T3 || ভ্যালেন্টাইনস ডে ও সরস্বতী পুজো || স্পেশাল এ শম্পা সাহা

বসন্ত এসে গেছে
বসন্ত পঞ্চমীর সকালগুলো কিশোর বেলায় এসে কেমন টপ্ করে বদলে যায়। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে, হলুদ মেখে চটপট স্নান করে ছুট্! অঞ্জলী সেরে তবে না কুল খাওয়া! দেরি করলে পেটে ছুঁচোয় ডন মারবে যে! সক্কাল সক্কাল সে পাট চুকিয়ে, খিচুড়ি আর এক হাতা ল্যাবড়া দিয়ে পেট শান্ত করে, অগোছালো মায়ের শাড়ি, যার পেটটা ঢাউস হয়ে থাকে বড় শাড়ির ছোটোদের মত মানিয়ে নেবার প্রচেষ্টায়, তার কুঁচি ধরে লটপট করতে করতে সম বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে “আমরা সবাই”, “অজিত স্মৃতি”র ঠাকুর দেখে, কোন ঠাকুরের চোখ ভালো, কোনটার শাড়িটা মোট্টেও ভালো না থেকে বদলে হয়ে যায় ফাগুন রঙা!
এই ধারা সমান তালে বজায় রেখে সেবার ঝিমলির পুজোটাও বদলে গেলো এক ধাক্কায়! ঝিমলি তখন সবে নাইন! বাসন্তী রংয়ে রাঙানোর মোক্ষম বয়স!! সকাল সকাল ঘুম উঠতে হয়েছে, তবে অঞ্জলী দিয়ে তাড়াতাড়ি কুল খাবে বলে নয়! নাইন তো আর ততটা ছোট নয় বরং শরীর মনে অদল বদল ইচ্ছে অনিচ্ছে চু কিৎ কিৎ খেলতে শুরু করেছে বেশ কিছুদিন! বাড়ির পাশের “অনামিকা সংঘের” ছেলেরা এসে বলে গেছে, “মাসিমা, এবার সরসতী পুজোতে এট্টু ব্যবস্তা করে দেবেন!” মাসিমা মানে ঝিমলির মাও বেশ ঘাড় নেড়ে লম্বা একটা হ্যাঁ করেছে! আসলে ওদের টানাটানির পরিবারে যখন নুন আর পান্তার হিসেবে ঝিমলির মায়ের দিন যায়, পাড়ার ফাংশানে বা দশমীর দুর্গা বরণে, পাশের ফ্ল্যাটবাড়ির ঝলমলে বৌদিদেরই কদর! সেখানে ন্যাতানো শাড়ির ঝিমলির মা আর পাত্তা পায় কী করে? কিন্তু সরস্বতী পুজোয় সে সব বাড়িতেই শঙ্খ, ঘন্টা আর মন্ত্রোচ্চারণে বিদ্যা দায়িনীর আরাধনা। পুজোর কাজ, বিশেষ করে আল্পনা দেওয়া,ফল কাটা তাতে তো মেয়েদেরই দরকার! অগত্যা অনামিকা সংঘের দাদারা ঝিমলির মায়ের স্মরণাপন্ন! তবে এর পেছনে এক ঢাল কালো কোঁকড়া চুল আর বড় বড় টানা চোখের শ্যামলা মেয়ে ঝিমলির যে কোনো হাত ছিল না, তা বলা যায় না! কিন্তু থাকলেও তা ঝিমলির জানা নেই!
পুরোহিত ঠিক সাতটায় আসবে। ওই সময়ে না হলে, একটু বেলা বাড়লে নান্টুর বাবার হাত পা ধরে এমন টানাটানি শুরু হয়, যেন মনে হয় , সেই পড়তে বসে ঝিমলি আর ওর ভাই যেমন মশা মেরে তার হাত পা ছেঁড়ে, তেমনি বোধহয় লোকেরা পুজোর জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে, নান্টুর বাবার টেনে হাত, পা ছিঁড়ে ফেলবে!
সবে স্নান সেরে ঝিমলি চলে এসেছে মন্ডপে। হলদে শাড়ি আর লাল ব্লাউজের পিঠে ছড়ানো ভিজে চুল থেকে তখনো টপটপ করে জল গড়াচ্ছে। মা, ওর বাবাকে চা করে দিয়েই আসছে! বাবা দোকানে বেড়োবে যে! ” যা, একটু এগিয়ে রাখ”, ওর মায়ের কথায় সকাল সকাল এসেই ঝিমলি দেখে, কেউ কোত্থাও নেই! শুধু প্যাংলা মত শুভটা একটা ক্যাটকেটে হলুদ পাঞ্জাবী আর চোঙা জিন্স পরে, ক্লাব ঘর খুলে একটা একটা করে সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ব্যাগ থেকে বার করছে মাটির ধুনুচি, তিরকাঠি, ঘট, আলতা পাতা, আয়না! পাশের আর একটা ব্যাগে উঁকি মারে ঝিমলি। এটাতে তো ফলমূল! কিন্তু চন্দন পাটা, প্রদীপ, সলতে, তেল কিছুই নেই! এমনকি ফল কাটা বঁটিটাও বোধহয় ওদের বাড়ির থেকেই আনতে হবে। একটা খবরের কাগজ পেতে থেবড়ে বসে, গম্ভীর মুখে, ঘটে লাগাবে বলে একটা মাটির খুঁড়িতে সিঁদুর গুলতে গুলতে চারিদিকের ব্যবস্থাপনা দেখে ঝিমলি বলে,
– এই যে, যাও তো । মায়ের কাছ থেকে ফল কাটা বঁটি নিয়ে এসো আর চন্দন পাটা!
– কোনটা তোমাদের বাড়ি?
– ন্যাকা! ওই তো, জানো না?
-দেবে?
-দেবে না কেন? আমার মা তো!
প্যাংলা শুভ বগের মত পা ফেলতে ফেলতে ওদের বাড়ির দিকে এগোয়!
-কী ছেলেরে বাবা! এক পাড়ায় থাকে আর ওদের বাড়ি চেনে না!
ঝিমলি মনে মনে যেন একটু অপমানিত। এক পাড়াতে থেকেও, ঝিমলিকে চেনেই না এই শুভ! কিন্তু ঝিমলি তো শুভর সব খবর জানে। এই ক্যাবলা শুভ বছর বছর ফার্স্ট হয় আর সারাদিন বই মুখে গুঁজে বসে থাকে! তা সেই ভ্যাবলা কার্তিক এই ক্লাবের পুজোয় কী করছে? মনে মনে একটু উৎসুক! তা বলে মোট্টেই ও গায়ে পড়ে শুধোতে যাবে না! এই ভাবতে ভাবতে হাত চালায় ঝিমলি। সময় চলে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই সাড়ে ছটা, সাতটা বাজে বাজে! এক্ষুনি নান্টুর বাবা চলে আসবে!
ওর বাবা চলে যাওয়ায়, বঁটি নিয়ে ঝিমলির মা নিজেই উপস্থিত। ক্লাবের বাকি সদস্য ফটকে দা, শান্তনু দা, অসীম ঘোষ, গোপাল কাকা একে একে এসে জড়ো হয়। কারোই নাকি চান করা হয়নি! তাই সবটাই ঝিমলির মা, ঝিমলি আর ওই ক্যাবলা কার্তিক থুরি শুভর ঘাড়ে! ঝিমলি আর ওর মা যতবার দোকানে পাঠিয়েছে, ফল ধুয়ে আনতে বলেছে, হাতে হাতে এটা ওটা এগিয়ে দিতে বলেছে, সব ব্যাপারেই ওই চোঙা প্যান্ট লম্বা ঘাড় নেড়ে করে গেছে! কিন্তু তবু কেন জানি, ঝিমলির ভেতরে ভেতরে এক অসূয়া! কী এমন দিগ্গজ পন্ডিত যে একবারও ঝিমলির দিকে তাকানো যায় না! একটা কথা বলা যায় না! হাত বাড়িয়ে কিছু দিতে বললেও সেটা ঝিমলির মাকে বলছে! ঝিমলি কিছু চাইলে সেটাও যেন ওর মাকে দিলেই ভালো হয়, এমন ভাব!! বাব্বা! মনে মনে মুখ ব্যাঁকায় ও!
-এঁএএএহ্! ভারী শুঁটকে চেহারা! না হয় একটু পড়াশোনায় ভালো! বাপের পয়সা আছে বলে দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না!
মনে মনে গজরায় ও! কিন্তু কেন ওর এই রাগ কে জানে?
প্রায় সাড়ে সাতটা পৌনে আটটার দিকে নান্টুর বাবাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসে শশাঙ্ক কাকা! ভাগ্যিস, অজিত স্মৃতির ছেলেদের আগেই শশাঙ্ক কাকা চলে গেছিলো নান্টুদের বাড়ি! না হলে আর পাওয়া যেতো না! যতই আগে থেকে বায়না করে রাখো, পুজোর কদিন ব্রাম্ভনদের হেভ্ভি ডিম্যান্ড! আসলে ক্লাবের ছেলে ছোকরাদের এই সরস্বতী পুজো টুজোর দিন বেলার দিকে নানান দরকারি কাজ। তাই পুজোটা সকাল সকাল সারতেই হয়!
পুজোয় পাশাপাশি বসে অঞ্জলী দিতে গিয়ে ঝিমলি বার বার আড়চোখে তাকায় শুভোর দিকে! কেন কে জানে? হয়তো এই সময়ে বাতাসটা একটু অন্য রকম! হয়তো চারিদিকে তাজা হলদে রঙের আলোময়তা! হয়তো ঝিমলির ক্লাস নাইন আর শুভোর ক্লাস ইলেভেন বলে! কিন্তু যদি তাই হয়, তাহলে শুভ কেন তাকাচ্ছে না ঝিমলির দিকে? খুব খুব রাগ হয় ঝিমলির! নিজেকে অপমানিত মনে হয়! ভীষণ ছোট মনে হয়! মনে হয় কোথাও যেন ও হেরে গেছে!! কিন্তু কেন মনে হচ্ছে ওর এসব! পুজো সেরে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না ও! মা সব গুছিয়ে আগেই বাড়ি চলে এসেছে! রান্না আছে তো! অঞ্জলী সেরে। ঝিমলি বাড়ি আসে! শাড়িটাড়ি কিচ্ছু আর ভালো লাগছে না ওর! শান্তনু দা একবার ডাকলো,
-এই ঝিমলি প্রসাদ নিয়ে যা।
– পরে নেবো!
সন্ধ্যের দিকে ক্লাবের সামনে লাগানো বড় আলোর নিচে তিনটে চেয়ার পেতে তিন মূর্তিমান! ক্লাবের পুজোয় গান চালানোর দায়িত্বে ওরা! একজন আরেকজনকে বলে,
-কীরে শুভ, এত কষ্ট করে অসীম দাকে বলে যে পুজোর দায়িত্বে এলি, কিছু কাজ হলো?
– না রে!
– না মানে? বলিসনি?
-নাঃ!
-এ কে রে? কেন বলিসনি?
– যা রাগী রাগী মুখ করে ছিল!
-ধ্যাৎ! বলবি তো!
– না রে, সাহস হয়নি!
– তুই একটা ক্যালাস!
– তোরা একটু আমার হয়ে বলে দিবি?
– কেন আমরা বলবো কেন?
– তাহলে ফোন নম্বর দে?
-আমরা কেন তুমিই চাও।
-আমি??
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুভ অসহায়ের মত তাকায়। একটু দূরে ঝিমলির ঘরে মোবাইলে বাজছে, “বসন্ত এসে গেছে! বসন্ত এসে গেছে”!