।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সুব্রত সরকার

বাউলের মিসড কল

বাউলের মিসড কল ছিল দুটো। মিটিং শেষ করে শুভঙ্কর তা দেখতে পেল। বাউল সাধারণত রাতের দিকেই মিসড কল দেয়। শুভঙ্কর তখন কলব্যাক করে কথা বলে। গল্প করে। এটাই ওদের দু’জনার অলিখিত নিয়ম। দেখতে দেখতে অনেকদিন হয়ে গেল। পথে পাওয়া এই বাউলের সঙ্গে শুভঙ্করের অদ্ভুত একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। দিনে দিনে সম্পর্কটা গাঢ় হচ্ছে। মায়ার বন্ধনে দৃঢ় হচ্ছে।
ওষুধ কোম্পানির বেচুবাবু শুভঙ্কর। চাকরীতে গাল ভরা একটা নাম আছে, মেডিকেল রিপ্রেজেন টেটিভ। সারাভারতে খুব বেশী ব্যবসা হয় না কোম্পানির। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কোম্পানী দাপিয়ে ব্যবসা করে। ওদের দুটো প্রিমিয়াম প্রোডাক্ট আছে, রমরম করে চলে। এক ডাকে সবাই না চিনলেও মোটামুটি একটা পরিচিতি আছে কোম্পানীর। শুভঙ্কর এখানে চাকরী করছে ন’বছর হয়ে গেল। কলকাতাতে টানা পাঁচ বছর কাজ করার পর কোম্পানী ওকে প্রথম দুটো আউটষ্টেশন দিয়েছে। মাসে দশদিন কাজ করতে হবে। একটা বোলপুর, অন্যটা দুর্গাপুর।
আজ অফিসের প্রথম কোয়াটার্লি রিভিউ মিটিং ছিল শহরের এক নামী হোটেলে। মিটিং শেষে লাঞ্চে ভরপেট খেয়ে ফেলেছে শুভঙ্কর। ফিস ফ্রাই পছন্দ করে বলে তিন তিনটে খেয়েছে। পাতুরিটা দারুণ হয়েছিল, সেটাও খেয়েছে দুটো। চিংড়ির মালাইকাড়ি, হরিয়ালি চিকেন, গোলাপ জামুন, বেকড রসগোল্লা সবই বেশ চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাড়ি এসে কাবেরীকে বলেছে, “মেনুগুলো দুর্দান্ত ছিল, শান্তি করে সব খেতে পারলাম না! মিটিং শেষে এমন মাথা ধরেছিল ভালো লাগছিল না।”
সারাদিন মিটিং, বক্তৃতা, টার্গেট এইসব নিয়ে কথার কচকচানি শুনতে শুনতে মাথা একদম জ্যাম হয়েছিল শুভঙ্করের। তাই মিটিং শেষে বাউলের মিসড কল দেখেও তখন আর ফোন করে কথা বলতে ইচ্ছে হয় নি। ভেবেছিল বাড়ি ফিরে মনের সুখে বাউলের সাথে দুটো কথা বলবে। গল্প করবে। ভোলানাথ দাস বাউল সহজ শিল্পী। গাইতে বললেই গায়। বাজার চলতি চটুল বাউল গান ভোলানাথ গায় না। ওর গানের সম্ভার, ওর গায়কি খুব ভালো। গণদেবতা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ধরে বোলপুর যাওয়ার পথেই ট্রেনে প্রথম আলাপ হয়েছিল ভোলানাথ বাউলের সাথে। খুব ভালো লেগেছিল ওর গান। সেদিন ভোলানাথ হাতের আনন্দলহরী বাজিয়ে বাজিয়ে গাইছিল, “পঞ্চবটীর পাতায় পাতায় তোমার নামটি লেখা, আবার কবে আসবে ঠাকুর, কবে হবে দেখা…
সেই প্রথম ওর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে শুভঙ্কর ওকে দশ টাকার সঙ্গে নিজের ভিজিটিং কার্ডটা দিয়ে বলেছিল, “আমি এই পথে প্রতিমাসে দশদিন যাতায়াত করব। তোমার সঙ্গে দেখা হবে। ফোন কোরও। আর তোমার কোনও ওষুধ লাগলে আমাকে বলবে, আমি দিতে পারব।”
ভোলানাথ দাস বাউল টাকা ও ভিজিটিং কার্ড হাতে পেয়ে মহানন্দে হেসে বলেছিল, “জয়গুরু, জয়গুরু।” কথার শুরু ও শেষে ভোলানাথ জয়গুরু বলবেই বলবে। শুনতেও বেশ লাগে। শুভঙ্করও এখন ‘জয়গুরু’ বলা শিখে গেছে। দু’জনের ফোনে কথা হলেই জয়গুরু দিয়ে শুরু ও শেষ হয়।
ওদের এই জয়গুরু বন্ধুত্বের কথা এখন অনেকেই জেনে গেছে। কাবেরী ও টুসু তো মজা করে বলে, “বাবা, তোমার জয়গুরু বাউলকে আমাদের পাড়ার পুজোয় গান গাইতে নিমন্ত্রণ কর। আমরা সবাই মিলে বাউল গান শুনব এবার।”
শুভঙ্কর মনে মনে ভেবেছে, সত্যিই তো ওরা মন্দ বলে না, এবার পাড়ার পুজোমণ্ডপে ভোলানাথ বাউল কে নিমন্ত্রণ করে আনলে হয়!
দুই
টুসু উচ্চমাধ্যমিক দেবে এবছর। ফিজিক্স পড়তে যায় রথতলায় এক আন্টির কাছে। ফিজিক্স ওর প্রিয় সাবজেক্ট। কাবেরী টুসুকে আনতে গেছে। একটু পরেই ওরা হয়তো ফিরবে। ফ্ল্যাটে এখন কেউ নেই।
শুভঙ্কর ছোট্ট বারান্দাটায় চেয়ার নিয়ে বসল। তিনতলার এই বারান্দায় বসলে চারপাশটাকে খুব সুন্দর দেখায়। এ অঞ্চলে এখনও সবুজের আধিক্য চোখে পড়ে। পাড়াটাও নিঝুম, শান্ত থাকে। বড় রাস্তা থেকে একটা গলি ভেতরে, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা পেতে কোনও অসুবিধা হয় না। বরং শান্তি অনেক বেশী।
শুভঙ্কর ফোন করল বাউলকে। রিং হচ্ছে। হয়েই যাচ্ছে। ভোলানাথ গেল কোথায়! একদম শেষ মুহূর্তে ফোনটা ধরে একটা কম বয়সী মেয়ের গলায় ভেসে এল, “হ্যালো..
“ভোলানাথ কোথায়?”
“বাব্বা তো মাঠ গ্যাছে… আপনি কে বলছেন?”
“আমি কলকাতা থেকে শুভঙ্কর চৌধুরী বলছি।”
“ও জেঠু আপনি!”
শুভঙ্কর অবাক হয়। মেয়েটা ওকে জেঠু বলে সম্বোধন করে চিনতে পেরেছে শুনে। বাউল নিশ্চয়ই ওর বাড়িতে শুভঙ্করের গল্প করেছে। এই মেয়েটাই তো এবার মাধ্যমিক পাস করেছে। ইলেভেনে ভর্তি করেছে ভোলানাথ। আর কি করে পড়াবে খুব চিন্তা করছিল। একবার বলেছিল, কোনও কাজে ঢুকিয়ে দেবে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েদের দলে ভিড়িয়ে দেবে। গান গেয়ে মাধুকরী করে সংসার চালানো বড় কষ্টের। ছোট্ট একটা ছেলেও আছে ভোলানাথের। ছেলেটার পড়ার খরচও অনেক। তাই মেয়ে তো মাধ্যমিক পাস করেছে অনেক। আবার কি!..
শুভঙ্কর একথা শুনে বাউলকে বলেছিল, “মেয়ে যদি পড়তে চায় পড়াও। উচ্চমাধ্যমিক পাসটা করাও। তারপর ওকে নার্সিং ট্রেনিং করাবে। মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। তোমারও উপকার হবে।”
শুভঙ্কর সেদিন এভাবে বাউলকে শুধু অন্য পথের দিশা দেখায় নি, পাশেও থেকেছিল। মেয়ের স্কুলে ভর্তি, নতুন বই-খাতা কেনার মত অর্থও যোগান দিয়েছিল। সেই মেয়ে আজ জেঠুকে চিনতে পেরেছে! এটা শুভঙ্করের এক পরম পাওয়া। দারুণ ভালো লাগা। তাই হেসে বলল, “তোমার পড়াশুনা কেমন হচ্ছে?”
“খুব ভালো জেঠু।”
“ভালো করে পড়বে। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে।”
“জেঠু, আমার পড়তে ভালোলাগে। আমি কলেজে পড়ব।”
“খুব ভালো। নিশ্চয়ই কলেজে পড়বে। চাকরী করবে।”
“হ্যাঁ জেঠু।”
“আচ্ছা, বাবা এত রাতে মাঠে কেন গেছে?”
বাউল কন্যা চুপ করে থাকে। শুভঙ্কর আবার বলে, “বাবা, মাঠে কি করতে গেছে? বলো…”
“জেঠু, আমাদের বাড়িতে তো বড় বাথরুম নেই! তাই মাঠে যেতে হয়…”
“মানে!” শুভঙ্কর অবাক বিস্ময়ে বলে, “তোমরাও মাঠে যাও!”
বাউল কন্যা নীরব। শুভঙ্কর বুঝতে পারে, ও লজ্জা পেয়েছে। তাই আর ও প্রসঙ্গে কথা না বলে বলল, “বাবা, মাঠ থেকে ফিরলে বোলও, আমি ফোন করেছিলাম।”
“ঠিক আছে জেঠু।”
“এখন রাখছি তাহলে। ভালো করে পড়াশোনা করবে। ভালো থাকবে।”
শুভঙ্কর অন্ধকার নির্জন বারান্দায় বসে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, আমাদের লক্ষ লক্ষ গ্রাম, কোটি কোটি মানুষ এখনও এই আঁধারেই ডুবে রয়েছে। সরকারের কত প্রকল্প, কত হৈ চৈ, স্বচ্ছ ভারত মিশন, নির্মল গ্রাম যোজনা – তবু এ আঁধার কেন যে ঘোঁচে না কে জানে!..
তিন
টিভিতে সান্ধ্য খবর হচ্ছে। করোনা আর লকডাউন সব খবরকে ম্লান করে দিয়েছে। তবু তার মধ্যেই সীমান্তে যুদ্ধের খবর, চিন পা বাড়িয়ে অশান্তি শুরু করেছে! ভারতও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এই সব খবর শুনতে আর ভালো লাগে না শুভঙ্করের।
হঠাৎই একটা কল এসে বন্ধ হয়ে গেল। শুভঙ্কর বুঝতে পারে এটা মিসড কল। ভোলানাথই করেছে। টিভির ভল্যুমটা একটু ছোট করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই কলব্যাক করল ভোলানাথকে।
“জয়গুরু দাদা।”
“জয়গুরু।”
“দুপুরে হঠাৎ ফোন করেছিলে কেন? আমি মিটিংএ ছিলাম, বুঝতে পারি নি।”
“দাদা গো, একটা সঙ্কটে পড়েছি। তাই ভাবলাম, দাদাকে জানাই।”
“কেন? কি হয়েছে?”
ভোলানাথ চুপ হয়ে যায়। শুভঙ্কর বলে, “কি হয়েছে বলবে তো!”
“দাদা গো, তোমার একটা পরামর্শ চাই।” ভোলানাথ কেমন ভয়ে বিড় বিড় করে বলে।
শুভঙ্কর হেসে বলল, “আমার পরামর্শ! কেন কি সমস্যা হল তোমার?”
“দাদা, তোমার বউমা বলছিল, টগরের জন্য একটা ভালো পাত্র পেয়েছে। আমাদের পাশের গ্রাম কলমি ডাঙ্গায় বাড়ি। বাড়ির বড় ছেলে। আর আছে এক বোন। সে বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মাধ্যমিক পাস করা। ওদের কোনও দাবী দাওয়া নেই। নিজেদের পুকুর, ধান জমি, বাস্তু বাড়ি, মোটর সাইকেল সব আছে। বাড়ির কাছেই নিজেদের নটকোনার দোকান। খুব চালু দোকান। বাপ-ছেলে দুজনে মিলে সামলাতে পারে না।”
এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া বাউলের কথাগুলো শুভঙ্কর চুপ করে শুনে যায়। ও প্রান্তে বাউল আবার বলতে শুরু করেছে, “দাদা, আমার তো পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই। তাই ঠিক বুঝতে পারছি না, কি করব? তোমার বউমা খুব ক্ষেপেছে, এখানে টগরকে বিয়ে দেওয়ার জন্য।”
“নটকোনার দোকানটা কি?”
“তা মুদি দোকান বটে। চাল, ডাল, আটা, তেল, মশলা, সাবান, সোডা সব পাওয়া যায়। খুব নাকি চালু দোকান!”
“দোকান চালু বুঝলাম। কিন্তু তুমি তো চালু নও। বোকা বাউল হয়েই আছো।”
বাউল চুপ করে থাকে ফোনের ওপ্রান্তে। আর কোনও কথা ভেসে আসে না। শুভঙ্কর এবার একটু গম্ভীর ভাবে বলল, “টগর তো ইলেভেনে পড়ছে। ও আরো পড়তে চায়। ওর তো এখন বিয়ের বয়স হয় নি!”
“দাদা, তা হয় নি বটে।” বাউল ভয়ে ভয়ে উত্তরটা দেয়।
“তবে যে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছো। জানো আইন আছে, নাবালিকাদের বিয়ে দেওয়া যায় না। আইন ভাঙ্গলে তুমি বিপদে পড়বে। পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে!”
বাউল এবার আমতা আমতা করে অসহায় ভঙ্গিতে বলে, “তা দাদা, আইন থাকলেও আমাদের পাড়াগাঁয় ওসব কেউ মানে না। বোঝেও না। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। ওরা দিব্যি সংসারও করে।”
“এই আইন কেউ না মানুক, তুমি মানবে।” শুভঙ্কর হঠাৎ যেন ধমকে উঠে বলল, “তুমি না বাউল! বাউলের সাধন-ভজনের জীবন। সেই জীবনে সামাজিক রীতি নিয়ম মেনে চলা তো উচিত। তুমিই তো গান গেয়ে গেয়ে বল, ‘মন না রাঙ্গায়ে, বসন রাঙ্গায়ে কি ভুল করিলি যোগি।’ তা তোমার মনের এই দশা কেন?”
ভোলানাথ চুপ করে থাকে। শুভঙ্কর বুঝতে পারে কথাগুলো খুব ভারী হয়ে যাচ্ছে। তাই গলার স্বর একটু নরম করে সহজ হয়ে বলল, “এত তাড়া কেন? মেয়েটা তোমার কাছে আছে, থাক না আরও কিছু দিন। এখনই পরের ঘরে পাঠিয়ে দেবে! পড়াও। ও তো পড়তে চায়। কলেজে যেতে চায়। ও বড় হোক। চাকরী করুক। তখন নয় বিয়ের কথা ভেবো। এখন এসব ভাবনা একদম দূর করে দাও।”
“দাদা গো, আমি তো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, তাই তোমার পরামর্শ চাইছিলাম। তোমার বউমাটা বড্ড অবুঝ হয়ে পড়েছে। লোভ সামলাতে পারছে না!” বাউলের কন্ঠস্বরে আর্তি ঝড়ে পরে।
শুভঙ্কর একথা শুনে আবেগহীন শক্ত ভঙ্গিতে বলে, “বউকে বোঝাও। নিশ্চয়ই বুঝবে।”
“দাদা, আমি তো বলব। কিন্তু যদি না বোঝাতে পারি, তুমি একটু বুঝিও।” অনুরোধ ঠেলে দেয় ভোলানাথ।
শুভঙ্কর হেসে বলে, “ঠিক আছে। তুমি তো আগে চেষ্টা করো। যদি না পারো, আমাকে বোলও। আমি বউয়ের সাথে কথা বলব।”
ফোন পর্ব প্রায় শেষ হওয়ার মুখে বেজে উঠল ঘরের কলিংবেল। কাবেরী টুসুকে নিয়ে ফিরে এসেছে। শুভঙ্কর বাউলকে বলল, “এখন রাখছি। পরে আবার কথা বলব। ভালো থেকো। জয়গুরু।”
“জয়গুরু! জয়গুরু দাদা!” বাউল চটজলদি ফোনটা কেটে দিল।
চার
টুসু ঘরে ঢুকে বইয়ের ব্যাগটা রেখেই বাবার কাছে ছুটে এসে বলল, “বাবা, একটা গুড নিউজ আছে। ট্রিট দিতেই হবে তোমাকে।”
শুভঙ্কর হেসে বলল, “আবার ট্রিট! সেদিনই তো দিলাম।”
“হ্যাঁ, আবার দিতে হবে।” টুসু হাসতে হাসতে বলল, “মা, তুমি বল কি হয়েছে?”
কাবেরী আনন্দে গর্বে একমুখ হেসে বলল, “টুসু আন্টির পরীক্ষায় হায়েস্ট মার্কস পেয়েছে। ওর থেকে চার নম্বর কম রুপকথার, ছয় নম্বর কম কথাকলির।”
“ওঃ রিয়েলি গুড নিউজ। কনগ্রাটস!” বলে শুভঙ্কর মেয়েকে কাছে টেনে নিল। টুসুও বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকল অনেকক্ষণ।
টিভিটা ঘরের মধ্যে অন করাই ছিল। খবরে দেখাচ্ছে, স্কুলের পোশাক পরা একটা মেয়ের মুখ। খবর পড়ুয়া মহিলা গমগম করে খবরটা পড়ছেন, “এই নাবালিকা কিশোরীকে তার অভিভাবকরা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু সে প্রতিবাদ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্থানীয় থানায় এসে পুলিশকে সব জানিয়ে বিয়ে রুখে দিয়ে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জেলাশাসক এই অসহায় মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছেন। মেয়েটির নাম লায়লা মণ্ডল। এবার মাধ্যমিক দেবে।”
লায়লা টুসুর মতই লম্বা। অল্প ফর্সা। একমাথা কালো চুল। উজ্জ্বল এক জোড়া চোখ। ক্যামেরার আলোয় ওর মুখ-চোখ ঝলসে যাচ্ছে। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেদি একটা মুখ। টুসু অবাক হয়ে বলল, “বাবা, ওকে বিয়ে দিতে চাইছিল কেন? ও তো ছোট আমার মত!”
শুভঙ্কর কোনও কথা বলতে পারে না। কাবেরীও চুপ করে থাকে। টুসু নিজেই কথা পালটিয়ে বলল, “বাবা, আমি কিন্তু অনেক পড়ব। আমি রিসার্চ করতে চাই বাবা!”
শুভঙ্কর এবার অল্প হাসল। মেয়েকে পাশে বসাল। ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “তোর যা পড়তে মন চায় তাই পড়বি। আমরা কোনও জোর করব না। বাঁধা দেব না।”
পাঁচ
রাতের খাওয়ার সাজাচ্ছে কাবেরী। শুভঙ্কর সকালের খবরের কাগজটায় একটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। উত্তর সম্পাদকীয়তে একটা লেখা পড়ে বেশ লাগল। আসন্ন যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর লেখা। সেখানে শুরুতেই লেখক একটা কবিতার দুটো লাইন দিয়ে লেখাটা শুরু করেছেন। লাইন দুটো চমৎকার, “মানুষ যখনই চায় বস্ত্র ও খাদ্য,/ সীমান্তে বেজে ওঠে যুদ্ধের বাদ্য।”
খাওয়ার টেবিলে গল্প করতে করতে ওরা খাচ্ছে। এসময় হঠাৎই শুভঙ্করের মোবাইলটা একটু বেজে থেমে গেল। এটা একটা মিসড কল। টুসু হেসে বলল, “বাবা, তোমার বাউল বন্ধুর কল!”
শুভঙ্কর মনে মনে আশা নিয়েই বসেছিল এই মিসড কলটার জন্য। বাউল ঠিক এভাবেই মিসড কল দেয়। ওর খুব জানতে ইচ্ছে করছে, বাউল কি পারল ওর নাবালিকা মেয়েটার বিয়ে রুখে দিতে? ওর অবুঝ বউ শুনলো কি বাউলের কথা! শুভঙ্কর তো ওকে উস্কে দিয়েছে। ঠেলে দিয়েছে এক শক্ত লড়াইয়ের দিকে।
“বাউল তোমার ঘুঙুর, তোমার দোতারা, তোমার আনন্দলহরী বাজিয়ে গানে গানে শুরু করে দাও এ লড়াই! এ লড়াই তোমাকে জিততেই হবে।”-সেই জেতার কথাটাই যেন শুভঙ্কর শুনতে চায়। তাই ও বড় অধীর, অস্থির হয়ে পড়েছিল এই মিসড কলটার জন্য!
শুভঙ্কর ধীরে ধীরে ফোনটার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।