ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৭২)

সুমনা ও জাদু পালক
শঙ্খ বেজে উঠলো তীব্র ধ্বনিতে। এতটাই তীক্ষ্ণ এবং তীব্র সে আওয়াজ যে মুহূর্তের মধ্যেই ময়াল সাপের পেট ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ময়ালের অন্ত্রমধ্যস্থ পূতিগন্ধময় বস্তু ,ময়ালের রক্ত ইত্যাদি সারা দেহে মাখামাখি অবস্থায়, স্বেদসিক্ত ক্লান্ত বিধ্বস্ত চন্দ্রকান্তা ছিটকে এসে পড়ল বাইরে।
শঙ্খের তীব্র ধ্বনিতে সমস্ত রাজপ্রাসাদ থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হলো কোথাও যেন প্রবল জোরে ভূমিকম্প হয়েছে।
দুষ্টু জাদুকর হূডু রাজপ্রাসাদের দুগ্ধফেননিভ শয্যায় শুয়ে আয়েশ করছিল। চারজন পুতুল দাসী তার মাথা হাত পা ইত্যাদি দেহের বিভিন্ন অংশ উৎকৃষ্ট মানের আয়ুর্বেদিক তেলের সাহায্যে মর্দন করছিল। শঙ্খের তীব্র আওয়াজে সমস্ত রাজপ্রাসাদ কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুতুল দাসীরা ছিটকে ঘরের মেঝেতে পড়ে চৈতন্য হারালো। হূডু বহু কষ্টে নিজের পতন আটকালো ঠিকই, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর ধ্বনির উৎস জানার জন্য ব্যাগ্র হয়ে চিৎকার করে উঠলো, সেনাপতি কোথায়?
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রাজ্যের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রধান পুতুল সেনাপতি শিরস্ত্রাণ
এবং কোমর বন্ধ ঠিক করতে করতে হাজির হয়ে বলল,” জয় মহারাজ হূডুর জয়! জয় মহান সম্রাট হূডুর জয়! জয় প্রবল পরাক্রমী সম্রাট….
পুতুল সেনাপতি কথা শেষ করার আগেই হূডু প্রচন্ড জোরে তাকে ধমক দিয়ে বলল, ওরে মূর্খ,
আমার জয়ধ্বনি পরে দিলেও চলবে। আমার এখন জানা দরকার ওই তীব্র ধ্বনির উৎস কি?
পুতুল সেনাপতির সঙ্গে আসা সহকারী পুতুল সেনাপতি, যিনি নিজেকে পুতুল সেনাপতির চেয়ে অধিক যোগ্য ও বুদ্ধিমান বলে মনে করেন, তিনি হঠাৎ বলে বসলেন, আমার মনে হয় মহারাজ, শত্রুপক্ষ সীমান্ত আক্রমণ করেছে। হয়তো তারা কোন শক্তিশালী আধুনিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে আমাদের রাজপ্রাসাদ লক্ষ্য করে।
—– মূর্খ! ‘মনে হয়’ ‘ হয়তো’ এসব বাদ দিয়ে সঠিক কারণ কি জেনে আয় এক্ষুনি!
হূডুর কথা শেষ হতে না হতেই প্রায় ঊর্ধশ্বাসে দৌড়ে লাগালো সহকারী পুতুল সেনাপতি।
পুতুল সেনাপতি হাত জোড় করে বলল, আমি কি করবো হুজুর?
হূডু দুবার মাথা চুলকে বললো, তুই আমার উটপাখিকে প্রস্তুত কর , আমি রাজ্য পরিভ্রমণে বের হব।
ওদিকে শঙ্খধ্বনি শোনা মাত্র সুমনা বলে উঠলো, হে মহারাজ, আমার অনুমান যদি ভুল না হয়, তাহলে এই ধ্বনি আসমানী বানরের দেশের রানীর দেওয়া মন্ত্রপুত শঙ্খের ধ্বনি।
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছে। আর সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যই তাকে ঐ শঙ্খের সাহায্য নিতে হয়েছে। এক্ষুনি চন্দ্রকান্তার কাছে আমাদের যাওয়া খুব প্রয়োজন।
রানী মায়াবতী বললেন, আমাকেও এক্ষুনি ফিরে যেতে হবে রন্ধনশালায়। পুতুল দাস দাসীরা এই তীব্র শব্দ পাওয়ার পর হাজির হবে সেখানে। আমাকে সেখানে দেখতে না পেলে ভীষণ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
রাজা রুদ্র মহিপাল বললেন, তাই যাও হে মহারানী, তুমি রন্ধনশালায় ফিরে যাও। আমি রাজকুমারী রত্নমালা কে সঙ্গে নিয়ে চন্দ্রকান্তার খোঁজে যাচ্ছি।
মহারানী মায়াবতী রন্ধনশালার দিকে চলে যেতেই রাজা এবং সুমনা দ্রুত পায়ে ফিরে চলল সেই বেদির দিকে, যেখানে তারা চন্দ্রকান্তাকে অপেক্ষা করতে বলেছিল।
চন্দ্রকান্তা কে সেখানে না পেয়ে সুমনা বলল, মহারাজ আমার অনুমান সঠিক। নদীর দিকে যাওয়ার ওই সুরঙ্গ পথে কোন বিশেষ কারনে অথবা নিছক কৌতূহলের বশে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা গেছিল এবং সেখানেই কোন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে।
নদী পথের দিকে যাওয়ার ওই সুরঙ্গ পথে প্রায় ছুটে চলল সুমনা, পিছনে মহারাজ রুদ্রমহিপাল।
সেখানে গিয়ে তারা দেখলো, একটি মৃত বিশাল ময়াল সাপের পাশে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা। আর ঠিক তাদের পাশেই একটা ছোট্ট কুঠুরি ঘর ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। সেদিকে ভালো করে তাকাতেই সুমনা বলল,ওটা কি!
চলবে