T3 || স্বাধীনতার খোঁজে || বিশেষ সংখ্যায় শম্পা সাহা

স্বাধীনতা

-ও দিদি একটু লিকি দাও না গো
-না না ব্যাংকে ওসব কেউ কাউকে লিখে দেয় না
-দাও না গো দিদি। টাকাটা আমার আইজই লাইগবি
– অন্য কাউকে দিয়ে লিখে নাও
-কেউ দিচ্চি না গো। তুমি এট্টু দাও না ।বেশি কিচ্চু না ।শুধু এই বইটা দেইকি দশ হাজার টাকা তুইলবু এইটুকুন লিখি দাও
-বললাম তো পারবো না
হাসানের মা রহিমা বিবি এ নিয়ে ব্যাংকে বোধহয় গোটা সাতেক লোককে বলল এই টাকা তোলার চেকটা লিখে দিতে ।কিন্তু কেউ রাজি নয়। যুগ বদলেছে, মানুষ বদলেছে ।কেউ কাউকে সাহায্য করতে চায় না এটা যেমন সত্যি, তেমনি আরো একটা সত্যি যে কেউ কারো ঝামেলাতে যেতে চায়না। ব্যাংকের দেওয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা “অকারণে কারো সাহায্য নেবেন না, বিপদে পড়তে পারেন”!
সাহায্য নিলে যদি বিপদে পড়তে হয় তো সাহায্য করলেও তো বিপদ হতে পারে? তাই আজকাল মানুষ বড় সতর্ক ।মানবিকতা যে একেবারে মরে গেছে তা বলা যায় না, তবে তার পদক্ষেপ আজ অনেক বেশি সন্তর্পনে।
সকাল সকাল বেরিয়ে আসতে পারেনি রহিমা বিবি। সংসারের ঊনকোটি চৌষট্টি সেরে আসতে আসতে বারোটা সাড়ে বারোটা। অন্যদিন ফকরুল লিখে দেয়। ওর এই কাজ। যারা পড়ালেখা জানে না, ওর মতো টিপছাপ, তাদের টাকা তোলা, জমা দেওয়ার স্লিপ,চেক লিখে দেয়। বদলে পাঁচটা টাকা। তা হোক, তবু কাজটা তো হয়ে যায়।
কিন্তু আজ ওখানে বিশাল ভিড় ।যেন আজই সব্বার টাকা লাগবে! মনে মনে বিরক্ত রহিমা বিবি।
হাসানের বাবা দুবাই গেছে এই বছর দুয়েক হলো। না গিয়ে উপায় ছিলো না। জমিজমা বলতে সবই চলে গেছে বড় মেয়েটার বিয়ে দিতে।এখনো দু দুটো মেয়ে ,কুলসুম আর ফাতেমা।হাসান তো নেহাতই ছোট ।সবে পাঁচ কেলাসে পড়ে গাঁয়ের মাদ্রাসায় ।পড়ালেখা জানে তবে এসব চেকটেক ওকে দিয়ে লেখায় না। দশ হাজার টাকা! যদি না পারে, যদি ভুলটুল,কাটাকুটি হয়? তবে তো পুরোটাই নষ্ট।
তাই প্রতিবারেই ফখরুলকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। কিন্তু আজ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ।ফখরুলের হাত আর খালি হয় না।কতজনকে বলল কেউ একটু লিখে দিলো না।
প্রায় দু-তিন ঘণ্টা দাঁড়ানোর পর ফখরুল হাতটা ফাঁকা পেয়ে লিখে দিলে, রহিমা বিবি আঁচলের খুঁটে বাধা পাঁচ টাকার কয়েনটা ঠক করে ওর সামনে নামিয়ে রেখেই দৌড়ালো কাউন্টারের দিকে। চারটে বেজে গেলে তো আর টাকা দেবে না ।
আজ ব্যাংকে খুব ভিড়! সোমবার বলেই বোধহয়। এত ভিড়! কিন্তু আজ টাকাটা না তুললেই নয়। বড় মেয়ে মদিনার শ্বশুর ঘর থেকে চেয়ে পাঠিয়েছে, জামাইয়ের লাগবে। কি যে করে রহিমা? তাই তো এতক্ষন দাঁড়িয়ে! না হলে অন্যদিন হলে ফখরুলকে বলে পরেরদিন আসতো।
মদিনা একেবারে ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে। টাকা নেবে তবে যাবে ।রহিমা কত বলল
-আজ থেইকি যা না
– না গো। তোমাদের জামাই পাইরবি না একা থাইকতি। আর বাচ্চাগুলান কেও তো আনিনি
রহিমা সব বোঝে ।বাপ এই বুড়ো বয়সে ভিনদেশে গিয়ে রক্ত জল করে দু পয়সা কামাচ্ছে, তার ভাগ বিয়ে হয়ে গেছে বলে ওই বা ছাড়বে কেন? ওদের অভাবের সংসারে স্বাচ্ছল‍্য কি ওরা জানে না। কিন্তু এখন হাসানের বাপ দুবাই যাওয়ার পর থেকে পাঠানো টাকায় পেট ভরে দুটো মাছ ভাত খেতে পায়। ঘরে রঙিন টিভি নিয়েছে। তাতে পাড়া-প্রতিবেশী কোন ছাড় নিজের মেয়ে, জামাইয়েরই চোখ টাটায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রহিমা বিবি।
প্রতিমাসে ও দশ হাজার করে তোলে। ওর বাবা অবশ‍্য কুড়ি করে পাঠায়। কিন্তু বাকিটা রেখে দেয় সময় অসময়,বিপদ আপদ বলে। যেমন এভাবে রেখেছিল বলেইতো টিভিটা কেনা হলো। আর আজ এই মদিনার জন্য টাকা। তবে না রাখলেই বোধহয় ভাল হত! ভাবে রহিমা। টাকাটা না থাকলে তো আর দিতে হতো না।
আজকের ঘটনায় ও মনে মনে ভীষণ বিরক্ত। কি হতো দশ হাজার টাকা আর ওর নামটা লিখে দিলে।তাহলে তো আর এতক্ষণ দাঁড়াতে হতো না। মানুষ বড় খারাপ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন।
বুকের ভেতর নোটগুলো পুঁটুলি করে রেখে নিজের মনে বকবক করতে করতে বাড়ি ফিরছে রহিমা ।
-কি চাচী, কাকে গাল পারছো?
হালেম মোল্লার ছেলে হারুণ গাছ তলায় দাঁড়িয়ে ওদের জমির মুনিসের তদারকি করছে। ওর কথা শুনে হাসি পেয়ে যায় ।
-কাকে আর গাল পাইরবু বাপ? পারছি আমার নসিব কে!
– কেন নসিব আবার কি কইরলু? চাচা বিদেশ গিয়ি এখন নসিব তো ভালোই হইয়চি
-আর বলিস না বাপ। সেই কাকুন ব্যাংকে গিইয়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত খানিক পরে কাজ হইলু
– কেন খুব ভিড় ছিল?
– তা ছিল ।তা ছাড়া আমাকে কেউ চেক কেউ লিকি দিতি চায় না
-কেন ফখরুল চাচা?
-ওকানেও খুব ভিড়
– চাচী, তুমি কি একেবারেই লেখাপড়া জানোনা ?
-না বাপজান। তা আর শিখলাম কই
-একদিনও ইস্কুল যাওনি ?
-তা না যাওয়ারই মত। ওয়ানে কদিন গিচিলাম।তারপর আর কেউ রাজী হলু না
-তুমি নাম লিখতি জানো?
– না রে বাপজান।তখন জানতাম এখন ভুইলি গিচি -তাহলে কি টিপ দাও?
– হ‍্যাঁ রে বাপ
-আচ্ছা এক কাজ কইরু তো। কাল বিকিলি আমার কাছে একবার এইসু
– কেন রে বাপ?
-এইসু তো
পরের মাসে রহিমা গটগট করে গিয়ে দাঁড়ায় সোজা ব্যাংকের কাউন্টারের সামনে। আজ বেশ ফাঁকা ব‍্যাংক। ফখরুল শুধায়
-ও ভাবি চেক লিখাবা না
-না ভাইজান। লিইকি এইনিচি
ফখরুল ভ্রু কুঁচকায়।
একটা খরিদ্দার হাতছাড়া হলো
মাথা উঁচু করে একটা কাউন্টারে কাঁচের গোলটার মধ্যে দিয়ে লোকটার হাতে চেকটা গলিয়ে দেয় রহিমা বিবি। বুকটা একটু ঢিবঢিব করে বটে ।কিন্তু না ,কোন অসুবিধা হয় না। বেশ কিছুক্ষণ ব্যাংকের লোকটা যখন চেকের দিকে তাকিয়ে, রহিমা ভয় পায়
-এই রে নিশ্চয়ই কোন ভুল টুল হইয়িচি !
কিন্তু না “আলহামদুলিল্লাহ”, আল্লাহর দোয়ায় সেটা একটা ক্লিপে বাকি চেকের সঙ্গে রেখে কুড়িটা পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দেয় রহিমাকে।
শান্তি !শান্তি! মুক্তি! মুক্তি! বুকের ভেতর থেকে একটা আনন্দের ,স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে। রহিমা মনে মনে অনেক দোয়া দেয় হারুণকে। ওই তো বড় বড় করে একটা কাগজে ইংরেজিতে লিখে দিয়েছে, “সেলফ”, আর “টেন থাউজেন্ড রুপিস”, আর দশ হাজার টাকা সংখ্যায়। তা দেখে দেখে এই গোটা একমাস মকসো করেছে রহিমা ।
ভুল হয়েছে। হারুণ শুধরে দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে বকেছে কিন্তু হাল ছাড়েনি ওরা দুজনেই। তাই আজকে চেকটা রহিমা নিজেই লিখেছে। যদিও হারুণ সামনে ছিল। কিন্তু একবারও ও নিজে পেন ছোঁয়নি। রহিমা বিবির একটু ভয় ভয় করছিল, কিন্তু হারুণ বকেছে
-আর কদ্দিন লোকের পায় ধরবা চাচী?
যদিও সই এর জায়গায় টিপ ছাপ। না হলে ব্যাংকে আবার হাজার ঝামেলা ।কিন্তু এখন আর ওকে লোককে পায়ে ধরতে হবে না, চেক লিখে দেওয়ার জন্য ।একই তো বলে স্বাধীনতা। যেখানে কোনো কিছুর জন্যই আর কারো মুখাপেক্ষী হতে হবে না, আমাদের দেশের হাজার লক্ষ কোটি রহিমাদের। নয় কি?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।