গাড়িতে আওয়াজটা আবার হচ্ছে। কৌশিক খুব বিরক্ত হয় এই ঢকঢক আওয়াজটা শুনলেই। গাড়ি চালানোর মজাটাই চটকে যায়। ব্যাক গিয়ার করার সময় তো আরও বেশি হয়।
গাড়ির ই এম আই শোধ হল সবে। গাড়ি নতুনই আছে। দিব্যি চলছিল। উটকো এক উপদ্রব এই ঢকঢক আওয়াজ। সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে দেখিয়ে আনা হল। কদিন ঠিক ছিল। আবার সেই ঢকঢক আওয়াজ!
কেন হচ্ছে এই আওয়াজ দেখাতে গিয়ে একটা ফালতু বিলও করে দিল। গচ্চা গেল অনেকটা টাকা। এই সার্ভিস সেন্টারে আর গাড়ি নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।
শান্তনুর পরিচিত এক গ্যারেজে আজ গাড়ি নিয়ে এসেছে কৌশিক। ওরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে কোথা থেকে এই ঢকঢক আওয়াজটা হচ্ছে? কেন হচ্ছে?
কৌশিককে কফি দিয়েছে। সোফায় বসে কফি খেতে খেতে পুরনো ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছে। কিন্তু মন পড়ে আছে গাড়ির দিকে।
মেকানিক একমনে কাজটা করছে। মনে হচ্ছে সমস্যাটা ধরতে পেরেছে। লোকটা মাথার টুপিটা খুলে প্রথম যখন কথা বলছিল, কৌশিক ওর দিকে চেয়ে একটু থমকে যায়। ভীষণ চেনা লাগে। কোথায় যেন দেখেছে খালি মনে হয়! চেনা মুখ কিন্তু মনে পড়ছে না।
কাজ শেষ। গাড়ি ট্রায়াল রান করিয়ে দেখাবার জন্য কৌশিককে সামনে বসিয়ে নিল মেকানিক। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। চালাতে চালাতে মেকানিক বলল, “স্যার, আর আওয়াজটা হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখবেন”।
গাড়ি বেশ চলছে। গিয়ার চেঞ্জ হচ্ছে। গতি বাড়ছে। কিন্তু ঢকঢক আওয়াজটা একবারও হল না। কৌশিক বলল, “একবার ব্যাক গিয়ার করে দেখুন তো আওয়াজটা হয় কিনা!”
মেকানিক ব্যাক গিয়ার করল দু’তিনবার। না সেই আওয়াজটা আর নেই। উধাও। গাড়ি আবার আগের মতই সাউন্ডলেস, স্মুথ রান করছে। কৌশিক খুব তৃপ্ত হয়ে বলল, “এখন তো একদম হচ্ছে না!”
“আর হবে না স্যার। এবার দিব্যি গাড়ি চালান”।
“থ্যাঙ্ক ইউ আপনাকে”।
মেকানিক হাসছে। গাড়ি ট্রায়াল রান দিয়ে গ্যারেজের কাছে চলে এসেছে। কৌশিক একটু দ্বিধা নিয়ে এবার বলেই ফেলল, “একটা কথা বলব?”
“হ্যাঁ বলুন”।
“আপনি কি সুখবাজার হাই স্কুলে পড়তেন?”
“হ্যাঁ তো!” মেকানিক এবার অবাক হয়ে বলে, “আপনি কি করে জানলেন”?
“আমিও তো ওই স্কুলের ছাত্র”।
“তাই! কোন ইয়ারের মাধ্যমিক?”
“উনিশশো আশির মাধ্যামিক”।
“আমিও তো আশির…”
আশ্চর্য! একই বছরে দুজনে মাধ্যমিক পাস করেছিল। কিন্তু তারপর আর যোগাযোগ ছিল না। আজ চল্লিশ বছর পর দেখা হল! কৌশিক ওকে তাহলে ঠিকই চিনতে পেরেছিল। কালিঝুলি মাখা শরীরটা যতই নোংরা থাকুক, মুখটা চিনতে অসুবিধে হয় নি।
তারপর ছেঁড়া ছেঁড়া দু’চারটে কথা হয়। দুজনেই দুজনার নাম ভুলে গেছিল।
সামান্য একটা বিল পেমেন্ট করে কৌশিক গাড়ি নিয়ে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে এল। রাজপথ এখন বেশ ফাঁকা। কৌশিক গিয়ার চেঞ্জ করতে করতে মনের সুখে গাড়ি চালাচ্ছে। ঢকঢক আওয়াজটা একবারও হল না। উধাও। ইচ্ছে করে দু’বার একটু থেমে ব্যাক গিয়ারও দিল। না, কোনও আওয়াজ নেই। ভ্যানিশ!
গাড়ি আবার আগের মতোই শব্দহীন সুন্দর হয়ে গেছে। গাড়ি চলছে না, গাড়ি এখন যেন উড়ছে!
গাড়ির সাউন্ড সিস্টেম অন করে এফ এম চালিয়ে দিল কৌশিক। কিন্তু গানে মন দিতে পারল না। হঠাৎ ওর মনে হল যেন একটা ঢকঢক আওয়াজ হচ্ছে। ও শুনতে পাচ্ছে। ওর খুব অস্বস্তি হচ্ছে। একসময় মনটা খারাপ হয়ে যায়। শব্দহীন সুন্দর গাড়ি চালানোর মজাটাই ফিকে হয়ে যায়। স্কুলের বন্ধুর সাথে আজ এভাবে এখানে দেখা না হলেই যেন ভাল হোত।
“আর হবে না স্যার। এবার দিব্যি গাড়ি চালান”। নতুন ঢকঢক আওয়াজটা যেন এই কথাগুলোর মধ্যে থেকেই আসছে। এই আওয়াজ বন্ধ করার কোনও গ্যারেজ তো কৌশিকের জানা নেই!…