সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ২১)

দেবমাল্য

পাঁচ

যখন চোখ খুলল, দেবমাল্য দেখল একটা ছাপোষা ঘরে সে শুয়ে আছে। জানালাটানালা আছে বলে মনে হল না। লাইট জ্বলছে। দিন না রাত বুঝতে পারছে না। থাকা তো দূরের কথা, এ রকম ঘরে সে কোনও দিন ঢুকেছে বএকটালেও মনে করতে পারল না। সামশেরদের ঘরের চেয়েও খারাপ অবস্থা।

পায়ের কাছে একটা আলনা। তাতে একসঙ্গে জড়ো করা অনেকগুলো জামাকাপড়। শুকিয়ে গেছে দেখে কোনওরকমে দড়ি থেকে নামিয়ে যেন আলনার ওপরে রেখে দিয়ে গেছে। ভাঁজ করারও সময় পায়নি। তার পাশেই কোমর-সমান একটা কাঠের পাতি আলমারি। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর আগের। তেলকাষ্টি পড়ে গেছে। কাচ বা আয়না নয়, সামনে তারের জাল লাগানো। তারই পাশে একটা জলচৌকির ওপরে তিন-চারটে টিনের বাক্স। একটার ওপরে একটা রাখা। দেওয়ালে এক চিলতে কাঠ লাগিয়ে লক্ষ্মীর আসন করা হয়েছে। সেখানে গণেশ, কালী, লক্ষ্মী থেকে শুরু করে মা মনসারও একটা ছবি আছে মনে হচ্ছে। এদিকে ওদিকের দেওয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে। সেদিকে তাকিয়ে ওর মনে হল, সামনের বার নিশ্চয়ই এর ওপরেই নতুন বছরের ক্যালেন্ডার জায়গা করে নেবে। কারণ, যেটা ঝুলছে, সেটা পৃথক পৃথক মাসের বারো পাতার নয়। হলে নিশ্চয়ই ক্যালেন্ডারের তলায় বারো মাসের তারিখ ছাপা এক পাতার ওই কাগজটা সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা থাকত না। সেটা এবং তার নীচে আরও অনেক ক্যালেন্ডারের পাতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তার নীচে, আগের বছর, তার আগের বছর এবং তারও আগের বছরের ক্যালেন্ডারগুলো চাপা পড়ে আছে। ঘরের মাঝখানে মাথার ওপরে খয়েরি রঙের একটা আদ্যিকালের ঢাউস ফ্যান অত্যন্ত ঢিমেতালে ঘুরছে। মনে হচ্ছে এক-এ দেওয়া। ওপরটা বোধহয় টালি বা অ্যাসবেস্টসের। তাই দরমার সিলিং।

কোথায় আছে সে বুঝতে পারছে না। ঘরের ভেতরে অন্য কাউকে দেখতেও পাচ্ছে না যে, কিছু জিজ্ঞেস করবে। হাতের ওপরে ভর দিয়ে দেবমাল্য খাটের ওপরে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু বসার আগেই মাথার মধ্যে যেন কেমন করে উঠল। মনে হল, কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল।

ও আর ওঠার চেষ্টা করল না। চুপচাপ শুয়ে রইল। দু’মিনিট, চার মিনিট নাকি দশ মিনিট ও জানে না। খুট করে একটা আওয়াজ হতেই মাথা ঘুরিয়ে দেখে এক পাল্লার দরজা ঠেলে কে জানে ভেতরে ঢুকছে। একে এর আগে সে কোনও দিন দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। না, পুরুষ নয়। ভদ্রমহিলা। পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়স হবে। তার মাথার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, এখন কেমন লাগছে?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।