ছোটদের জন্যে বড়দের লেখায় সুব্রত সরকার

বিক্রমের বাহাদুরি

বিক্রমের এ এক আজব নেশা। যত ছোটছোট তুচ্ছ জিনিস সংগ্রহ করে ও জমাবে। মা খালি বলে, “তোর এক বাতিক হয়েছে এইসব জমানোর”।আর এইসব জমানোতেই ওর মজা। বাড়ির আনাচে কানাচে খুঁজে সেসব পেয়ে যায়। সেগুলোই ওর আশ্চর্য সংগ্রহ!
বিক্রমের এইসব আশ্চর্য সংগ্রহগুলো গুছিয়ে রাখার জন্য একটা আশ্চর্য সুন্দর বাক্সও আছে। বাবা সেই বাক্সটার নাম দিয়েছে, ‘ম্যাজিকবক্স’!
পাশের বাড়ির দাদু বলে, “বিক্রম, স্মল ইস বিউটিফুল! তুমি খুব ভালো একটা নেশায় মেতেআছো।এটাকেই তো হবি বলে”।
বিক্রম এই দাদুকে সব দেখায়। যখনই ও নতুন কোনও ছোট্ট জিনিস খুঁজে পায় দাদুকে বলবেই বলবে। দাদু খুবখুশিহয়। দাদু ওকে দারুণ দুটো বিদেশি ছোট্ট কয়েন দিয়েছে। বিক্রম যত্ন করে কয়েনদুটো রেখে দিয়েছে সেই ম্যাজিক বাক্সটায়।
বাবা সেদিন কোথা থেকে যেন খুঁজেএনে একটা ছোট্ট বাইনোকুলার দিল। এটা নাকি বাবার ছোটবেলার খেলনা! মা জানেনা। বিক্রম চুপি চুপি লুকিয়ে রেখে দিয়েছে। মাকে একদিন দারুণ সারপ্রাইজ দেবে!
বিক্রমের ম্যাজিক বাক্সে এখনও পর্যন্ত বেয়াল্লিশটা জিনিস সংগ্রহ হয়েছে। মা বলেছে, “যেদিন তোর পঞ্চাশটা হবে, আমি তোকে একটা সুন্দর গিফট দেব”।
পাশের বাড়ির দাদুও বলেছে, “বিক্রম যেদিন তুমি সেঞ্ছুরি করবে, তোমার কালেকশন হবে হান্ড্রেড, আমি তোমায় দারুণ একটা গিফট দেব”।
বিক্রম এখন মায়ের গিফটটার জন্য ছটফট করছে। বেয়াল্লিশটা ছোট জিনিস ওর ম্যাজিকবাক্সে আছে। কাঁচের গুলি, অ্যাকোরিয়ামের ছোট্টপাথর, পুঁচকে লাল পুঁতি, পুরনো দু’পয়সা, পুতুলের চিরুনি, লাল নীল চক, বেলুন, রঙপেন্সিল, ছোট্ট ঝিনুক, পদ্মফুলের ছবি দিয়ে সোনালি রঙের কুড়ি পয়সা এমন আরও অনেক জিনিস আছে ওর ম্যাজিক বাক্সে।
লকডাউনের জন্য বিক্রম এখন বাড়িতেই বন্দী। কোথাও যেতে পারেনা। নাহলে আরও কত কিছু সংগ্রহ হয়ে যেত। দিদুনবাড়ি একবার যেতে পারলেই দিদুন, মাসিমণি কত কি দিয়ে দিত।
কাল বিক্রম নতুন দুটো জিনিস সংগ্রহ করেছে। এখন সব মিলিয়ে হয়েছে চুয়াল্লিশটা। পাখির একটা ছোট্টপালক ছাদে কুড়িয়ে পেয়েছে। এত ছোট্টপালক হয় পাখিদের! কোন পাখির পালক এটা জানতে হবে। দাদুকে দেখালেই দাদু ঠিক বলে দিতে পারবে।
বিক্রম বাড়ির বাগানে খেলছে। পাশের বাড়ির দাদু বিক্রমকে দেখতে পেয়ে বলল, “বিক্রম আর কটা বাকি? মায়ের গিফটটা কবে পাবে?”
“দাদু আর একটা হলেই ফিফটি হয়ে যাবে। তোমার কাছে ছোট্ট জিনিস কিছু আছে?”
দাদু হেসে বলল, “আছে তো! তুমি নেবে?”
“দাওনা দাদু”।
দাদু চুপিচুপি বিক্রমকে একটা ছোট্ট নতুন জিনিস দিয়েদিল। বিক্রমের ফিফটি হয়ে গেল! বিক্রম তো আনন্দে একদৌড়ে একদম মায়ের কাছে। মা তখন মাইক্রো ওভেনে কেক বানাচ্ছে। বিক্রম বলল, “মা আমার ফিফটি কালেকশান হয়ে গেছে! তুমি দেখবে? আমায় গিফট দেবে তো?”
মা হাসতে হাসতে বলল, “হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছিস!সত্যি? নিয়ে আয় দেখি তুই কি কি কালেক্ট করেছিস?”
বাবা পেপার পড়ছিল ড্রয়িংরুমে। বাবাও ডাইনিংরুমে চলে এসেছে। বিক্রম ছুটে গিয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে সেই ম্যাজিক বাক্সটা এনে খুলে দিল মায়ের সামনে। মা তো হেসেই যাচ্ছে। “উফ তুই এসব কি করেছিস! পাগল ছেলে আমার। দেশলাইবাক্স, ছোট প্রদীপ, ঠাকুরের গ্লাস এসবও তুই জমিয়েছিস?”
“সবই তো ছোটছোট জিনিস। তুমিতো এগুলো আর ব্যবহার করনা। ফেলে দিয়েছিলে। আমি সব কুড়িয়ে রেখেছি”।
বাবা হাসতে হাসতে মাকে বলল, “নাথিং ইস ইনসিগ্নিফিকেন্ট। দেখলে তো সবকিছুতেই কেমন খেলনা হয় !”
মা খুব খুশিখুশি হয়ে বলল, “নে নে কাউণ্ট কর দেখি”।
বিক্রম একটা একটা করে জিনিস নামিয়ে দেখাচ্ছে আর কাউন্ট করছে।থার্টিটু তে এসে দেখাল পুতুলের একটা ছোট্ট সানগ্লাস। থার্টি নাইনে লুডোর ছক্কা। ফরটিসিক্সে হলুদ হয়ে যাওয়া একটা পুরোন স্ট্যাম্প। মা স্ট্যাম্পটা দেখেই অবাক হয়ে বলল, “আরে দেখি দেখি,এটা তুই কোথায় পেলি?”
বিক্রম হেসে বলল, “তোমার গানের ডাইরির মধ্যে ছিল। একদিন ডাইরি থেকে পড়ে গিয়েছিল ঘরে। তুমি বুঝতে পারোনি। আমি কুড়িয়ে ম্যাজিকবাক্সে রেখে দিয়েছিলাম। ছোট্ট জিনিসতো তাই”।
বাবা বলল, “কিসের স্ট্যাম্প?”
মা বলল, “এটা খুব রেয়ার স্ট্যাম্প। মা আমাকে কত বছর আগে দিয়েছিল। হারিয়ে ফেলে খুব মনখারাপ ছিল। অনেক খুঁজেছিলাম। না পেয়ে কষ্ট পেয়েছি খুব। আর যে ফিরে পাব ভাবিইনি”।
বাবা স্ট্যাম্পটা হাতে নিয়ে বলল, “সত্যিই তো এটা এক রেয়ারস্ট্যাম্প!”
বিক্রম বলল, “মা এটাকিসেরস্ট্যাম্প? রেয়ার বলছো কেন?”
“রবীন্দ্রনাথের একশো বছরের জন্মদিনে এই স্ট্যাম্পটা প্রকাশিত হয়েছিল। আমার মাকে, মায়ের মা এটা দিয়েছিল। আমার সেই দিদা রবিঠাকুরের গান খুব ভালো গাইত। মা আবার আমাকে দিয়েছিল। তাই হারিয়ে ফেলে খুব দুঃখ হয়েছিল। ভাগ্যিস তুই যত্ন করে রেখে দিয়েছিলিস!”
বিক্রম খুশিখুশি হয়ে চেয়ে থাকে মায়ের দিকে। বাবা বলল, “তুই তো দারুণ এক বাহাদুরির কাজ করেছিসরে বিক্রম। তোকে তো হ্যাটস অফ বলতেই হয়!”
মা নতুন বানানো কেকের একটা টুকরো বিক্রমের মুখে তুলে দিয়ে আদর করে বলল, “তুই কি গিফট নিবি বল?”
বিক্রম হেসে বলল, “দাদু খালি বলে, স্মল ইস বিউটিফুল! এই স্ট্যাম্পটাতো সত্যিই স্মল আর কি বিউটিফুল”।
মা বিক্রমকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করছে। বাবা বলল, “এবার তাহলে তোকে তো একশো কালেকশন করতেহবে। দাদুও তোকে একটা গিফট দেবে বলেছেনা! নেনে শুরু করে দে”।…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।