T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সুকন্যা সাহা

উমা

নার্সেস স্টেশানে বসে দুচোখের পাতা একটু লেগে এসেছিল সিনিয়ার সিস্টার চন্দ্রিমা মুখার্জীর । এমন সময় তিনশো ছয় নম্বর পেশেন্টের বেলটা বেজে উঠতেই ক্ষণিকের তন্দ্রা ছিঁড়ে যায় সিস্টার মুখার্জীর । একটু আগেই প্রতিটা পেশেন্টের বেডের কাছে ঘুরে ঘুরে প্রত্যেককে রাতের মেডিসিন দিয়ে , স্যালাইনের বোতলের ফ্লুইড চেক করে , যার ব্লাড চলছে বা যার অক্সিজেন চলছে সব চেক করে নিজের চেয়ারটিতে এসে বসেছিলেন চন্দ্রিমা … এর মধ্যেই আবার কল…রাতের ডিউটি বেশ পছন্দ চন্দ্রিমার … বেশ শান্তিতে নিরিবিলিতে কাজ করা যায় … নিঊটাউনের প্রায় শেষপ্রান্তে এই ক্যনাসার হসপিটালটায় চাকরি তো আর কম দিন হল না ! এর আগে ছিলেন সরকারি হাসপাতালের স্টাফ নার্স । আজ নাইট শিফটে আর কারো ডিউটি নেই । আগের শিফটের ইলা আর অরুণা সেই কখন সন্ধ্যে আটটার সময় চার্জ হ্যাণ্ড ওভার করে চলে গেছে । এখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে । দ্রুত পায়ে তিনশো ছয় নম্বর বেডের দিকে যেতে যেতে চোয়াল শক্ত হয় চন্দ্রিমার । মেয়েটা এখনও জেগে …ঘুমোয় নি … বেডের কাছে যেতেই মেয়েটা ক্ষীন স্বরে বলে ওঠে , দিদা … টয়লেট । এখনও ঘুমোও নি তুমি ? বলে বকুনি দিতে গগিয়েও থেমে যান চন্দ্রিমা … দ্রুত হাতে হেপলক দিয়ে ফ্লুইড বন্ধ করে মেয়েটি যাতে টয়লেট যেতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেন তিনি । পেডিয়াট্রিক অংকোলজির এই ডিপার্টমেন্টে গত ছয়মাস ধরে নিয়মিত ডিউটি করছেন চন্দ্রিমা। তার মধ্যে গত সপ্তাহে এই তিনশো ছয় নম্বর পেশেণ্ট তনভীর আলম এসে ভর্তি হয়েছে … কতই বা বয়েস হবে তনভীরের ! দশ কি এগারো ! অথচ এর মধ্যেই দুরারোগ্য মারণ ব্যধি কুরে কুরে খাচ্ছে ওর শিশু শরীরটাকে … তনভীরের মুখটা বড় মায়া মাখানো … চোখ দুটো বড় বড় আর স্বপ্নালু … কী জানি কেন চন্দ্রিমার মতো পোড়খাওয়া কাঠখোট্টা মানুষও হেরে যান ওই মায়া মাখানো মুখের কাছে … আপনা আপনিই তার হৃদয় আর্দ্র হয়ে আসে।দিদা ও দিদা…তনভীরের ডাকে সম্বিত ফেরে চন্দ্রিমার। ” আমায় একটা গল্প শোনাবে ? আমার যে কিছুতেই ঘুম আসছেনা !”কতবার বলেছেন চন্দ্রিমা আমায় দিদা বলে ডাকবে না … তনভীরের সেই এক উত্তর … আমার দিদা তো আকাশের স্টার হয়ে গেছে … তুমি ছাড়া আর কাকে দিদা বলে ডাকব বল ? তুমি তো আমার দিদাই !মায়া মাখানো তনভীরের যুক্তির কাছে হার মানেন চন্দ্রিমা ।আস্তে আস্তে গুন গুন করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন ছোট্ট তনভীরের …

ইলার কাছে শুনেছেন চন্দ্রিমা তনভীরের রোগটা নাকি লিউকেমিয়া । ডঃ এম কাসগীর পেশেণ্ট । ডঃ কাসগী একজন নামী হেমাটো- অংকোলজিস্ট ।তনভীরের বাবা-মা দুজনেই ওয়ার্কিং। জেনারেলি এত ছোটো বাচ্চাকে গার্ডিয়ান ছাড়া ভর্তি করানো হয় না । কিন্তু তনভীরের কেসটা আলাদা । এর আগে সে বহুবার ভর্তি হয়েছে এই হাসপাতালে । ছয়মাস বাদে বাদেই তার রক্ত বদলাতে হয়।তনভীরের ব্লাডগ্রূপ এবি পজিটিভ। ইউনিভার্সাল ডোনার । সকালের দিকে তনভীরের মা আসেন । কিচ্ছু খেতে চায় না মেয়েটা । শীর্ণ থেকে আরও শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন । হাড় কখানা গোনা যায় ।অকাতরে ঘুমিয়ে পড়া ফ্যাকাশে তনভীরের মায়া মাখানো মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে চন্দ্রিমার ! তনভীর কি জানে এই মায়ার পৃথিবীতে তার আয়ু আর মাত্র কয়েকমাস!দ্রুত হাতে ঘুমন্ত তনভীরের গায়ে চাদরটা টেনে দিতে দিতে নিজেকেই কষে ধমক লাগান চন্দ্রিমা … সারাজীবন সিস্টারের ডিউটি পালন করে এসে শেষ বয়েসে একি অহৈতুকী মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে তার মন!তনভীর তো একজন পেশেণ্ট ; আর পেশেন্টদের সঙ্গে ইন্টারপার্সোনাল রিলেশানে জড়িয়ে পড়া তাদের প্রফেশনাল এথিক্স বিরুদ্ধ ।
দ্রুত পায়ে একবার গোটা ইউনিটটা রাউন্ড মারেন চন্দ্রিমা। সব পেশেন্টই অকাতরে ঘুমোচ্ছে ।প্রত্যেকের টেবিলে গিয়ে ওষুধের ড্রয়ার চেক করে পরেরদিনের ইনডেণ্ট লিখে রাখেন স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায়। নিজের চেয়ারে বসে মোবাইল খুলতেই স্ক্রীনে ভেসে আসে বেশ কয়েকটা মিসড ভিডিও কল। এত রাতে !বাবুনের ফোন ! পরক্ষনেই মনে হয় ওদেশে তো এখন দিন ! ঘুরিয়ে কল ব্যাক করবেন ভেবেও ক্ষান্ত হন চন্দ্রিমা । তিনি ওদের কে ? তিনি তো এখন পর !ভাবতে ভাবতেই টুং করে মেসেজ ঢোকে বাবুনের , হাই মম ! এবার পুজোয় আর দেশে যেতে পারছি না … অফিসের প্রচুর চাপ!কিছু মনে কোরো না… আমরা সবাই ভালো আছি ইনক্লুডিং তোমার উমা … প্রণাম নিও। বাই… একটা প্রগাঢ় অভিমান বাষ্প হয়ে দুচোখের পাতায় জমে চন্দ্রিমার… একমাত্র নাতনি উমার মুখটা ভেসে ওঠে মনের আয়নায় …সেই গেল বছর দেখেছিলেন!কত বড় হয়েছে এই এক বছরে ? তনভীরের বয়সীই হবে বোধহয়! সম্ববচ্ছরে এই একবারই দেশে ফেরে বাবুন !

সকাল আটটা নাগাদ একবার রাউন্ডে আসেন ডঃ কাসগীর । তনভীরের বেডের সামনে এসে জিজ্ঞেস করেন , “আজ কেমন আছ?” ম্লান হাসে বিছানার সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া শীর্ণকায় তনভীর।কালকের ব্লাড রিপোর্টগুলো চেক করতে করতে গম্ভীর মুখে সিস্টারকে বলেন ওর বাবা-মাকে আমার সঙ্গে ওপিডিতে দেখা করতে বলবেন। আজই । অ্যাণ্ড অ্যারেঞ্জ ফর নেকস্ট ব্লাড ট্রান্সফিউশান ।

দিনের সিস্টারকে চার্জ হ্যাণ্ডওভার দিয়ে বেরুতে বেরুতে প্রায় নটা বেজে যায় চন্দ্রিমার। বাইরে তখন ঝলমল করছে রোদ । একেই কি বলে আগমনী আলো ? পুজোর আর বেশিদিন বাকি নেই! পাড়ায় পাড়ায় প্যাণ্ডেলের ম্যারাপ বাঁধার কাজ প্রায় শেষ । নিজের ছোট্ট ওয়াগন আর নিজেই চালান চন্দ্রিমা । মাঝে মাঝে দূরে কোথাও গেলে সুবলকে নিয়ে যান । রোজকার হাসপাতালে যাওয়া আসা নিজেই সামলে নেন। এভাবেই জীবনে সব কিছুই সামলে এসেছেন একা হাতে ।না হলে অনিমেষ চলে যাওয়ার পর এই নার্সের চাকরি করে বাবুনকে একা হাতে মানুষ করতে পারতেন না । আজকাল বেশ ক্লান্ত লাগে …অত্যধিক খাটনি জানান দেয় বয়েস হয়েছে !ফেরার পথে কি মনে করে গড়িয়াহাটে একটা বড় দোকানের কাছে গাড়ি দাঁড় করান চন্দ্রিমা । বাচ্চাদের জামা কাপড়ের দোকান । এত সকালে এখনও গড়িয়াহাটে পুজোর বাজারের ভীড় ঠিক জমে ওঠে নি। দোকানে গিয়ে বারো বছরের মেয়ের একটা জামা দেখাতে বলেন। স্মল সাইজ … রোগা তনভীরের স্মল সাইজই ঠিক আছে …

“মে উই কাম ইন স্যর ?” ওপিডিতে নিজের চেম্বারে বসে একমনে তনভীরের রিপোর্টগুলোই খুঁটিয়ে দেখছিলেন ডঃ এম কাসগী। এমন সময় তনভীরের বাবা- মা ঘরে ঢুকতেই চোখ তুলে তাকালেন …
“আপনাদের আজ কেন ডেকেছি জানেন ? গতবার যে তনভীরের বোন ম্যরো ট্রান্সপ্লান্টেশানের কথা বলেছিলাম সে ব্যপারে কিছু ডিসিশান নিলেন ?”
” আমাদের অত টাকা নেই ডাক্তারবাবু… ডুকরে ওঠেন তনভীরের মা শবনম। মকবুল আর আমি সামান্য চাকরি করি একটা ছোট্ট প্রাইভেট কোম্পানিতে । বাব্র বার তনভীরের এই ব্লাড ট্রান্সফিউশানের খরচ চালানোই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে আমাদের পক্ষে …”
” বাট সামহাউ ইউ হ্যাভ টু অ্যারেঞ্জ দ্য ফান্ড …একটা ব্রাইট বাচ্চার ফিউচার …সাক্সেসফুল বোনম্যারো ট্রান্সপ্লাণ্ট করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে তনভীর । আপনারা বললে আমি বোম্বেতে আমার সিনিয়ার অংকোসার্জনের কাছে এই কেসটা রেফার করতে পারি … হি ইজ ওয়ান অফ দ্য লিডিং অংকোসার্জন অ্যাট প্রেজেন্ট …”

আজ মহাষ্টমী ।পুজোর এই কটা দিন ডিউটি থেকে ছুটি নিয়েছেন চন্দ্রিমা । আজ বেলুড়ে এসেছেন। কুমারী পুজো দেখবেন বলে । তিনি নিজে মিশনে দীক্ষিত। আজ প্রচন্ড ভীড় হয়েছে বেলুড়ে ।এবার একটি মুসলিম মেয়েকে কুমারী পুজো করছেন মঠের মহারাজরা… কি সুন্দর যে দেখতে মেয়েটি। যেন সাক্ষাৎ উমা । তনভীরের কথা বড় মনে পড়ছে চন্দ্রিমার । কাল শবনমের ফোন এসেছিল।বোম্বে থেকে । তনভীরের অপারেশান সাক্সেসফুল । বারবার কেঁদে কেঁদে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিল শবনম … আপনার এই ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব না ম্যাডাম। তনভীরের নতুন জীবন আপনারই দেওয়া …”
মনে মনে হাসেন চন্দ্রিমা … উমা তো আর কোনোদিন এদেশে ফিরবে না ; তাই নাতনির জন্য রাখা দশ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিটটা শবনমের হাতে তুলে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি চন্দ্রিমা । পুজোর জন্য কেনা গোলাপী রঙের ফ্রক্টা পড়ে তনভীরকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ঠিক যেন কুমারী পুজোর আসনে বসে থাকা উমা …

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।