ছোট্ট ধনু কোত্থেকে দৌড়ে এসে ঘোষনা করল ও খুব ‘আবেগাপ্লুত’ হয়েছে ৷ ধনু আমার ভাই ৷ একমাথা কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুল, ইঁদুরের দাঁতের মতো ক্ষুদে ক্ষুদে দাঁত আর মুখে হাসি ৷ ঠাম্মা বলেন, আমার প্রাণগোপালের প্রাণহরা হাসি ৷
ছোটকাকা বারান্দায় বসে দুহাঁটুতে আয়না ব্যালেন্স করে দাঁড়ি কাটছিল ৷ আয়নার হাতল ভাঙা, পারা ওঠা , ভালো করে মুখ দেখা যায়না বলেই একলা ছোটকাকার ভাগের এই আয়না ৷ সকালে বেসিনের সামনের দাঁড়ি কাটা মানে হাজার বার থামা, একে তাকে জায়গা দেওয়া ৷ ধনুর এই কথায় চমকে গিয়ে হাত নড়ে গাল টাল কেটে একাকার ! ইশ্ ! সকাল বেলাতেই রক্তারক্তি কান্ড !
পাশের ঘরে ঠাম্মা খাটে শুয়ে মোবাইলে সবার খবর নিচ্ছিলেন আর তাঁর পাশে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে দাদু পেপার পড়ার চেষ্টা করছিলেন ৷ চেষ্টা বলার কারণ দাদু চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পান না ৷ গ্লুকোমায় চোখের জ্যোতি গেছে বহুকাল , সেই জ্যোতি বসুর আমলেই, তবুও অভ্যাস ! চোখের সামনে কালো কালো পিঁপড়ের সারি দেখতে পেলে তবেই নাকি দাদুর জলখাবারটা হজম হয় ৷ সে তো পাতলা ফিনফিনে একটা রুটি, সামান্য একটু দুধ আর কলা চটকে ছোট একবাটি তাঁর জলখাবার ! এ আবার হজম করতে সময় লাগে নাকি ! ও তো গলা দিয়ে নামতে নামতেই ভোঁ ভা !
সেরকম জলখাবার যদি বলো , সেটা খান মেজকাকা ৷ রোজ সাড়ে পাঁঁচটায় উঠে ফ্রি হ্যান্ড, একহাজার স্কিপিং আর যোগ ব্যায়াম ৷ দেখলে কষ্ট হয় ! আহারে শরীরটাকে এভাবেও কেউ তুর্কী নাচন নাচায় ! আর এত কষ্টের পর ঘানিতে ভাঙানো খাঁটি সরষের তেল মেখে স্নান সেরে একটু ভালো মন্দ খেতে চাওয়া ৷ বেশী কিছুই নয় , এই পাঁচটা ডিমের সাদা অংশ , বড় একবাটি স-সবজি ডাল সেদ্ধ , মাত্র পাঁচটা মোটা আটার রুটি আর পাঁচটা কলা ৷ সামান্য ৷ তাতেই বাড়িসুদ্ধ লোকের হাঁফ ধরে যায় !
সকাল বেলা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত ৷ মা রান্নাঘরে একবোঝা কচুর লতি নিয়ে বসে ঘামছেন ৷ সময়মতো ছাড়িয়ে না দিলে মোতি রান্না না করেই চলে যাবে ৷ কেটেকুটে না দিলে তার কাজে মতি আসেনা ৷ বাবার অফিস, মেজোকাকার দোকান, ছোটকাকার কলেজ, দাদু -ঠাম্মার দেখাশোনা – মা যে মনে করে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন এটাই অনেক ৷
বৌঠান, ডেটল টেটল কিছু একটা দাও ৷ তোমার ছেলের কথার ধাক্কায় আমার গাল কেটে গেছে ৷ ছোটকাকা বলে ৷
আমার হাতে তো নেই ভাইটি,কিছু জিনিস দাদাদের কাছে চেয়ে দ্যাখো না ! মা চটপট লতি শেষ করে পটল কাটায় মন দেন ৷
বাবা পর্যন্ত গোল্লা গোল্লা চোখ করে কিছুক্ষণ ধনুর কান্ড দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন , মামন, তুমি ভাইকে শিখিয়েছ ?
আমি বললাম, আমার সেকেন্ড ল্যাঙ্গোয়েজ হিন্দি বাবা, অত শক্ত বাংলা আমি জানিনা ৷ আমি প্লুটো জানি ৷ ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট আর অ্যাবেগী ল্যাটিন ওয়ার্ড , মিনস্ ‘ড্রাইভ অ্যাওয়ে’ ৷
বাবা আমার স্মার্টনেসকে মাছি তাড়ানোর মতো হুঁ দিয়ে তাড়িয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেলেন ৷ এ বাড়িতে সবার স্লট ভাগ করা ৷ বাবার হলে ছোটকাকা ৷ এখন আমার স্কুল ছুটি বলে দৌড়োদৌড়ি তবুও কম ৷
টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে ৷ মেজোকাকা দোকানে যাবার আগে আর এক প্রস্থ খাবার খেতে খেতে বাবাকে বললেন , দাদা, ধনুটার যত্ন নিতে হবে ৷ নইলে পাঁচ বছরও হয়নি এমন শক্ত শক্ত শব্দ বলছে কি করে ? মনে আছে গত পরশু বলেছিল ‘রাজদ্রোহ’ ! আমরা তো কেউ এমন কথা বলিনা ৷ আর ছোট তো বাংলায় চল্লিশ পাওয়া ছেলে ৷ ওর কাছ থেকে শিখবে না ৷
ছোটকাকা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আমার মন বোঝার চেষ্টা করল মনে হলো ৷
এসব কথার মাঝে গুটি গুটি পায়ে ধনু এসে হাজির ৷ মা বললেন, ‘ মানিক আমার , তুমি আবেগাপ্লুত কোথায় শিখেছ ?’ ধনু বলল, মা আমি সব শিখেছি ৷ লুটোপুটি শিখেছি, মোতিচূড় শিখেছি, পরিশ্রম শিখেছি ৷
মাও এবার চোখ কপালে তুলে বললেন , বাবা , তুমি এসবের মানে জান ?
ধনু ঘাড় অনেকটা কাত করে বলল , হ্যাঁ মা, জানিতো ৷ আবেগাপ্লুত মানে আমাকে পাওয়া ৷ নাতিকে পেলে ঠাম্মারা খুশী হয়ে এসব পায় ৷
সবাই খাওয়া থামিয়ে অবাক চোখে ধনুর দিকে তাকিয়ে থাকলো ৷
বেলার দিকে লস্যি নিয়ে ধনুর মা যখন শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে গেলেন তখন দেখলেন , ধনু ঠাম্মা দাদুর বিছানায় শুয়ে বকবক করছে ৷ আর ঠাম্মা তার একমনে চোখে চশমা এঁটে আনন্দবাজারের শব্দজব্দ করছেন ৷ শুনলেন শাশুড়ি জিজ্ঞেস করছেন, হ্যাঁগো, পাঁচ অক্ষরে ‘অকস্মাৎ একাধিক ঘটনা’ কি হবে ?