ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৯)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
প্রায় ২৬০০ বছর আগে বীরভূমে নাথ ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং বীরভূমের নন্দীগ্রামেই বোধ হয় বিশিষ্ট কেন্দ্র ছিল—- এই কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। খিষ্ট জন্মের বহু আগে থেকেই রাঢ় দেশ জৈনভূমি ছিল, তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে বীরভূমের মাটিতে। ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভ্রমণ ভগবান মহাবীর রাঢ়দেশের
সূহ্মভূমি ও বজ্জভূমিতে চারিকা করেন। জৈন ভগবতী সূত্রে তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বীরভূমের পাইকর গ্রামে যে মহাবীর এসেছিলেন তার বড় প্রমাণ তিনি এখনো ভৈরব রূপে পুজো পাচ্ছেন গ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। এভাবেই মহাবীর ভৈরব রূপে, ন্যাংটা পীর রূপে এবং দেবী মনসা রূপে পুজো পাচ্ছেন পার্শ্বনাথ। বীরভূমের নন্দীগ্রামে পার্শ্বনাথ,তাঁতীপাড়ায় ভৈরব পূজিত হচ্ছেন। সারা বীরভূম জুড়েই এরকম অনেক জৈন মূর্তি স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস এবং ভক্তিতে হিন্দু দেবদেবী হয়ে উঠেছেন।
বীরভূমের অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবতা শিব। বীরভূমের গ্রামে গ্রামে, ধনী ব্যক্তির বসতবাড়িতে, পাড়ায় পাড়ায় শিব মন্দির। শিব বৈদিক দেবতা নন। তাই আর্য সমাজের প্রতিনিধি স্বরূপ দক্ষের যজ্ঞে তার নিমন্ত্রণ হয়নি। দক্ষযজ্ঞের বারোটা বাজিয়ে তাঁকে আর্য সমাজের স্বীকৃতি আদায় করতে হয়েছে। বিষ্ণুর সহায়তায় তিনি সৃষ্টি স্থিতি ও ধ্বংসের দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি পান। দক্ষযজ্ঞের পর সতী হিমালয় ও মেনকার কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন এবং শিবকে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করলেন। পার্বতী মহাদেবের মিলন দেবতারাও চাইছিলেন। কারণ তারা জানতেন অত্যাচারী তারকাসুরকে বধ করবে তাঁদের পুত্র।
মহাযোগী শিবের ধ্যান ভাঙ্গানোর জন্য কামদেবের প্রচেষ্টা, উমা মহেশের মিলন, কার্তিকের জন্ম এবং তারকাসুর বধ সমস্ত কাহিনী আর্য -অনার্য সংস্কৃতি মিলনের কাহিনী।
শতপথ ব্রাহ্মণে বলা আছে , দেবতাদের স্বর্গ গমনের সময় রুদ্র তাদের সঙ্গী ছিলেন না এমনকি সমুদ্র মন্থন কালে তিনি দেবতাদের দলে ছিলেন না। শিবের নিবাস কৈলাসে, কিরাত ভূমিতে।
‘আদি দেবতা শিব ছিলেন অরণ্য পর্বতের দেবতা কৃষি সংক্রান্ত দেবতা, মৃতের কঙ্কাল রক্ষক দেবতা। শিবকে পরে সংহার করতে হলেও আদিতে সৃজন শক্তির দেবতা ছিলেন। শিকারি গোষ্ঠীর মৃত জন্তুর আত্মার রক্ষক দেবতা হলেন ভূতনাথ।.. লিঙ্গ দেবতা ও ভূতনাথ এক হয়ে গেলে বিশেষ করে বজ্জভূমিতে অর্থাৎ উত্তর রাঢ়ে আগত কিরাতরা এঁর ভক্ত হয়ে ওঠেন। মহাভারতের যুগে দেখি কিরাত দের প্রভাবে শিব ও শিবানী কিরাত বেশ পরেছিলেন।’
বীরভূম জেলার আরেকজন জনপ্রিয় দেবতা হলেন ধর্ম ঠাকুর।রাঢ়ের সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্ম ঠাকুর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
ধর্ম ঠাকুর মূলত রাঢ়ের আদিবাসী নিষাদদের পূজিত গোত্র দেবতা। পরে ধর্ম ঠাকুর ও শিব ঠাকুর এক হয়ে গেলে উভয়ের গাজনে হইচই শুরু হয়। সারা বীরভূম জুড়ে গাজনের সময় বিভিন্ন জায়গায় জলাশয়ে রক্ষিত শিব লিঙ্গ গুলি জলের বাইরে এনে পুজো করা হয়। অর্থাৎ লিঙ্গ দেবতা, আদি পশুপতি শিব, রুদ্র, ধর্ম ঠাকুর সব মিলিয়ে আজকের শিব দেবতার সৃষ্টি। তাই সারা বীরভূম জুড়ে গ্রামে গ্রামে সর্বত্র শিবের মন্দির ছড়ানো।
সারা বীরভূম গ্রাম জুড়ে গ্রামে গ্রামে আর যে দেবী প্রায় সারা বছর ধরে পূজিত হন তিনি দেবী মনসা। ‘তিনি দ্রাবিড় ও কিরাত উভয়ের দেবী।
ধর্ম ও চন্ডী আদি অস্ট্রিক দেবতা, শিব ঠাকুর দ্রাবিড়, দেবী মনসা নিষাদ -কিরাত মিশ্র দেবী পরবর্তীকালে দ্রাবিড় ও আদি আর্য প্রভাবান্বিতা।
মনসার জন্ম পাতালে অর্থাৎ বঙ্গদেশে।’
বর্ধমান জেলায় চম্পা নগরীর অবস্থান সম্পর্কে বর্তমান নৃতাত্ত্বিক সমর্থন মিলেছে।ডঃ পঞ্চানন মন্ডল মহাশয় প্রমাণ করেছেন,” এ চাঁপাই নগরী
রাঢ়- দামোদরের তীরে অবস্থিত, ভাগলপুরের চম্পা নগরী কখনোই নয়।”
একদা এই চম্পা নগরী অস্ট্রো-দ্রাবিড় ও পরে কিরাত কেন্দ্র হয়। চাঁদ সওদাগর ও লক্ষিন্দর দ্রাবিড় শৈব বনিক। পূর্ব জন্মের ইন্দো মোঙ্গল ঊষা বেহুলা রূপে জন্মে বিভিন্ন ঘটনাবলীর পরে দ্রাবিড বণিক সমাজে মনসা দেবীর পূজা প্রচলিত করার ব্যবস্থা করেন।
সমগ্র বীরভূমের বিভিন্ন জায়গায় তিনি বিষ- বিনাশিনী ও মারী নিবারণী মনসা,শীতলা, দিদি ঠাকরুন প্রভৃতি নামে পূজা পাচ্ছেন।
সারা বীরভূম জুড়ে গ্রামে গ্রামে সারা বছর ধরে আরও যে দেবী পূজিত হন তিনি দেবী ষষ্ঠী। তিনি শিশুরক্ষয়িত্রী দেবী।
বীরভূমের পাইকরে বহু প্রাচীন বাণব্রত উৎসবে
ধর্ম সমন্বয়ের প্রচেষ্টা দেখা যায়। শ্রী পঞ্চমীর পরের দিন শীতলা ষষ্ঠীতে এই উৎসবে ধুমধাম করে পূজা করা হয় বুড়ো শিব ও ক্ষ্যাপা কালীর। ষষ্ঠীর দিনে ভক্তরা শিবের স্থানে গিয়ে ‘ কাচ বন্ধন’ করেন।
এইভাবে সারা বীরভূম জুড়ে আর্য -অনার্য ও লৌকিক দেবদেবীর মন্দির গড়ে উঠেছে। সেই মন্দিরগুলি গঠনে ও মন্দির গাত্রে খোদিত চিত্রলিপিতে মিশ্র সংস্কৃতির পরিচয় মেলে।
পরবর্তীতে বিভিন্ন ধর্মের সমর্থক রাজারা রাঢ়
তথা বীরভূমে রাজত্ব করেছেন। তাই তাদের তৈরি মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে বিভিন্ন রকমের ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
প্রাচীন ভারতের শিল্পকলা স্থাপত্য অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে গেলেও এখনো যা কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে টিকে আছে তার মধ্যে অপূর্ব শিল্পকলার নিদর্শন পাওয়া যায়। ঠিক তেমনি বঙ্গদেশ তথা রাঢ়ের দেবায়তনকে কেন্দ্র করে যে শিল্প চেতনা বিকাশ লাভ করেছিল তা দর্শনে আজও বিস্মিত হতে হয়।
অতীতে শিল্পীদের সামাজিক সম্মান ছিল বিশেষত রাজা ,জমিদার, ভূস্বামীরা তাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফলে তারা নিশ্চিন্তে শিল্প চর্চা করতে পারতেন। কিন্তু মধ্যযুগের প্রারম্ভে রাঢ় বঙ্গে বর্ণবিন্যাস ,জাতিবিন্যাস, অস্পৃশ্যতার জোয়ারে শিল্পকলা দূষিত হয়ে পড়ে। নতুন সমাজব্যবস্থায় কিছু শিল্পীগোষ্ঠী জলচল হলেও অধিকাংশই সমাজে অন্ত্যজ শ্রেণী রূপে চিহ্নিত হয়। শিল্পী গোষ্ঠীর সবাই দাবি করে যে তারা বিশ্বকর্মার বংশধর। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এর দশম খন্ডে একটি সুন্দর কাহিনী বিবৃত আছে। কাহিনীটি হল এরকম যে, দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার ঔরসে এবং স্বর্গের অপ্সরা ঘৃতাচীর গর্ভে মালাকার, কর্মকার, কংসকার, শঙ্খ কার, তন্তুবায় কুম্ভকার সূত্রধর স্বর্ণকার ও চিত্রকার এই নয় জন পুত্রের জন্ম হয়। তারা প্রত্যেকেই শিল্পকর্মে শিক্ষিত ,জ্ঞানযুক্ত ও বিচক্ষণ ছিলেন। এদের মধ্যে সূত্রধর গোষ্ঠী মন্দির স্থাপত্য ও অলঙ্করণে পারদর্শী ছিলেন।
বঙ্গদেশ তথা রাঢ় জনপদ তথা বীরভূমের মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশৈলীর অর্থ হলো চালা ও রত্ন মন্দির এবং গাত্রসজ্জায় টেরাকোটা অলংকরণ।
অনেকে মনে করেন,রাঢ় তথা বীরভূমে দোস্ত নির্মিত কোন মন্দির নেই। এটা সঠিক নয়। আজো পুরুলিয়া বাঁকুড়া বর্ধমান ও বীরভূমে অনেক প্রস্তর নির্মিত মন্দিরের নিদর্শন আছে।
বাংলার স্থাপত্য শিল্পকে জানতে হলে যে সকল মন্দির অক্ষতা আছে অথবা একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি এবং তার সঙ্গে শিলা লেখ ও তাম্র শাসনে মন্দির প্রতিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।
বীরভূম জেলার শিয়ান গ্রামে মকদুম শাহ জালালের দরগায় যে দুটি ফলক পাওয়া গেছে তার উল্টোপিঠে পাল বংশীয় নৃপতি নয় পালের শিলা লেখ খোদিত আছে। উক্ত শিলা লেখতে কোন দেবী মন্দির, শিব মন্দির ও উচ্চ দেব নামক বিষ্ণুর মন্দিরের নির্মাণকথা জানা যায়। মহারাজা হরি বর্ম দেবের মহামন্ত্রী ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি লিপির ২৯ নম্বর শ্লোকে বর্ণিত আছে যে, ভবদেব স্বগৃহ অর্থাৎ রাঢ়ে তথা বীরভূমের সিদ্ধল গ্রামে প্রতিষ্ঠিত নারায়ণ মন্দিরে নারায়ণ ,অনন্ত ও নৃসিংহ মূর্তি স্থাপন করেছিলেন।
চলবে