ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৭৮)

সুমনা ও জাদু পালক

চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সুমনার হাত ধরে পরীরানী উপস্থিত হলেন সেই গুপ্ত সুড়ঙ্গ পথে রক্তবর্ণ বেদীর সামনে। ওই বেদীতে তখন
শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা।রাজা রুদ্রমহিপাল চিন্তিত মুখে ওখানে পায়চারী করছিলেন। হঠাৎ সেখানে পরীরানীর হাত ধরে সুমনা উপস্থিত হতেই রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা তাড়াতাড়ি উঠে বসলো।
সুমনা দুহাত দিয়ে চন্দ্রকান্তা কে আলিঙ্গন করে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ তো?
—- হ্যাঁ রত্নমালা। মহারাজা রুদ্র মহিপালের চেষ্টায় আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
রাজা রুদ্র মহিপাল পায়চারি বন্ধ করে তাড়াতাড়ি সুমনার কাছে এসে বললেন, আরে, এই তো রত্নমালা এসে গেছ। তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল আমার।
—– কেন মহারাজ ?
—- আমি অনুমান করছিলাম যে, এক দণ্ড সময় প্রায় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। যদি সঠিক সময় তুমি ফিরে আসতে না পারো তো শয়তান হূডুর পুতুলগুলোর হাতে ধরা পড়ে যাবে । সেক্ষেত্রে আমি তোমাকে কিভাবে উদ্ধার করব সেটা ভেবেই চিন্তিত হচ্ছিলাম। কিন্তু রত্নমালা, কোন পথে এলে তুমি? তোমার সঙ্গে যিনি এসেছেন, উনি কে?
সুমনা বলল, মহারাজ, আমার সঙ্গে যাকে দেখছেন, উনি পরী রাজ্যের রানী।ওঁর সাহায্যেই আমি দ্রুত পৌঁছে গেছি এখানে। এতে আমার কোন কৃতিত্ব নেই, পরী রানীর সাহায্য না পেলে হয়তো বা আমি ধরা পড়ে যেতাম!
পরীরানীর পরিচয় পেয়ে বিস্মিত রাজা রুদ্র মহিপাল বললেন,
উনি পরীদের রানী! কোথায় ছিলেন উনি?
—- মহারাজ ,উনি বন্দিনী ছিলেন আপনার রথের মধ্যভাগে।

—- কোন রথে?
—— বাগানের শেষ প্রান্তে মস্ত বড় ঘরে যে তিন তলা রুপোর তৈরি রথটা আছে, ওই রথে।
——- কী সর্বনাশ! ওই রথটা তো দীর্ঘদিন ধরে
ব্যবহার করা হয় না। তাছাড়া ওই রথ ঘরের দরজায় তো মস্ত বড় শক্তিশালী কুলুপ লাগানো ছিল। সেই কুলুপ তুমি খুললে কি করে? ওই কুলুপের চাবি তো মহারানীর সিন্দুকে আছে।
—– আমি চাবির সাহায্যে কুলুপ খুলিনি মহারাজ।
—–তাহলে?
—— বানর রাজ প্রদত্ত এক মন্ত্রপুত শক্তিশালী গদার সাহায্যে ওই কুলুপ ভেঙে আমি আপনার রথ ঘরের দরজা খুলেছি।
——- সাবাস রাজকুমারী রত্নমালা! সত্যিই তুমি অসাধারণ!
সুমনা বিনীত ভঙ্গিতে বলল, এতেও আমার কোন কৃতিত্ব নেই মহারাজ। বানর রাজের মন্ত্রপুত গদার সাহায্য না পেলে আমি কিছু করতে পারতাম না।
—– সঠিক সময়ে সঠিক অস্ত্রটি প্রয়োগ করার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধি ও বিবেচনার প্রয়োজন রত্নমালা।
—— এ ব্যাপারেও সঠিক পরামর্শ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে আমার বন্ধু অদৃশ্য কন্ঠ। তার পরামর্শেই আমি
মহাশক্তিশালী গদাকে আহবান জানিয়েছিলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য।
রাজা রুদ্রমহিপাল সুমনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তোমার বিনয় দেখে আমি অভিভূত মা রত্নমালা। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।
রাজার কাছ থেকে পিতৃসুলভ আচরণ পেয়ে হঠাৎ বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল সুমনার। ছলছল করে উঠলো তার চোখ। সে নিচু হয়ে রাজা রুদ্র মহিপালের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। রাজা সুমনাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাজা রুদ্র মহিপাল এবার হাত জোড় করে পরী রানী কে নমস্কার জানিয়ে বললেন, হে পরী রাজ্যের রানী, রাজা রুদ্র মহিপাল আপনাকে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানায়। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আপনাকে আমার রাজ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, আমি জানতেও পারিনি আর আপনাকে কোনরূপ সাহায্য করতেও পারিনি।
পরীরানী প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললেন, হে রাজন, আমিও আপনাকে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই। আমাকে আপনার রাজ্যে বন্দি করে নিয়ে এসেছে দুষ্টু জাদুকর হূডু। এক্ষেত্রে আপনার তো কোনো ভূমিকা নেই। রাজকুমারী রত্নমালা না এলে আমাকে হয়তো আরো বহুদিন আপনার ওই রথের মধ্যে বন্দী থাকতে হতো। রাজা রুদ্র মহিপাল বললেন, হে পরী রানী,
আমার রাজ্যের একটি রথে যে আপনি বন্দী ছিলেন, তা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখের এবং লজ্জার বিষয়। কারণ ওই রথ আমার না হলেও আমার বাগানেই সেটি আছে। অথচ আমি কোনভাবেই জানতে পারিনি যে, আপনি ওখানে বন্দী আছেন।
সুমনা বলল, হে মহারাজ, আপনি আগেও বলেছেন, এখনো বললেন যে ওই রথটি আপনার নয়। এরকম বলার কারণ কী?
—— রথটি আমার পিতামহের। এই পুষ্প নগর রাজ্যের এক প্রবল প্রতিপক্ষ উত্তরের এক শক্তিশালী পাহাড়ি রাজ্য গিরিবর্ম। ওই রাজ্য থেকে মাঝে মাঝে একদল সৈন্য এসে চোরাগোপ্তা আক্রমণ করত আমাদের রাজ্য পুষ্প নগরকে‌ এবং হেরে ফিরে যেত নিজেদের দেশে। কিন্তু যাওয়ার সময় গরিব প্রজাদের ঘরে লুটপাট চালাত। তাদের ঘর বাড়ি ভেঙে দিত।
এই বিষয়টা নিয়ে আমার পিতামহ একাধিকবার দূত মারফত পত্র পাঠিয়েছেন গিরিবর্ম রাজ্যের রাজা কে । পত্র মারফত তাকে অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তা দেখতে। পাহাড়ি রাজ্যের রাজা কথা দিয়েছিলেন, ঐরকম ঘটনা আর কোনদিন ঘটবে না। কিন্তু উনি কথা রাখতে পারেননি।
আবার পাহাড়ি রাজ্যের সৈন্যরা আক্রমণ করেছিল আমাদের রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলোকে।
এবার ভয়ানক ক্রুদ্ধ হলেন আমার পিতামহ। তিনি এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেন পাহাড়ি রাজ্য গিরিবর্ম।
‍ আমার পিতামহের প্রবল পরাক্রম এর কাছে সত্যি কথা বলতে কি, একরকম আত্মসমর্পণ করলো পাহাড়ি রাজ্য গিরিবর্ম।
আমার পিতামহ তাদের রাজ্য দখল করলেন না। সে দেশের রানীর অনুরোধে রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন গিরিবর্মর রাজাকে। কিন্তু শাস্তি স্বরূপ ঐ রাজার সব থেকে প্রিয় এবং রাজ্যের এক অমূল্য সম্পদ ওই রৌপ্য নির্মিত তিন তলা রথ কেড়ে নিলেন। সেই থেকে ওই রথ আছে আমাদের রাজ্যে। কিন্তু আমার পিতামহের মৃত্যুর পর থেকে ওই রথ আর কেউ ব্যবহার করেনি।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।