা হাসির রেখা ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে জানতে চায় নাসির। আধাভেজা, নগ্ন পায়ে নাসিরের পেছনে পাতা লম্বা বেঞ্চে বসা সোহাগী যেন কিছুই শুনছে না। শাড়ির রঙ চুয়ে চুয়ে দৃশ্যত পা দুটোকে করে তুলেছে বেগুনি রাঙা। সোহাগী তখনও নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, দুহাতে নিংড়ে চলে শাড়ির যত বেগুনি জল।
নাসিরের কণ্ঠে বেজে ওঠে গান। চায়ের কাপে চামচ নাড়ার মৃদু শব্দ বৃষ্টিকে ছাপিয়ে এক অনাবিল ছন্দ আনে মনে। গলে যাওয়া চিনিকে আরও নেড়ে নেড়ে গলানোর আনন্দে মাতে নাসির। টঙের সামনে ছাতা হাতে দুটো খদ্দের তখনও। তাদের চা খাওয়া শেষ অনেকক্ষণ তবুও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলে রাজ্যের গল্প। অন্য সময় হলে নাসির সেসব গল্প শুনত, হয়তোবা অংশগ্রহণও করত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওরা গেলেই যেন বাঁচে। সোহাগীর দেহের সোঁদা গন্ধ আবার পায় সে। প্রাণ ভরে শ্বাস টানে। এক ভালো লাগা আচ্ছন্ন করতে থাকে ধীরে ধীরে।
সোহাগী জানে আর যাই হোক নাসির তাকে ফেরাবে না কোনোদিনই। এটাও ঠিক, তিন সন্তানের বাবা নাসির তাকে দেবে না সংসার বা কোনো পরিচয়। হয়তো দিতে পারবে না। তবুও ভালোবাসারা মিথ্যে নয়। তাই সে স্বপ্ন দেখে না, খুব কাছে আসে না, যদি ফুরিয়ে যায়, যদি শেষ হয়ে যায় তার গন্ধ! তখন কী নিয়ে বাঁচবে, কী আশায় লড়বে! এটুকুই তার একান্ত সম্পদ। সোগাহী তা বাঁচিয়ে রাখে খুব গোপনে। আদা লেবু মেশানো লাল চা খেতে খেতে ফর্দ আটে। প্রথমে মুনিরা তারপর সীমা আপা, তারপর না হয় নাদিরা খালা। আর কেউ থাকতে না দিলে নাসিরের এই টঙ তো আছেই। একটা রাতেরই তো ব্যাপার। ছেলেটার জন্য প্রতি মাসে কিছু টাকা দেয় নাসির, সেটাই নিতে আসা। যে বৃষ্টি! আজ আর যাওয়ার উপায় নেই। কাল ফিরে যাবে, তাই আর থাকার চিন্তা না করলেও চলে। কিন্তু সোহাগী জানে, এই রাতে থেকে যাওয়া তার কলঙ্কের ঘনত্ব বাড়াবে আরও কিছু গুণ।
নাসির বিরক্ত মুখে সেই সন্ধ্যা থেকে চামচের টুংটাং শব্দটা চলমান রেখেছে। কেন যেন আজই উপচে পড়ছে তার টঙের বাইরে খোদ্দেরের দল। অবশ্য নাসির তার মর্জির মালিক। ইচ্ছে হলেই ঝাঁপ বন্ধ করে চলে যেতে পারে যেকোনো সময়। কিন্তু আজ তো যাওয়া যাবে না, আজ যে সোঁদা গন্ধে মোহিত নাসির!
‘চা কি মেয়েছাওয়াল বানাতে ভুলে গেলো? দলে দলে টঙেই ভিড়!’ আড়চোখে সোহাগীর দিকে তাকায় আর এমনই বাক্য ছুঁড়ে দিতে থাকে। উত্তরের আশাবিহীন প্রশ্নরা সব, শুধুই বলে চলা। তখনও ঝরে চলেছে সোহাগীর শাড়ি থেকে বেগুনি তরল। নতুন ঘিয়ে রঙা অন্তর্বাসটাও ব্লাউজের বেগুনি রঙ ধারণ করেছে ততক্ষণে। দু হাতের মুঠোয় আঁচল নিংড়ে দেয়, ছড়িয়ে দেয় খোঁপায় আটকানো চুল। সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবই দেখে নাসির, সবকিছুতেই কেমন ভালো লাগা তৈরি করে, নাকমুখ ডুবিয়ে সবটা ঘ্রাণ শুষে নেয়ার এক অদম্য ইচ্ছায় ইন্দ্রিয় সব সচল হতে থাকে। আবারও নাসির গুনগুন করে গান ধরে সেইসঙ্গে চালাতে থাকে তার চায়ের কাপের টুংটাং শব্দরাশি।
ঘড়িতে দশটা কিন্তু বৃষ্টির দেমাগ কমেনি এতটুকুও, শুধু কমে এসেছে খদ্দের।
‘চলো সোহাগী, মিজান একটা খাওনের হোটেল দিসে। তোমাক গোস্তো দিয়া ভাত খাওয়াই নিয়া আসি।’
ভাতের কথা শোনার সঙ্গেসঙ্গেই খিদেটা যেন চনমনিয়ে ওঠে সোহাগীর। সেই কখন গ্রামের বাসে উঠেছে ঢাকায় আসবে বলে আর এসেই পড়তে হয়েছে বৃষ্টির কবলে। এরপর চা-বিস্কুর, খাওয়া হয়নি তেমন কিছুই।
আরও রাত বাড়লে বৃষ্টি থিতিয়ে আসে। নাসির চুলা নিবিয়ে টঙের ঝাঁপ বন্ধ করে। এতক্ষণে সোহাগীর শাড়ি রূপ বদলে ঘোলাটে হলেও কিছু আগের বৃষ্টির ভেজা স্বাদ ঝেড়ে ফেলেছে একেবারে। স্তব্ধ ঢাকার সরু গলি পথ ধরে খুব বিশ্বাসের মানুষ নাসিরকে পাশে নিয়ে হেঁটে চলে সোহাগী। এ এক স্বর্গীয় স্বাদ যেন, এটাকে শাড়ির পানির মতো ঝেড়ে ফেলে যায় না কোনোমতেই। এই স্বাদ, এই মোহে সোহাগী ভুলে যায় গ্রামে তার লাঞ্ছিত জীবনের কথা। যেখান থেকে এসেছিল ঢাকায় স্বামীর হাত ধরে এবং আরেকদিন ফিরে গেছে স্বামীবিহীন সন্তান হাতে। জায়গা দেয়নি তখন কেউই। না শ্বশুরবাড়ি না বাপের বাড়ি। শুধু জুড়ে গিয়েছিল আঁশের মতো কলঙ্ক। সোহাগী তার মা’মনকে শক্ত করে সবই সয়ে গিয়েছিল সেদিন, আর মনের কোণে বাঁচিয়ে রেখেছিল নাসিরকে, যে কিনা ছিল না তার কিছুই।
নাসির! হ্যাঁ, নাসির জুড়ে গিয়েছিল তার জীবনে অযাচিত ভাবেই। সম্পর্কটা একেবারেই কেমন যেন, বড্ড খাপছাড়া আবার কোথায় যেন ছন্দবদ্ধ মিলনের সুর! স্বামীর বন্ধু আর এই সম্পর্ককে পুঁজি করে রোজ আসত এই নাসির সোহাগীর কাছে এটা ওটার ছুঁতোয়। কখনো আসত শুধুই গল্প করতে, কখনোবা এক অজানা পিছুটান যা প্রকাশ করা যায় না বা যা প্রকাশ করা বারণ শুধুই সেখানে বোঝাবুঝির খেলা। কিছুদিন সোহাগী জানতে চেয়েছে আসার কারণ পরে শুধুই দুয়ার খুলে দাঁড়িয়েছে স্বাগত ভঙ্গিতে। এমনই সব টান ও অটানে হাজির হতো সোহাগীর দুয়ারে যখন থাকত না সোহাগীর স্বামী, থাকত না বস্তিকেন্দ্রিক কোলাহল। এই আসা যাওয়া এবং একদিন কিছু না বলেই যখন সোহাগীর স্বামী তার দায়দায়িত্ব ফেলে চলে গেলো, ফিরল না দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরও। তখন এই নাসিরকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চাইল সোহাগী। যেন অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন নাসির। কারণ, আরও একটা নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসার অদম্য খেলায় মেতেছে ততদিনে। যাকে দেখা হয়নি কখনোই, সে আসুক, দেখা দিক এটাই যেন তখন একমাত্র চাওয়া ছিল সোহাগীর মা’মনের।
একদিন নাসির বলেছিল, ‘ও আর বুঝি আসবে না ফিরে। বিয়া হওয়া মেয়েমানুষের গতি হওয়া কঠিন ব্যাপার। তার চেয়ে এখানেই থাকো। কামকাজ খুঁজো। একটা প্যাট, সমস্যা হবে না। যতদিন কিছু না পাও, ততদিন আমি তো আছি।’
এই কথাগুলোর গভীরতা সোহাগীর কাছে অন্যরকম। একটা মায়া, একটা দায়িত্ব সব মিলিয়ে যেন শুনেছিল সেদিনের বাক্যটুকু। তবু মুখ ফুটে বলা হয়নি, একটা নয় এখন তার দুটো পেটের কথা ভাবতে হবে। আরও কমাস পরে যখন কিনা আর লুকনো সম্ভব নয় মায়ের আকৃতি তখন নাসির জানতে চেয়েছিল, ‘এটা কার?’ সেদিনের অভাব অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ তাকে দিয়ে শুধু একটি কথায় বলিয়েছিল, ‘এটা আমাদের।’
তখন থেকেই সন্তান যেন সত্যি সত্যি নাসিরের। সোহাগীর ভালো থাকা মন্দ থাকা সবকিছুরই অভিভাবক সে, শুধু নাসির তাকে দিতে পারেনি পরিপূর্ণ সংসার। নাসির করতে দেয়নি পোয়াতি সোহাগীকে কোনো কাজ। অনাগত সন্তানকে পৃথিবীতে আনার সব দায়িত্ব যেন সেদিন থেকেই নাসিরের। বলেছিল, ‘যতদিন রোজগার আছে, তোমাদের দুজনের দায়িত্ব আমার। ছেলেটাকে গ্রামে নিয়ে যাও, পড়াও। ও মানুষের মতো মানুষ হোক। এই ঢাকা শহরে তুমি ওরে মানুষ পারবা না। এখানে বড়ই হারানোর ভয়।’ এভাবেই এক কুলহারা জীবনের ঠিকানা মিলেছিল সেদিন।
গ্রামে ছেলের খরচ, পড়াশোনা সবই নাসিরের। তাই তো সোহাগী প্রতি মাসে আসে, খোঁজ খবর দেয়, কখনো কখনো থেকেও যায়, মায়া বাড়ায়, বিশ্বাস বাড়ায় যে বিশ্বাস তাকে সকল অবিশ্বাসের কাছ থেকে নিয়ে যায় দূরে বহুদূরে। যেখানে আর কেউ তাকে প্রশ্ন করে না, এই ছেলের বাবা কে? এভাবেই অদম্য বিশ্বাসে অন্ধকার গলি পথে হেঁটে চলে দুটি প্রাণ হৃদয়ের অনন্ত গভীরে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।