T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় শম্পা সাহা

দুগ্গা! দুগ্গা!

ঋতুপর্ণার ঋতুমতী হবার পর থেকেই নাকি‌ বোলচাল বদলেছে! ঠাকমা বলে, মা বলে, দিদি বলে, কাকি বলে! সে যে বলে বলুক, তাতে ওর বিন্দুমাত্র ভাবনা চিন্তা নেই। ও তো জানে ওর মধ্যে আসলে কী থাকে! ওর মধ্যে থাকে আরেকটা ঋতু। যে ওর মত ভাবে না, ওর মত কাঁদে না, ওর মত সব কিছুতে ভয় পায় না এমনকি সে ওর মত মাথা মোটাও নয়! এমনিতে ঋতু শান্ত, গোবেচারা, লক্ষ্মী! সবাই ওকে লক্ষ্মী বলেই জানে। ঠাকুমা খেতে দিলে খায়, নয় তো খায় না। কাকিরা যা বলে, শোনে। বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘর মোছা, ভাই বোনেদের ভাইফরমাস খাটা, সব!
বিনী বলে,
-ঋতুদি, জল দাও!
ও দৌড়ে এসে দেখে, জলের বোতল হাতের কাছে, তবু নেয়নি। ও এসে হাতে ধরিয়ে দিলে জল খাবে!
রতু চিৎকার করে,
-ঋতু দি, এই ঋতুউউউউ, আমার বই কই? পড়তে যাবো যে!
ঋতু দেখে, ব্যাগ, বই, খাতা সব খাটের কাছের টেবিলে পড়ে, তবু নেবে না। ও গুছিয়ে দেয় যত্ন করে। রতু টান মেরে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায়, যেন ঋতুর জন্যেই পড়তে যেতে রতুর দেরি হলো!
অফিস থেকে ফিরে সেজ কাকা ডাকে, ঋতু চা কই?
ঋতু দৌড়ে চা নিয়ে আসে। একটা প্লেটে চায়ের কাপ, তাতে কাণায় কাণায় ভর্তি চা আর দুটো মেরি বিস্কুট! চা যদিও সেজ কাকি করেই রেখেছিল, কিন্তু কাকি এখন আসতে পারবে না। কাকি ছেলে মেয়েদের পড়াচ্ছে। তাই অগত্যা ঋতুই এ কাজে! ওদিকে আবার মেজ কাকি চিৎকার জুড়েছে,
– ঋতুউউউ, বলি লুচির ময়দাগুলো কে মাখবে? হ্যাঁ? বলি আমার কথা কি কানে যায় না?
দৌড়ে দোতলা থেকে একতলায়। ততক্ষণে মেজকাকি বাসন কোসন, কৌটো, রুটি বেলনি সব নেড়েচেড়ে বেশ একটা ঝড় মতন তুলে ফেলেছে! ভয়ে ভয়ে ঋতু এসে বসে এক গামলা ময়দা নিয়ে! বেশ করে সাদা তেলে, ধীরে ধীরে ময়ান দিয়ে গরম জলে ময়দাগুলো মেখে মন্ড করে ফেলে। কাকি তার সময় সুযোগ মত লেচি কেটে ময়লাগুলো বেলে ভেজে ভেজে তুলে দেবে ছেলে, মেয়ে, স্বামীর পাতে। শেষে খাবে নিজে। ঋতু হয়তো তখন সকালকার জল দেওয়া ভাত , কাঁচা পেঁয়াজ আর পেঁপের তরকারি দিয়ে খেয়ে বিছানা পেতে বেড়াচ্ছে এই তিনতলা বাড়ির এ ঘর সে ঘর!
ঋতুপর্ণার মা ছিল এ বাড়ির বড় বৌ। লক্ষ্মীমন্ত ও বটে। তার ভারী আদর। ঋতুর জন্ম হবার পর পরও সে কদর কমেনি! বাকি বৌয়েরা ধীরে ধীরে এ বাড়ির ঘরগুলোর দখল নিলেও হেঁসেল ছিল ওর মা লক্ষ্মীশ্রীর হাতেই। তাতে মেজো,সেজো বৌদের রাগ হবার কথাই বটে। ওরাও তো বৌ, ওদের বরেরাও কড়ি ফেলে তবে গে তেল মাখে! ওরা কেন বড় বৌয়ের হাততোলার উপর থাকবে? যদিও বড় বৌ ভালোমানুষ! কিন্তু বাকি বৌদের সে ভালোমানুষি, শাশুড়ির মন ভোলানো অভিনয় ছাড়া কিছুই মনে হতো না! তাই মেয়ের সাত বছর বয়সে, লক্ষ্মীশ্রী দশ দিনের ডেঙ্গূতে ভুগে একমাত্র মেয়েকে বৃদ্ধা শাশুড়ির হাতে তুলে দিয়ে ছুটি নিল যখন বাকি বৌয়েরা ভাবলো, “হাড় জুড়োলো”। ঋতুপর্ণার বাবা অখিলেশ নিয়োগী নিজের ব্যবসা সামলে ঘরে এসে বৌয়ের মৃতদেহ সৎকার করে আবার ডুবে গেলেন ব্যবসাতেই! ধীরে ধীরে বাড়ির সঙ্গে, মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকতে চুকতে না বরাবর! আগে তাও মাঝেসাঝে বাড়ি আসতেন, এখন ধীরে ধীরে তা না বরাবর! টাকা পয়সাও দেন না। না মেয়ের জন্য না বৃদ্ধা মায়ের জন্য।‌ নিন্দুকে অবশ্য বলে অখিলেশ নিয়োগী আবার সংসার পেতেছেন কিন্তু মা কমলাবালা তা মানতে রাজি নন। ঋতুপর্ণা আর কমলাবালার সংসার এখন বাকি ছেলেদের দয়ায় চললেও কমলাবালার দৃঢ় বিশ্বাস, বড় ছেলে একদিন ফিরবেই। মেয়ের টানে তার একদিন সংসারে মতি হবেই! কিন্তু তার এ মনের জোরের সঠিক কারণ অবশ্য জানা যায় না!
এ বাড়ির এক এক তলায় এক এক ভাই তাদের আলাদা আলাদা সংসার পেতেছে, খালি ঋতুর ঠাঁই ঠাকুমার সংসারে। তার দুবেলা জোটে ঠাকুমার হাঁড়ির দয়ায়, যদিও তা না জোটারই সামিল। কিন্তু বাড়ির কোনো সদস্যই ঋতুর অসহায়তার সুযোগ নিতে ছাড়ে না। এমনকি যারা বাইরে থেকে এ বাড়ির কোনো ঘরে বেড়াতে আসে সেও জেনে যায় যে ঋতুকে যেমন খুশি ব্যবহার করা যায়। তাই ফাইভে পড়া ঋতুর সঙ্গে মেজ কাকির দাদার এইটে পড়া ছেলে এসে বর বৌ বর বৌ খেলে, বলে যায়, এসব কাউকে বলবি না! সেজ কাকির দাদা ছোট্ট মেয়েটার ছোট হয়ে আসা জামার উপর উঁকি দেওয়া বুকে খপ করে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
-এ হে, সর সর,সরে দাঁড়া!
যেন ঋতুর দোষেই ওর বুকে লোকটার হাত বসে গেছে! ঋতু দেখে আর দেখে। কাঁদেটাদে না। ও ঠিক করে রেখেছে, মায়ের কাছে তো একদিন ও যাবেই, সব্বাই যায়! ও তখন মাকে সব বলে দেবে! দিয়ে মা মেয়েতে সবকিছুর শোধ তুলবে!
কিন্তু যেদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই ওর দু পায়ের ফাঁক দিয়ে গরম তরল নামতে শুরু হলো, ও ভয়ে ভয়ে ঠাকুমাকে ডাকলো! ওকে কাঁদতে দেখে ঠাকুমা সাহস দেয়,
-ধুর ছুঁড়ি, কাঁদিস ক্যা? ও তো সব্বার হয়, সঅঅঅব মেয়েদের হয়! আরে মেয়েরা তো দুগ্গার জাত! তাই এই রক্ত তাদের শক্তি দেয়! এ অসুরের রক্ত, তাই বের হয়ে যায়!
ঋতু স্কুলেও যায়, বিনোদবিহারী বালিকা বিদ্যালয়! সেও নমাসে ছমাসে। সর্বশিক্ষার দৌলতে ওর নাম কাটা যায়নি এখনো, কিন্তু অ্যাটেন্ডেন্সের যা ছিরি, নাইনে উঠলে হয়তো রাখবে না! স্কুলের বান্ধবীরা অবশ্য অন্য কথা বলে। বলে,
-এ হলে নাকি বাচ্চা হয়! শরীর খারাপ হলে তবেই মেয়েরা মা হতে পারে।
ঋতু ভয়ে ভয়ে থাকে, ও কি মা হয়ে যাবে? কিন্তু তাহলে তো ওর স্কুলে বাকি মেয়েরাও মা হয়ে যেত! এ কথা জিজ্ঞাসা করায় অন্য মেয়েরা মুখ টিপে হেসেছিল কিন্তু ওকে কিছু বলেনি।
ঋতু আজকাল কীরকম , অন্যরকম যেন! সব কাজ করে, সব ফাইফরমাস খাটে, কিন্তু তবু যেন ও বদলে গেছে! যেমন সেদিন ওকে মেজ জেঠি ভাত গালতে বলে, যেই বড় ঘরে বিছানার চাদর বদলাতে গেছে, এসে দেখে ভাত, ফ্যান সব ছড়াছড়ি! ভাতের হাঁড়ি উল্টে মেঝেতে!
সেজ কাকি একদিন রুটির আটা মাখতে বলে ছেলে পড়াতে গেছে। অনেকক্ষণ পরে সাড়াশব্দ না পেয়ে এসে দেখে, এক গামলা জল আটায় ঢেলে পুরো ঝোল! ঋতুর দেখা নেই। সেদিন সেজ বৌ চেঁচিয়ে সারা বাড়ি মাথায় করলেও ঋতুর দেখা পাওয়া যায়নি। ঠাকুমা এসে দশবার খোঁচালেও ও মেয়েকে বিছানা থেকে তোলা যায়নি! ওর নাকি জ্বর! যদিও কমলাবালা কপালে হাত দিয়ে নাতনির জ্বরের হদিশ পায়নি। এরপর বাড়ির লোকজন ঋতুকে নিয়ে দিশেহারা! যে কাজই ওকে দেওয়া হয়, সব উল্টো করে রাখে। বাসন মাজতে বললে , হাঁড়ি তুবড়ে যায়, কাপ ভেঙে যায়, চামচ হারিয়ে যায়! কড়াইতে থাকা তরকারি নাড়তে বললে , কড়াই ধরার ন্যাকড়ায় আগুন লেগে যায়! রতু জল চাইলে, ওর মুখের উপর অসাবধানে জলের গেলাস উলটে যায়, কাকাদের গায়ে গরম চাও অসাবধানে ছলকে পড়ে। শেষে এমন অবস্থা যে ওকে কেউ কোনো কাজ দিতেই সাহস পায় না। আগে যেমন ঋতুকে ডেকে কাজ দিলে ও মুখ বুজে করে দিতো, এখন ও নিজেই যেচে কাজ করতে চায় আর এরকম উল্টোপাল্টা করে ভালো মানুষ মুখ করে থাকে। সবাই জেরবার ওকে নিয়ে! কী হলো মেয়েটার! আগের মত চুপচাপ নেই, বরং হাসিখুশি! আগের মত ভয়ভয় ভাবটাও নেই। ও এখন বেশ স্বচ্ছন্দ, সাবলীল!
তবে ওর বদলটা সবার মনে একদিন ভয় ধরিয়ে দিলো। সেজ কাকির দাদা বেড়াতে এসেছে। সঙ্গে টেনে পড়া ছেলে আর কলেজে পড়া মেয়ে। যদিও সেজ বৌ আগের মত সব কাজে আর ওকে ডাকে না! ডাকলেই না জানি কী অনর্থ ঘটিয়ে বসে। কিন্তু ওর দাদাই বললো,
-তোর ভাসুরের মেয়েটাকে ডাক না! সব একা হাতে কী করে পারবি?
– ওকে দিয়ে হবে না। বড্ড শয়তান ওইটুকু মেয়ে।
– কী যে বলিস! আগেও তো দেখেছি। ভারী শান্তশিষ্ট লক্ষ্মী মেয়ে!
-সে মেয়ে আর সে নেই!
-কেন রে? কী আবার হলো?
– সে অনেক কথা!
বলে চায়ের জল বসায় সেজ বৌ!
বোনের অনীহা দেখে, দাদা মনে মনে প্রমাদ গোনে। এ বাড়িতে আসার ওটাও তো একটা উদ্দেশ্য! সেটা বুঝি ফসকে যায়! তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে হাঁক পারে,
-ঋতু, ঋতু, একবার এদিকে আয় মা! দেখ মামা এসেছে!
দু চারবার ডাকতে, ঋতু সাড়া দেয়,
-যাইইইই!
এবার সেজ বৌয়ের দাদার অবাক হবার পালা! এ মেয়ে তো আগে কখনো সাড়া দিতো না। ডাকলে,পায়ে পায়ে এসে মুখ গোঁজ করে থাকতো। কাজটুকু করে গেলেও হাজার ডেকেও তার মুখে কথা ফুটতো না। কিন্তু এ তো যেন অন্য মেয়ে!
দুদ্দার করে ঋতুপর্ণা এসেই সেজ বৌয়ের দাদার পা ছোঁয়। হেসে বলে,
-ভালো আছো মামা!
একটু অবাক হয়ে সেজ বৌয়ের দাদা উত্তর দেয়,
-হ্যাঁ! তা তুই কেমন আছিস মা?
-ভালো। কই কাকি, চা হলো তোমার? দেখি মামাকে দিয়ে আসি!
বলেই চা আনতে ঋতু রান্নাঘরে! সেজ বৌ চায়ের কাপ প্লেটটা ঋতুর হাতে দিতে দিতে বলে,
-দেখিস, আবার গায়ে ফেলিস না যেন!
-আরে না না! তুমি দাও তো!
প্রায় প্লেটটা ছিনিয়ে নিয়ে ঋতু হাজির বসার ঘরে। ততক্ষণে সেজ বৌয়ের দাদার ভেতরে ভেতরে নানান উত্তেজনা বয়ে যাচ্ছে। নিজের দৃঢ়তা বহু কষ্টে প্রশমিত করেছে এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে। ঋতু এসে নিচু হয়ে প্লেটটা দিতে গেলে, সেজ বৌয়ের দাদা, নিতে গিয়ে অভ্যেস বসে অথবা অবদমিত লোভের বশে ছুঁয়ে দেয় ঋতুপর্ণার ফুলের কুঁড়ি। ঋতু যেন এর অপেক্ষাতেই ছিল। সোজা গরম চায়ের কাপ উপুড় করে দেয় সেজ বৌয়ের দাদার মুখের উপর, চোখ বরাবর, আর লোকটা যেই ডান হাতের পাতা দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে যায় তার আগেই, ওর আঙুলগুলো সজোরে উল্টোদিকে মুচড়ে প্রায় ভেঙে দিয়ে ঋতুপর্ণা দৌড় দেয় সোজা বাড়ির বাইরে। ওকে আর ও তল্লাটে কেউ দেখতে পায়নি!
সপ্তমীর সকাল। ঘাটে ঘাটে নবপত্রিকা স্নানের ধুম! ঢাক ঢোল উলুধ্বনিতে গঙ্গার ঘাট সরগরম! ঘাটের তিন নম্বর ধাপে একটা মেয়ে, বছর তেরো চোদ্দ। সে দু হাত তুলে কপালে ঠেকায়। এরপর বাঁদিকে মুখ ঘুরিয়ে কাকে যেন বলে,
-দেখেছো? যবে থেকে দুর্গা হয়েছি, তবে থেকেই শক্তি এসে গেছে, তাই না মা?
আশেপাশে কেউ নেই, শুধু ভিখারী ভেবে পূণ্যার্থীরা কিছু পয়সা দিয়ে গেছে। সবাই দেখছে, মেয়েটা একাই বসে আছে। কিন্তু কারো দেখার চোখ থাকলে দেখতো, অদৃশ্য পাঁচটা আঙ্গুল পরম মমতায় মেয়েটার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।