সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৮)

কেমিক্যাল বিভ্রাট

কিন্তু জানালার কাছে ও না-থাকলে ওকে দেখাই যায় না। কারণ, জানালাটা একটু উঁচুতে। তাই সে বারই সে তার মায়ের কাছে বায়না করে একটা রেসিং-সাইকেল কিনেছিল। সাইকেলের সিটে বসে খুব ধীরে ধীরে ওদের বাড়ির গা-ঘেঁষে যাওয়ার সময় ওই জানালার দিকে এক ঝলক তাকালেই দেখে নেওয়া যেত, ও আছে কি না।

কিন্তু এক ঝলকে আর কতটুকুই বা দেখা যায়! তাই শীতের মরশুমে প্রতি বছরের মতো ব্যাটমিন্টন খেলার জন্য আর নিজেদের বাড়ির সামনে নয়, পাড়ার দু’-চার জন বন্ধুকে জুটিয়ে সে চলে যেত ওদের জানালার সামনে। ওখানেই ব্যাটমিন্টন খেলত। কখনও সখনও ক্রিকেটও। এবং যা-ই খেলুক না কেন, জানালা খোলা থাকলে তার লক্ষ্যই থাকত, সুযোগ পেলেই কক বা বলটাকে ওদের জানালার শিকের ভেতর দিয়ে গলিয়ে দেওয়ার। দিয়েওছে দু’-একদিন। আর যত বারই ওই জানালা গলে তাদের কক বা বল ঢুকে গেছে ওদের ঘরে, তত বার ওই সুস্মিতাই জানালা দিয়ে সেটা ছুড়ে দিয়েছে। আর সেটা ছুড়ে দিয়েছে অন্য কারও দিকে নয়, একমাত্র অভিমন্যুর দিকেই। কিন্তু না। ওর সঙ্গে কোনও দিন কোনও কথা হয়নি তার।

কথা না হোক, তার দিকে তাকিয়ে ও যাতে ফিক করে অন্তত একবার হেসে ওঠে, সে জন্য কি না করেছে সে! অন্যান্য দিনের মতো সে দিনও সুস্মিতা যখন তার দিকে বল ছুড়ে দিয়েছে, আগে থেকে ভেবে রাখা কৌশল মতো সে সেটা ধরতে গিয়ে ইচ্ছে করেই পিছলে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু না। তখনও হাসেনি ও। শুধু ‘এ মা’ বলে জিভ কামড়ে জানালা থেকে সরে গিয়েছিল।

আর একবার সুস্মিতা যখন জানালার সামনে শিক ধরে দাঁড়িয়ে ওদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল, সে তখন প্রতিটি বল এমন সাবধানে মারছিল, যাতে একটা বলও ওদের জানালার ধার-কাছ দিয়েও না যায়। গেলে যদি বাইচান্স ওর লেগে যায় কিংবা ও-ভাবে বল আসছে দেখে ও যদি ভয় পেয়ে চলে যায়, তাই শুধু নিজেই নয়, যারাই ব্যাট করতে নামছিল, সে তাদের পইপই করে আগেই বলে দিচ্ছিল, দেখে খেলিস। ও কিন্তু জানালায় আছে। লাগে না যেন…

একবার ইচ্ছে করে বেশ জোরেই বলেছিল, যাতে ও শুনতে পায়। নিশ্চয়ই শুনেছিল। কারণ, সে আড়চোখে দেখেছিল, তখনই তার দিকে মুখ ভেংচিয়ে ওখান থেকে ও ঝট করে সরে গিয়েছিল।

সরে গিয়েছিল সে দিনও। যে দিন ‘চোর-চোর’ খেলায় সে চোর হয়েছিল। অথচ অনেক খুঁজেও সে যখন কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না। বুঝতেই পারছিল না, ওরা কোথায় লুকিয়েছে। তখন কোনও উপায় না-দেখে জানালায় ওকে দেখতে পেয়ে ওর দিকে চোখের ইশারায় সে জানতে চেয়েছিল, ওরা কোথায় লুকিয়েছে?

ও তখন তার মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে ছিল ঠিকই। কিন্তু মুখে তো নয়ই, ইশারা করেও বলেনি, ওরা কোথায় লুকিয়েছে।

কিন্তু কেন? ও কি জানত না! নাকি ওর আশপাশে কেউ ছিল! থাকতে পারে! বাইরে থেকে তো দেখা যায় না। তা হলে কি কেউ না-থাকলে ও কথা বলত! আচ্ছা, ওকে একা পাওয়া যায় কী করে!

তাই যেন তেন প্রকারেণ ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য সে কম চেষ্টা করেনি। খোঁজখবর নিয়ে সে জেনেছিল, ও কখন স্কুলে যায়। কখন ওকে নামিয়ে দিয়ে যায় ওর স্কুলবাস। ওকে নেওয়ার জন্য কে দাঁড়িয়ে থাকে গলির মুখে। ও কবে কবে নাচ শিখতে যায়। কার সঙ্গে। ফেরে কখন। সেই মতো কত দিন যে একেবারে ঘড়ি ধরে সে গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কত দিন ‘কোথাও একটা যাচ্ছে’ এমন ভান করে ওর মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু না, কোনও লাভ হয়নি। ও যেমন, তেমনই মাথা নিচু করে পাশ দিয়ে চলে গেছে। ফিরে দেখা তো দূরের কথা। একবার আড়চোখেও তাকায়নি। সে খেয়াল করে দেখেছে।

ও পায়ে নূপুর পরত। হাঁটলে খুব সুন্দর ঝুম ঝুম করে একটা শব্দ হত। মনে হত, রিমঝিম করে কোথাও বুঝি বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু স্কুলবাস থেকে যখন নামত, গাড়ি-টারির শব্দে সেটা ঢাকা পড়ে যেত। শোনা যেত গলির ভেতরে খানিকটা ঢুকলে। কারণ, ওখানটা ছিল তুলনামূলক ভাবে অনেক নির্জন। অথচ যে ক’দিন সে ওকে স্কুলবাস থেকে নামতে দেখেছে, সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে ওর পায়ের নূপুরের শব্দটাই যেন তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। আর তখনই তার মনের মধ্যে বেজে উঠেছে সন্তুর। গুন গুন করে গেয়ে উঠেছে, ক’দিন আগে টিভি-তে ডিডি বাংলায় শোনা পুরনো দিনের একটা গান— রোদ জ্বলা দুপুরে / সুর তুলে নূপুরে / বাস থেকে তুমি যবে নামতে / একটি কিশোর ছেলে একা কেন দাঁড়িয়ে / সে কথা কি কোনও দিন ভাবতে… যদিও সময়টা রোদ-জ্বলা দুপুর মোটেও নয়, তবু তার মনে হত, গানটা যেন তার কথা ভেবেই লেখা।

শুধু কি নূপুরের শব্দ! ওর বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ, এমনকী ওর নিশ্বাস-প্রশ্বাসও যেন শুনতে পেত সে। শুনতে পেত ওর না-বলা অনেক কথা। মনে মনে সেই কথার উত্তরও দিত। আর সে-সময় সে যেন একটা অন্য জগতে চলে যেত। ভেসে যেত মেঘের ভেলা করে। যেখানে শুধু পাখিদের কলকাকুলি, রং-বেরঙের প্রজাপতির ওড়াওড়ি আর চারিদিকে শুধু ফুলেদের খিলখিল করে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়া।

অথচ দরজা ঢেলে বাড়ির ভেতরে ও ঢুকে গেলেই সব কিছুই যেন ভোঁ ভাঁ। খাঁ খাঁ। সুনসান। শুধু মরুভূমি আর মরুভূমি। কিচ্ছু ভাল লাগত না তার।

একদিন নয়, দু’দিন নয়। দিনের পর দিন এ ভাবে ব্যর্থ হয়ে-হয়ে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিল অভিমন্যু। ঠিক করেছিল, আর নয়। তাই বেশ কয়েক দিন ধরে সে আর ওর জন্য গলির মুখে এসে দাঁড়ায়নি। সাইকেল নিয়ে ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে উঁকি মারেনি জানালায়। হঠাৎ মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলেও, ওকে যেন দেখতে পায়নি, এমন ভান করে চলে গেছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।