রম্যরচনায় দেবব্রত রায়

হাজরাপাড়া , পোস্ট , বিষ্ণুপুর , জেলা, বাঁকুড়া। চলভাষ-৬২৯৪১৭১৮৯৪ . জন্মতারিখ-০৭/০৯১৯৭০. জন্মস্থান - বাঁকুড়া জেলার ওঁদা থানা । বানিজ্যে স্নাতক। যুবমানস, স্বদেশে,  কলেজস্ট্রীট, প্রতিভাস, গীর্বাণ, তমোহা, বর্তিকা , দক্ষিণবঙ্গ সংবাদ কবিতাপাক্ষিক  এছাড়াও , বিভিন্ন রাজ্যের পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করছেন ।          

সম্পর্ক

নম্বর – ১
ব্রহ্মদত্যি-র সঙ্গে আমাদের ভারতীয়দের এবং  বাঙালিদেরও সম্পর্কটা খুবই  পুরানো এবং বেশ পরপোকারীসুলভও ! ক্ষতি তো করেই না বরং, আশেপাশে কোথাও ব্রহ্মদত্যি থাকলে শাকচুন্নি, পেত্নী, মেছোভুত, মামদোভুতেরা সেসব জায়গায় ঘেঁষতেও সাহস পায়না ! যাইহোক, আগেভাগেই বরং  ব্রহ্মদত্যি হওয়ার এলিজিবিলিটি সম্বন্ধে কিছু তথ্য-তালাশ আপনাদের  জানিয়ে রাখি  । ব্রহ্মদত্যি হতে গেলে কিন্তু , অবশ্যই  ব্রাহ্মণকুলজাত হতে হবে । আসলে, কোনো ব্রাহ্মণ বা, ব্রাহ্মণ-বংশজের ( উপবীত হওয়া বাঞ্ছনীয় )  অপঘাতে মৃত্যু হলে তবেই , সে ব্রহ্মদত্যি হতে পারে। আমি অবশ্য  কৈশোরের এক প্রভাতে ব্রহ্মদত্যির ছবি দেখেই প্রথম জেনেছিলাম,জোড়া পাঁচ নম্বর ফুটবলের ন্যায় মাথাটি তৈল-মসৃণ হলেও পশ্চাত-মস্তকে ব্রহ্মদত্যিদের একটি বেশ নধর আকৃতির শিখা থাকে! পরনে  পাটভাঙা , ধবধবে বক-সাদা  ধুতি , স্কন্ধে উজ্জ্বল আলো ঠিকরানো একেবারে ফিট সাদা একগাছি পৈতে এবং পায়ে খড়ম। সাকিন, বেলগাছ অথবা, বহু পুরানো, প্রায় মনুষ্যজনহীন বাড়ি-ঘর । বিশিষ্ট ভুত বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী  ব্রহ্মদত্যিরা আজ পর্যন্ত  কারোর ক্ষতি করেননি বরং পারলে  তারা মানুষের “উবগার”-ই করে এসেছেন ।
তা উবগারের কথা-ই যখন  উঠলো তখন, এই সুযোগে বরং সেই বামুন, বামুনবউ আর, ব্রহ্মদত্যি-র গল্পটা আপনাদের শুনিয়েই রাখি !  এক গ্রামে এক দরিদ্র বামুন আর,তার বউ ,  একটি ছোট্ট কুড়েঘরে কোনোক্রমে দুখেসুখে বাস করতো। যদিও , সুখ বলে কোনো বস্তু-ই তাদের সংসারে কুলোর ডগায় সামান্য খুদ-কুড়োর মতোও অবশিষ্ট ছিলনা !  তাহলে, সুখেদুখে বললাম কেন ?  তা বলতে হয়  তাই বললাম !  সে যাইহোক , দু-কুঠুরি-র সেই ছোট্ট মাটির কুড়েতে শুধু বামুন  আর,তার বামনী-ই থাকতো।  সংসারে তাদের আপন বলতে কেউ-ই ছিল না ! না ছিল ছেলেপিলে, না ছিল কোনো আত্মীয়-স্বজন ! আর, এই কারণেই বামনী-র মনে যেমন দুঃখ ছিল  তেমনি-ই বামুনের উপরেও তার ছিল ভয়ংকর  রাগ  ! সুযোগ পেলেই সে মুড়োঝাঁটা দিয়ে সপাসপ করে বামুনকে পেটাত, পিঠে গুমগুম করে ভাদ্রের তাল পড়ার মতো করে কিল-চড় বসিয়ে দিত । কখনো কখনো গরুর খোটা দিয়েই বামুনের পেটে পিঠে খোঁচা মারতো !  এইভাবে দুঃখ জমতে জমতে আস্ত একটা দুঃখের সমুদ্দুরে একদিন হাবুডুবু খেয়ে নিজের জীবনের উপরেই বামুনের চরম ঘেন্না ধরে গেল ! সে নিজের মনেমনেই  বললো, নাঃ , আর বেচে থেকে লাভ নেই ! শেষে একদিন তার সেই ছোট্ট কুড়ে , কুমড়োমাচা, পুঁই শাকেরমেচুরি, আমানির হাড়ি, বুড়ি লক্ষ্মী গাই এমনকী , ঘুমন্ত বামনীকেও পর্যন্ত দূরছাই বলে একটা গামছা নিয়ে যেদিকে দু-চোখ চাই সেদিকেই হাঁটা দিল  ! তারপর, হাঁটতে হাঁটতে বামুন কত গ্রাম-গঞ্জ মাঠ-ঘাট খাল-বিল নদী পেরিয়ে শেষে একেবারে একটা দিক-দাগশূণ্য  পেল্লায় ময়দানে এসে হাজির হলো !  ময়দানটার ঠিক মাঝখান জুড়ে একটা রাক্ষুসেপারা বেলগাছ  একেবারে শিরদাঁড়া ঠাঁটিয়ে চোপরোদে দাঁড়িয়ে আছে !  তার মাথাটা যেন আকাশ ভেদ করে একেবারেই মেঘের আবডালে চলে গেছে আর, ডালপালাগুলো  রাক্ষুসির জটার মতন অ্যাকড়াব্যাকড়া হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ! সেই খাঁখাঁ দানোপুরীর মতো ময়দানে এদিকসেদিক  দাঁড়িয়ে থাকা আর বাকীবাদ গাছগুলোকে দেখে বামুনের মনে হলো, ওরা সবাই যেন বেলগাছটার-ই  বশগ-প্রজা। বামুনের পো তার কোমর থেকে গামছাটা খুলে শরীরের ঘাম মুছল। তখন বেলা মধ্যাহ্ণ গড়িয়ে অপরাহ্ণের মাঝামাঝি ঘর ধরেছে।এতক্ষণে একটা সাঙিন খিদে বামুনের পেটের নাড়িভুড়িতে যেন মোচড় দিতে শুরু করেছে ! তার নাড়িভুড়ি যতই মোচড় দিয়ে উঠছিল  ততই সে অশ্রাব্য-কুশ্রাব্য সব বাছা বাছা ভাষায়  বামনীকে গালাগাল দিতে লাগলো !  গালাগাল দিতেদিতে তার মুখে থুতুর ফেনা ছুটতে লাগলো কিন্তু, তবুও বামুন-পো-এর রাগ কমলোনা ! সে বেল গাছের একটা পোক্ত ডালে গামছাটা বাঁধতে বাঁধতে বললো , ভাতার-খাগি , বেঁজো মাগী গু খা , গু খা ! নাড়-নচ্ছার  মেয়েছেলে , তোকে আর কীসের ভয় ! এ-সব বলতেবলতেই সে গামাছাটাকে টেনে দেখে নিচ্ছিল বাঁধনটা পোক্ত হয়েছে কী-না আর, অমনি-ই যেন পায়ের তলায় ভুমিকম্প শুরু হয়ে গেল !  একসঙ্গে বিশ-পঞ্চাশটা কালবোশেখি ঝড় এসে  দানোর মতো সব গাছগুলোর  চুলমুঠি ধরে যেন  একেবারে শেকড়তন্যিক নাড়াতে লাগলো ! বামুনের মনে হলো , বেলগাছটার শেকড়বাকড়ের ভিতরেই যেন ভুমিকম্পটা শুরু হয়েছে !  থরথর করে কাঁপতে থাকা বেল গাছটার বেশ পোক্ত একখানা ডাল জড়িয়ে ধরে বামুনের পো তো চোখ বন্ধ করেই প্রচন্ড  ভয়ে চিৎকার করতে লাগলো, জয় বাবা, মহাদেব, জয় বাবা ভৈরব, রক্ষে কর বাবা, এইবারের মতো রক্ষে কর ! জয় মা রক্ষা কালী, জয়, জয় ন্যাংটো কালী….
হটাৎ-ই বামুনের মাথায় কে যেন সজোরে একটা গাট্টা  মারল আর, বাজখাঁই গলায় চিৎকার করে উঠলো , চো-ও-প!
বামুনের মাথাটা ব্যাথায় যেন ঝনঝন করে উঠলো !  ” বাপরে! ” বলে সে চোখ বন্ধ করা অবস্থাতেই  চতুর্দিকে রাশি রাশি সর্ষে ফুল দেখতে লাগলো ! তারপর, শুনল কে যেন হেঁড়েল গলায় জিগগ্যেস করছে,  অ্যাই, তুই ক্যারে ? এখেনে কী কচ্চিস ?
বামুন ভয়ে ভয়ে চোখ খুলতেই দেখল আকাশে মাথা আর, তার পাশের মোটা ডালটাতেই একটা থামের মতো পা ! কোমরের নীচ পর্যন্ত ঝুলছে জাহাজ-বাঁধা গাছি দড়ির মতো একগাছা মোটা  পৈতে ! বামুনের পো গোঁ গোঁ শব্দ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে শুনতে পেল, ব্রহ্মদত্যিটা বলছে, সামান্য কড়ে আঙুল দিয়ে মাথাটা একটু চুলকে দিলাম তাতেই একেবারে ভির্মি খেলে দেখছি !
কিছুক্ষণ পরে বামুনের জ্ঞান ফিরতেই , সে মনে মনে ভাবলো মরতেই যখন এসেছি তখন, আর ভয় কীসের ! এই ভেবে বামুন পড়িমরি করে উঠে বসেই ব্রহ্মদত্যির সেই থামের মতো পা দুটো কোনোক্রমে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো । বললো,আমার এই সাত যন্ত্রণা-র ছেঁচকি-পোড়া জেবন আমি আর রাখতে চাইনে বেহ্মদত্যি-ঠাকুর ! দয়া করে আমাকে মরতে দেন  !
ব্রহ্মদত্যি আবারও ধমকে উঠলো। বললো , মেলা ফ্যাঁচফ্যাঁচ করিস না। আগে বল , তোর ব্যাপারটা কী, তুই জানিস না, এই গাছে আমি থাকি , এখানে কারোর আত্মহত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ ?
বামুনের পো আবার হাউমাউ করতে শুরু করলো।  বললো, বিশ্বাস করেন, আমি জানতামনা  ঠাকুর ! বউয়ের ছ্যাঁকা-র অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আমি এই গাছে এসে উঠেছিলাম !
ব্রহ্মদত্যি বললো , হুম! তা, তোর বউ কী কী অত্যাচার করে তোর উপরে শুনি !
বামুন তার বউয়ের উপর একটু বাড়িয়ে বাড়িয়েই দোষ চাপাল। বললো, সাতসকালে ঝাঁটা দিয়ে পেটায় , কান ধরে উঠবস করায়, গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেয় আরও কত কী!তারপর , বামুন তার সব দুঃখের কথা একে একে খুলে বললো ব্রহ্মদত্যিকে। সব শুনে ব্রহ্মদত্যি বললো , ব্যাস, এতেই তুই রামছাগলের মতো কাঁদছিস! তাহলে, আমার দশা হলে তোর কী হতো রে ! শোন, আমার বামনি মাঘ মাসের তিনপোহর রাতে একটা পানা পুকুরের একগলা জলে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখত তারপর, ভোরপোহরে  পুকুর থেকে তুলে এনে একটা খ্যাংরা ঝাঁটা দিয়ে মনের সুখে পিটিয়ে তিনদিনের বাসি পান্তা ভাত আর চালতার অম্বল খেতে দিত ! তারপর…
বামুন আঁতকে উঠে বললো , থাক, থাক , আর বলতে হবেনে বেহ্মদত্যি ঠাকুর !
ব্রহ্মদত্যি বললো , তাহলে ?  তারপর , ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো , সেই দুঃখেই তো একদিন এই গাছটায়  গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে পড়েছিলাম !
বামুন পাংশুমুখে বললো, তাহলে , আমার কী হবে বেহ্মদত্যি ঠাকুর ?
ব্রহ্মদত্যি বললো , তার আমি কী জানি ?
এতক্ষণে বামুনের -পো মনের মধ্যে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করেছে। সে আবারও হাউমাউ করে ব্রহ্মদত্যি-র পা-দুটো সাপ্টে ধরলো।  বললো, এঁজ্ঞে , আপনি  একটা উপায় না করলে আমি আর এখেন থেকে নড়বোনি,  এই গাছেই গলায় দড়ি দে ঝুলে মরব!
ব্রহ্মদত্যি দেখল এ তো বেজায় বিপদ! লোকটা তার এত সাধের বেল গাছখানা দখল করার ধান্দায় রয়েছে ! তখন ব্রহ্মদত্যি বললো , আচ্ছা, তোর  দু-চারটা ছেলেপুলে আর , মনের মতো ধনসম্পত্তি হলেই তুই আর এই গাছে গলায় দড়ি দেবার মতলব  করবিনা তো ?
বামুন একগাল হেঁসে বললো, এঁজ্ঞে, মাথা খারাপ!  তা আর কক্ষনো করি !
তখন ব্রহ্মদত্যি বললো , তবে শোন, দূরে ঐ জঙ্গলের ও পারেই একটা রাজ্য আছে। সাতদিন পর আমি  ঐ রাজ্যের রাজকন্যের ঘাড়ে গিয়ে চাপব। এই জগত সংসারের কোনো বোদ্দি, ওঝা, কোবরেজের চোদ্দগুষ্টি-রও সাধ্য হবেনা রাজকন্যের ঘাড় থেকে আমাকে নামায় ! একমাত্র, তুই গিয়ে যক্ষুনি রাজকন্যের কানে কানে বলবি ‘বেহ্মদত্যি ঠাকুর, আমি সেই বেলগাছের বামুন!  ‘ তক্ষুনি  আমি রাজকন্যের ঘাড় থেকে নেমে যাব ! তাহলেই, রাজা খুশি হয়ে তোকে যা ধনদৌলত দেবে তাতেই তোর বিংশত উত্তরসূরী ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ দুলিয়ে বসে বসে খেয়েমেখেও ফুরোতে পারবে না ! কিন্তু, একটা শর্ত আছে । তুই যদি ভুলেও আর কোত্থাও আমাকে অন্য  কারোর ঘাড় থেকে নামাতে যাস তাহলে , জানবি, সেটা-ই তোর শেষ দিন ! তোর ঘাড়টা আমিই মটকে দেবো !
বামুন  বললো, আপনার এই ছিচরণের কিড়ে, আমি ভুলেও আর সে পথ মাড়াবোনি !
ব্রহ্মদত্যি তখন খুশি হয়ে বামুনের হাতে একটা শেকড় ধরিয়ে দিয়ে বললো ,  এটা ভালো করে ধুয়ে-বেটে তুই আর, তোর বউ খেগে যা তাহলেই , তোদের ছানাপোনা হবে !
বামুন আবারও একবার ব্রহ্মদত্যি-র পায়ে পেন্নাম ঠুকে নাচতে নাচতে বাড়ির পথে পা বাড়ালো !  এরপর যে কী হলো সে তো আপনারা বুঝতেই পারছেন ! বামুন এখন পায়ের উপর পা তুলে দিব্বি গড়গড়া টানে ! বামনী  রোজ রোজ দুধ-পুলি, পাটিসাপটা, পায়েস, লুচি ক্ষীরকদম্ব করে করে বামুনকে খাওয়ায় !  এতদিনে তাদের  ছেলেপিলেও হয়েছে! আকাশভর্তি সুখ যেন কপিলা গাইয়ের দুধের মতো একেবারে হরহর করে ঝরে পড়ছে বামুনের সংসারে ! কিন্তু , সংসার-নিয়মে সুখ তো কোথাও একটানা থাকতে পারে না! সবের-ই একটা নিয়ম আছে। এদিকে দুঃখেরও হিংসে হয় !  সে সুখের ঘরে কীভাবে সিঁদ কাটবে এইসব ভাবে ! তা একসময় বামুনের সুখের ঘরেও সত্যিসত্যি-ই  দুঃখ এসে হানা দিল ! এখন হয়েছেটা কি, সেই যে রাজকন্যা-র ঘাড় থেকে বামুন ব্রহ্মদত্যিকে নামিয়ে ছিল সেই থেকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ ধন্বন্তরি  হিসেবে বামুনের নাম দেশেবিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল ! আর, সে-দেশের রাজামশায়ও বামুনকে খুব খাতির-যত্ন করে তার রাজসভায় একজন রত্ন হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন ! বামুনেরও যেন সুখের আর অন্ত ছিল না! …কিন্তু ,এ হেন কালে একদিন পাশের রাজ্যের রাজার দূত এসে জানালো তাদের রাজকন্যার ঘাড়ে ভুত চেপেছে  তাই , রাজশাই পত্তর দিয়ে ওঝারাজকে আমনত্তণ্ণ পাইঠ্যেছেন !  এই বলে সে রাজামশায়কে মস্ত একখানা পেন্নাম ঠুকে হাতে ধরা পত্তরটি এগিয়ে দিলো। রাজামশায়ও পত্তরপাঠ ওঝারাজকে আদেশ করলেন দূতের সঙ্গে সেই রাজ্যে যাওয়ার জন্য  । এদিকে তাঁতি পড়লো মহা বিপদে। যদি, রাজকন্যের ঘাড়ে সেই বেহ্মদত্যি চেপে থাকে তাহলে তো গেলেই সে তাঁতির ঘাড় মটকাবে আর, না গেলে আবার রাজামশায় তার গর্দান নেবেন !  শেষে অনেক ভেবে তাঁতি যাওয়ায় ঠিক করলো । সে মনেমনে ভাবলো ব্রহ্মদত্যি-র হাতে মরলেও রাজামশাইয়ের দয়াদাক্ষিণ্য থেকে নিশ্চয় তার পরিবার বঞ্চিত হবেনা ! অতঃপর, বামুন পুথিপত্তর বগলে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে, অং বং চং মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে দূতের আনা একটা লঝঝরে গাড়িতে গিয়ে চেপে বসলো !
তারপর , পুরো দু-দিন , পার করে গাড়িটা এক
রাজপ্রাসাদের সিং-দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
বামুন তো কাঁপতে কাঁপতেই রাজপ্রাসাদে গিয়ে ঢুকলো !  রাজামশায়কে বললো , আপনারা সব
বাইরেই অপেক্ষা করুন, আমি দেখছি  ! এই বলেই সে দুগগানাম জপতে জপতে রাজকন্যার ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলো ! বামুন যা ভয় পাচ্ছিল ঠিক তাই ঘটলো ! রাজকন্যার ভিতর থেকে ব্রহ্মদত্যি চিৎকার করে উঠলো, আরে, তুই সেই বেলগাছের বিটলে বামুনটা না ?  তুই আবার এসেছিস !  তোকে না আমি দ্বিতীয়বার আসতে বারণ করেছিলাম ?
বামুন তখন ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললো , এঁজ্ঞে বেহ্মদত্যি ঠাকুর , আমি কি এখানে সাধ করে এসেছি!  আপনাকে জরুলি একটা খপর দিতেই না আসতে হয়েছে আমাকে !
ব্রহ্মদত্যি জিগগ্যেস করলো, কী তোর জরুরি খবর?
বামুন বললো, এঁজ্ঞে, আমি পাশের গাঁয়ে পুজো করতে এসেছিলাম। সেখানে দেখি আপনার ব্রাহ্মণী গাঁয়ের লোকজনকে জিগগ্যেস করছে, এখানে কারোর ঘাড়ে কোনো বেহ্মদত্যি চেপেছে কী-না !  তারপর ,দেখলাম একটা খ্যাংরা ঝাঁটা হাতে নিয়ে তিনি এদিকেই আসতেছেন !
ব্রহ্মদত্যি এবারে আঁতকে উঠে বললো, অ্যাঁ, বলিস কীরে ! তা, সে কত দূরে আছে ?
বামুন বললো , আঁজ্ঞে বেহ্মদত্যি ঠাকুর, তিনি এই এলেন বলে!
ব্রহ্মদত্যি তো তাই শুনেই এক লাফে রাজকন্যার ঘাড় থেকে নেমে পড়ে বামুনের থুতনিতে একটা চুমু খেয়েই  হুস করে হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল ! রাজকন্যা কিছুই জানতে পারলোনা, সে বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল। তখন , বামুন জোরে জোরে অং বং চং -সব মন্ত্র পড়তে পড়তে রাজকন্যার চোখেমুখে কমণ্ডলুর জল ছেটাতে লাগলো। জলের ছেটা পেতেই রাজকন্যা বিছানায় উঠে বসলো! বললো , আমার বাবা কোথায়, আমার মা কোথায়? আমার সই ? ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। ঢোল-ডগর, কাড়ানাকারা বেজে উঠলো! রাজামশায়, রাণী-মা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাদের মেয়েকে। রাজ্য জুড়ে শুরু হয়ে গেলো খুশির উৎসব ! আর, বামুনের যে কি খাতির-যত্ন হল তাতো আপনারা বুঝতেই পারছেন । সাতদিন ধরে খুব যত্ন- আত্তি খেয়ে বামুন গাড়ি ভর্তি সোনা-দানা, হীরে-মাণিক  নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল !
নম্বর – ২
চম্পা চামেলি  সার্কাসে নররাক্ষসের একটা খেলা ছিল ! জাহাজ-বাঁধা দড়ি দিয়ে বেঁধে একটা মানুষকে ধরে রাখতে দশ-বিশজন মদ্দ যোয়ানও দম হারা হয়ে যেত ! ঘুমিয়ে থাকা লোকটার উপরে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে-ই, সেই লোকটা রাক্ষস হয়ে যেত! সে যে কী ভয়ংকর ব্যাপার , না দেখলে কারোর প্রত্যয়-ই হবেনা!  একটা আস্ত মুরগি কড়মড় করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতো সে! তারপর, আবারও মন্ত্র-পড়া জল ছিটিয়ে তাকে মানুষের হালে ফিরিয়ে আনা হতো ! সেই সার্কাস আর নেই কিন্তু , ভারতবর্ষময়,এই দুনিয়াময় নররাক্ষসেরা ছড়িয়ে পড়েছে !  অলি গলি, রাজপথে, চতুর্দিকে ক্ষতবিক্ষত মানুষের রক্তাক্ত শরীর, মৃত-নগ্ন নারী, শিশুর ছিহ্ণভিন্ন দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকছে প্রতিদিন – প্রতিনিয়ত!…. আর, খোক্কসদের বিষয়ে বিশেষ বলার কিছুই নেই ! সেগুলো হলো রাক্ষসদের দালাল! হাতা, চামচ, গাড়ু, ঘটি ইত্যাদি ইত্যাদি!
নম্বর -৩
ভুতেদের ( +পেত্নী , শাকচুন্নি) উপর আমার ভীষণ রাগ এবং অভিযোগ দুটো-ই আছে ! গৃহবন্দী অবস্থায় সেদিন সন্ধ্যা সাতটা- সাড়ে সাতটার সময়  আমি ছাতে পায়চারি করছিলাম। চারদিকে কেমন একটা ছায়া-ছায়া অন্ধকার ভাব !তার মধ্যেই  হটাৎ  লক্ষ্য করলাম, কে যেন একটা ব্যাঙের মতো ঝুপ করে এসে জলের ট্যাংকিটার উপরে বসলো !  আমি মাস্টারি ভঙ্গিতে কড়া গলায় জিগগ্যেস করলুম , অ্যাই, ওখানে কেরে ?
ছায়ামূর্তিটা  আমার কথার কোনো উত্তর দিল না।
আমি আবারও জিগগ্যেস করলাম, ওখানে কে?
ছায়ামূর্তিটা এবার একটু নড়েচড়ে উঠলো তারপর বললো , ইঁয়েজ্ঞে আঁমি পঁচাই , পঁচাই বাঁগদি !
পঁচাই বাগদি ! আমি আবারো বাজখাঁই গলায় বললুম , সে তো গতবছর ট্রাকে ইট তুলতে গিয়ে চাপা পড়ে মারা গেছে ?
ছায়াটা বললো , ইঁয়েজ্ঞে  আঁমি সেঁই পঁচাই-ই বঁটি ছোঁটকঁত্তা ।
ভুতপ্রেতে ভয় আমার চিরকালই কম  তারউপর এটা তো পঁচা । আমাকে ছোটোবেলায় সাপ ধরা শেখাতো। আমি জিগগ্যেস করলুম , তা এখানে কী চায় তোর ?
পঁচা বললো , ইঁয়েজ্ঞে, জঁঙগল উজাঁড়! অ্যাঁকটাও গাঁছপালা নাঁইকো, দাঁলাঙুলোতেও লোঁকে ভোঁত্তি! সাঁরাদিংটা  হাঁওয়ায় চঁক্কর দিঁতে দিঁতে সোঁরীট্টা অ্যাঁক্কেরে এঁইলসে গ্যাঁচে ! তাঁই, আঁপনারে দেঁকে এঁইখেঙে ইঁকটুং  বোঁসনু !
আমি ভীষণ রেগে গিয়ে বললুম,  তোরা ভুত না ভীতু-র ডিম! সব জঙগল একেবারে হেজে গেল আর, তোরা কোনো প্রতিবাদ করলি না ! একটু ভয়ও দেখাতে পারলিনা হতভাগা !
পঁচাই বললো  , কীঁ কোঁরবো কত্তাঁ , তাঁরা যেঁ সোঁব নাক্কসখোঙ্কোস ! গাঁছের অঁক্ত দেঁখে তাঁদের সেঁ কীঁ ফুঁত্তি ! তাঁদের ভঁয়ে আঁমরাই উঁদ্ব্বাস্তু হোনু !
আমি বললুম , তাহলে , এখন কী হবে !
পঁচাই বললো   ” কীঁ আঁর হঁবে ছোঁটোকঁত্তা, অ্যাঁখঙ আঁমরা পোঁরিযায়ী ভুঁত ! অ্যাঁখঙ শুঁধু হাঁওয়ায় ঘোঁরা ছাঁড়া আঁমাদেঁর আঁর কোঙো উঁপায় নাই ! ” তারপর, সে হাত নেড়ে  আঁসি ছোঁটোকঁত্তা , আঁসি… বলে, “এঁ-ই ঝঁপাঙ ! ” বলেই শূণ্যে একটা ডিগবাজি খেয়ে হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল !
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!